দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ইস্যু। দুর্নীতিতে সম্পৃক্ততার অভিযোগে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদের ওপর নিষেধাজ্ঞার পর দেশের সব মহলে এ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা-পর্যালোচনা। এরই মধ্যে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল বিএনপির নেতারা বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে বলছে, এ নিষেধাজ্ঞা সরকারের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। যদিও বিএনপির দাবি, অবাধ, নিরপেক্ষ ও নির্বিঘ্ন নির্বাচনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থানের পরিবর্তন হয়নি। আর বিশেষজ্ঞদের মত হচ্ছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর চুপ
থাকলেও এ নিষেধাজ্ঞার মধ্য দিয়ে মানবাধিকার এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনসহ এসব ইস্যুতে পরে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সেই আলোচনার খোরাক রাজনৈতিক অঙ্গনে জিইয়ে রাখল যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষজ্ঞরা এও বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে যে মতপার্থক্য রয়েছে, এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সেটি আবারও ফুটে উঠেছে। পাশাপাশি নির্বাচন ইস্যুতে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক প্রায় স্বাভাবিক হয়ে আসছে বলে যে দাবি করা হয়েছিল, সেটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন সামনে এসেছে।
গত মঙ্গলবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন অপারেশন অ্যান্ড রিলেটেড প্রোগ্রামস অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস আইনের ৭০৩১ (সি) ধারার আওতায় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর নিষেধাজ্ঞা দেয় আজিজ আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যদের ওপর। ফলে তারা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।
৭০৩১ ধারাটি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বাজেট স্বচ্ছতা ও দুর্নীতি দমন নিয়ে। ধারাটির ‘সি’ অংশে সরকারি দুর্নীতি ও মানবাধিকার বিষয়ে বলা হয়েছে। আইনের এই অংশে বলা হয়েছে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উল্লেখযোগ্য দুর্নীতি অথবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জড়িত অন্য দেশের কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যদি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য থাকে, তাহলে অভিযুক্ত সেই সরকারি কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। এ ছাড়া মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে যদি বিশ্বাসযোগ্য তথ্য থাকে, তাহলে তিনি প্রকাশ্যে অথবা ব্যক্তিগতভাবে অন্য দেশের সরকারি কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তি ভিসার জন্য আবেদন করেছেন কি না, তা বিবেচ্য নয়।
গত বছর অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রত্যাশা জানিয়ে বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ওই বছরের ২৪ মে ভিসানীতি ঘোষণা করে দেশটি। গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে এ নিয়ে আর খুব একটা উচ্চবাচ্য হয়নি। ১৫ মে দেশটির সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুর বাংলাদেশ সফরের পর আওয়ামী লীগের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি আর বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোর মধ্যে অস্বস্তির আবহ তৈরি হয়। এর মধ্যেই জেনারেল আজিজের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল ও তার সঙ্গীদের মধ্যে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগের নেতারা মনে করছেন, জাতীয় নির্বাচনের পর সরকার অনেকটাই স্থিতিশীল। এ অবস্থায় সাবেক একজন সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞায় সরকারের ওপর খুব একটা প্রভাব পড়বে না। তবে এ নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে এটা স্পষ্ট, সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের তিক্ততা শেষ হয়ে গেছে সেটি ভাবার কোনো অবকাশ নেই; বরং সতর্ক হওয়া দরকার।
