দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে টালমাটাল উল্লেখ করে এর জন্য ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের তিনটি কর্মকাণ্ডকে দায়ী করেছে বিরোধী দল বিএনপি। সেগুলো হলো লুটপাট, অব্যবস্থাপনা এবং অযোগ্যতা। এই তিন কারণ সামনে রেখে বিস্তারিত তথ্যসহ অর্থনীতির ‘দুরবস্থা’ এবং বিভিন্ন খাতের দুর্নীতির ‘প্রকৃত চিত্র’ নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। সরকারকে চাপে ফেলতে এমনটি করা হবে বলে দলটির একাধিক নেতা জানিয়েছেন। এ জন্য ইতিামধ্যে দলের স্থায়ী কমিটির একজন সদস্যের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন বর্জন করা বিএনপি মনে করছে, আওয়ামী লীগ ফের ক্ষমতাসীন হলেও রিজার্ভ, ডলার সংকটসহ অর্থনীতির দুরবস্থায় দারুণ চাপে রয়েছে সরকার। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীনদের আরও চাপে ফেলতে প্রতিবেদন আকারে তথ্য-উপাত্ত সভা-সেমিনারসহ নানা প্রক্রিয়ায় মানুষের কাছে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরবে বিএনপি।
গত সোমবার দলটির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে শ্বেতপত্র প্রকাশের জন্য কমিটি গঠন করা হয়। এতে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের স্থান দেওয়ার পাশাপাশি বিএনপির আমলে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তা এবং বিশেষজ্ঞদের রাখা হয়েছে। ইতিমধ্যে ওই কমিটির সদস্যরা প্রাথমিক কাজ শুরু করেছেন। বিএনপির মিডিয়া সেলও এই কমিটিকে প্রয়োজনীয় সহায়তা করছে।
ওই কমিটির সঙ্গে যুক্ত দায়িত্বশীল এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, লুটপাট, অব্যবস্থাপনা এবং অযোগ্যতা এ তিনটি কারণ সামনে রেখে তারা শ্বেতপত্র তৈরির কাজ শুরু করেছেন। প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন শেষে সংবাদ সম্মেলন কিংবা অন্য মাধ্যমে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরা হবে।’
বিএনপির এমন উদ্যোগ প্রসঙ্গে দলটির একাধিক নেতা জানান, বিএনপি একাধিকবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল, আবার বিরোধী দলেও ছিল। দেশের এই সংকটকালে অন্যতম রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের দায়িত্ব রয়েছে। এ জন্যই দেশের বর্তমান সংকট তুলে ধরা এবং সেখান থেকে কীভাবে উত্তরণ সম্ভব তার উপায় তুলে ধরা হবে।
দেশের অর্থনীতির চিত্র সম্পর্কে সম্প্রতি বক্তব্য দিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ অন্য জ্যেষ্ঠ নেতারা। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গণ অধিকার পরিষদের সঙ্গে লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকের পর মির্জা ফখরুল বলেন, ‘দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা একেবারে ভয়াবহ পর্যায়ে চলে গেছে। বলতে গেলে খাদের কিনারায় অবস্থান করছে। পড়ে যাবে হয়তো।’
আর রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ‘৯২ হাজার কোটি টাকা শুধু ব্যাংক খাত থেকে লোপাট হয়েছে। লোপাটকারী কারা? এরা সবাই ক্ষমতাঘনিষ্ঠ মানুষ, আওয়ামী লীগের লোকজন বা আওয়ামী লীগের অর্থ প্রদানকারী, আর্থিক সহায়তাকারী অথবা তাদের যারা, দলের যারা আজ অর্থবিত্তের মালিক হয়েছে তারা।’
দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্প্রতি কথা বলেন বিএনপির শাসনামলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক এখন নিজেরা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। সিদ্ধান্তের জন্য ব্যবসায়ী ডাকে, রাজনীতিবিদ ডাকে। সকালে সিদ্ধান্ত নেয়, বিকেলে পরিবর্তন করে। অবস্থা এমন যে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন একটি সমবায় সমিতিতে পরিণত হয়েছে।’
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিএনপির শ্বেতপত্রে সরকারের সেবা খাতসহ প্রায় প্রতিটি সেক্টর দুর্নীতিতে নিমজ্জিত উল্লেখ করে বিস্তারিত তথ্য থাকবে। সব সেক্টরে লুটপাট ও অর্থ পাচার চললেও সরকার কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি এবং কেন নেয়নি তা-ও তুলে ধরা হবে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সর্বশেষ দুটি বৈঠকেও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বিদ্যমান অর্থনৈতিক দুরবস্থা কাটিয়ে ওঠা না গেলে অল্প সময়ের মধ্যে দেশের অর্থনীতি ধসে পড়তে পারে বলে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে মূল্যায়ন করা হয়। আলোচনার একপর্যায়ে এক নেতা বলেন, বর্তমান অবস্থার জন্য সরকারের জবাবদিহিহীন ও চরম ব্যর্থতা রয়েছে। পরিস্থিতি দুর্ভিক্ষের পর্যায়ে যাওয়ার আগেই দায়িত্বশীল দল হিসেবে বিএনপির এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
গত সোমবারের বৈঠকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের নিম্নগতি, ব্যাংকে ডলার ও তারল্য-সংকট এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির গুঞ্জন নিয়ে বেশ সময় ধরে আলোচনা-পর্যালোচন হয়। বৈঠকে বিএনপি নেতারা এসব ঘটনাকে দেশের আর্থিক খাতের জন্য ‘অশনিসংকেত’ বলে চিহ্নিত করেন।
বিএনপি নেতাদের মূল্যায়ন হচ্ছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংক জনগণকে সঠিক তথ্য দিচ্ছে না। আবার সাংবাদিকদের প্রবেশে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। বলা হচ্ছে, ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ ১৩ বিলিয়ন ডলার। আবার কখনো বলছে ১৮ বিলিয়ন ডলার। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে পর্যাপ্ত ডলার নেই। তাদের বাধ্য হয়ে খোলাবাজার থেকে ডলার কিনতে হচ্ছে। এতে আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম বাড়বে। সার্বিকভাবে দেশের অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। মূল্যস্ফীতির কারণে এমনিতেই জিনিসপত্রের দাম বেশি। তার ওপর ক্রমাগত রিজার্ভ কমতে থাকায় আমদানি পণ্যের মূল্য ও জনগণের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা করছেন তারা।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই সরকার দেশের সব সেক্টরকে দুর্বল করে ফেলেছে। অর্থনৈতিক অবস্থা আরও খারাপ। বিএনপির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে খতিয়ান দেশবাসীকে জানানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