গতকাল বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ শেষে নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ‘যে দপ্তর থেকে তার (আজিজ আহমেদ) ওপর ভিসা রেস্ট্রিকশন (নিষেধাজ্ঞা) দেওয়া হয়েছে, সেটি দুর্নীতির কারণে। এটা ব্যক্তিগত দায়। এটা ইনস্টিটিউশনাল (প্রাতিষ্ঠানিক) কোনো বিষয় নয়, পার্সোনাল (ব্যক্তিগত) দায় এবং সেখানেও এটা বলা হয়েছে।’ এর আগে মঙ্গলবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে হাছান মাহমুদ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশ মিশনকে নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে আগে জানানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমরা আলোচনার মধ্যে আছি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের সরকার জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছে। যার কারণে আওয়ামী লীগের অনেক সংসদ সদস্যও দুর্নীতির দায়ে জেলে গেছেন। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুর্নীতি দমন, সন্ত্রাস দমন এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে একযোগে কাজ করছি।’
তবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গোটা দুনিয়া বলছে, বর্তমান শাসকগোষ্ঠী দুর্নীতিতে ডুবে আছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে, মিডিয়া থেকে, বিশেষ করে বাইরের মিডিয়া থেকেও দুর্নীতির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সরকার ব্যবস্থা নেয়নি। এখনো তারা (সরকার) অস্বীকার করছে। তবে আজিজ আহমেদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মধ্য দিয়ে আমাদের দাবি প্রমাণিত হয়েছে।’
বিএনপির দায়িত্বশীল এক নেতা জানান, গত মঙ্গলবার রাতে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেখানে তিনি দলের বিভিন্ন সভা-সমাবেশে সরকারের দুর্নীতির বিষয়টি তুলে ধরতে বলেন। আর এ ক্ষেত্রে আজিজ আহমেদের ওপর নিষেধাজ্ঞার ইস্যুতে জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন। তবে এই ইস্যুতে গত নির্বাচনের আগে যেমনটি হয়েছিল, সেটি থেকে সতর্ক থাকতে বলেন; বিশেষ করে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে যাতে ভুল বার্তা না যায়, সেটি নিশ্চিত করতে বলেছেন।
বিএনপির শরিক নেতারা এ বিষয়টি নিয়ে খুব একটা উচ্ছ্বসিত নন। জানতে চাইলে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘এই নিষেধাজ্ঞার পর সেদিকে আমরা তাকিয়ে নেই। কেননা, যুক্তরাষ্ট্র তার নীতিতে এটা করেছে। দেশটি হয়তো ইন্দো-প্যাসিফিক রাজনীতির অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নিয়েছে। বাংলাদেশকে চীনের দিকে যাওয়া থেকে ফিরিয়ে রাখার কৌশলও হতে পারে। তবে এটা সত্য, এই দায় বর্তমান সরকারের ওপর বর্তায়।’
বিশ্লেষকদের মত হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র আসলে তার ‘মূল্যবোধ ভিত্তিক’ নীতিগত অবস্থান, অর্থাৎ গণতন্ত্র, মানবাধিকার, শ্রম অধিকার কিংবা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মতো বিষয়গুলোতে আগের নীতিতে অটল থেকেই বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সংযুক্ত থেকে সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে যে যুক্তরাষ্ট্রের মতপার্থক্য রয়েছে, এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সেটি আবারও ফুটে উঠেছে।
জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচন ইস্যুতে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক প্রায় স্বাভাবিক হয়ে আসছে বলে যে দাবি সরকার এত দিন বলার চেষ্টা করছিল, সেটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ফলে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর চুপ থাকলেও এ নিষেধাজ্ঞার মধ্য দিয়ে মানবাধিকার ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনসহ এসব ইস্যুতে পরে কী পদক্ষেপ দেশটি নেবে, সেটির জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে। তত দিন পর্যন্ত এ বিষয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জিইয়ে থাকবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার বলেন, ‘দুই দেশের সম্পর্ক বহুমাত্রিক। সম্পর্কের স্কোর ১০-এ শূন্য বা ১০-এ ১০- এ রকমের মেলোড্রামাটিক নয়। দুই পক্ষই পরস্পরকে পড়ে (বিশ্লেষণ করে), নানামুখী ভাবনা-চিন্তা, জাতীয় স্বার্থ, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে লাভ-অলাভ দেখা হয়। মনে হয় না যে আলোচ্য নিষেধাজ্ঞার ফলে দুপক্ষের সম্পর্ক রসাতলে যাবে।’
আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তানজিম উদ্দিন খান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র তার নীতির বাইরে কিছু করে বলে মনে হয় না। হতে পারে এই নিষেধাজ্ঞা তাদের দরকষাকষির হাতিয়ার। এটা সত্য, এই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা-পর্যালোচনা চলে। আবার সাধারণ মানুষ থেকে রাজনীতিবিদসহ সব মহলে আগ্রহ থাকে পরে কী হবে?’
