খুলনায় ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রভাবে আজ রবিবার সারাদিন আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ছিল। সকাল থেকেই দমকা হাওয়ার সাথে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়। দুপুরের পর থেকেই বৃষ্টির পরিমাণও বাড়ে। ভরা জোয়ারে দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় উপজেলা কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ ও বটিয়াঘাটায় অনেক জায়গায় ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধের উপর পানি আচড়ে পড়ে। রিং বাঁধ দিয়ে পানি আটকানোর চেষ্টা করে স্থানীয় বাসিন্দারা। তারপরও অনেক স্থান দিয়ে বেড়িবাঁধ উপচে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে। এতে আশপাশের মানুষ আতঙ্কিত হয়ে সাইক্লোন শেল্টারে আশ্রয় নেওয়া শুরু করে।
জানা যায়, বিকাল ৩টা পর্যন্ত ৮৭ হাজার মানুষ আশ্রয় নেয়। মানুষের পাশাপাশি গবাদি পশুও আনা হয়। চিকিৎসায় ৮০টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৮টি মেডিকেল টিম মাঠে কাজ শুরু করেছে।
খুলনা আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র আবহাওয়াবিদ আমিরুল আজাদ জানান, সারাদিন খুলনায় ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকার্ড হয়। সন্ধ্যার পর থেকে দমকা হাওয়া ও বৃষ্টি শুরু হবে। যা মধ্য রাত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। এছাড়া উপকূলীয় এলাকায় নদী জেয়ারের সময় ৮ থেকে ১০ ফুট পানি উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়ে জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানা গেছে, খুলনার ৯ উপজেলায় (কয়রা, পাইকগাছা, বটিয়াঘাটা, দাকোপ, ডুমুরিয়া, রূপসা, দিঘলিয়া, তেরখাদা, ফুলতলা) মোট ৯৯৫ দশমিক ২৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এরমধ্যে ঝুঁকিতে রয়েছে সাড়ে ১৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। তবে উপকূলীয় কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ ও বটিয়াঘাটায় উপজেলায় ঝুঁকিতে রয়েছে ১৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। রেমালের প্রভাবে নদীতে ভরা জোয়ারে স্বাভাবিকের থেকে ৩ থেকে ৪ ফুট পানির উচ্চতা বাড়ে। এতে বেড়িবাঁধের উপর পানি আঁচড়ে পড়ে। অনেক স্থানে পানি উপচে লোকালয়ে প্রবেশ করে। স্থানীয় বাসিন্দারা রিং বাঁধ দিয়ে পানি আটকানোর চেষ্টা করলেও অনেক স্থানে তা ঠেকানো যায়নি। যা আশপাশের মানুষদের আতঙ্কিত করে।
কয়রা উপজেলার ৪ নং মহারাজপুর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য আবু সাঈদ মোল্লা দেশ রূপান্তরকে জানান, মঠবাড়ি সুতি অফিস স্লুইসগেট, লঞ্চঘাটের পাশে সরদার বাড়ি এলাকায় বেড়িবাঁধ উপচে পানি গ্রামে প্রবেশ করে।
কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আছের আলী মোড়ল জানান, গোলখালি কোস্টগার্ড অফিস, কোপাতাক্ষ ফরেস্ট অফিসের দক্ষিণ পাশ, চরামোখা খালের গোরা থেকে মেদিরচর রাস্তা পর্যন্ত, জোড়শিং বাজার হতে খাসিটানা পুলিশ ফাঁড়ি হতে গেট পর্যন্ত বাঁধ উপচে গ্রামে পানি প্রবেশ করে। রিং বাঁধ দিয়ে পানি আটকানোর চেষ্টা করে। তবে তার অভিমত রাতে আরেকটি জোয়ার সামাল দেওয়া গেলে ঝুঁকি চলে যাবে।
দাকোপ উপজেলার সাবেক পৌর মেয়র অচিন্ত কুমার দেশ রূপান্তরকে জানান, কলাবাগী এলাকার শিবসা নদীর পাড়ে পুরাতন বেড়িবাঁধ জোয়ারের পানি তেড়ে ভেঙে গেছে। এখানে অন্তত এক হাজার লোক ঝুলন্তভাবে বসবাস করে। তবে কিছু দূরে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নতুন বেড়িবাঁধ তৈরি হয়েছে। নতুন বেড়িবাঁধের ভেতরে গ্রামে পানি আসার সুযোগ নেই।
খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের-২ (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল আলম জানান, কয়রা, পাইকগাছা, বটিয়াঘাটা ও দাকোপ উপজেলার ১৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ আছে। জোয়ারের সময় পানি আচড়ে পড়েছে বাঁধের উপর। কিছু জায়গায় উপচে গ্রামে পানি প্রবেশ করে। তবে জোয়ারের তান্ডব ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে অনেক জায়গার বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
খুলনা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুল করিম জানান, রবিবার বিকাল ৩টার মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকার ৮৭ হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে আশ্রয় নেয়। আসা অব্যাহত রয়েছে। তাদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ, চিড়া, মুড়ি, গুড় পানিসহ শুকনা খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া ৮০টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। এরমধ্যে ৪৮টি মেডিকেল টিম মাঠে কাজ করছে।
তিনি জানান, দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় এলাকার মানুষের জন্য গত শনিবারের মধ্যেই ৬০৪টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়। এছাড়া ৩টি মুজিব কিল্লা ও ৫ সহস্রাধিক স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) স্বেচ্ছাসেবকরাও উপকূলীয় এলাকায় কাজ করছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স খুলনার উপপরিচালক মামুন মাহমুদ বলেন, প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে ঘূর্ণিঝড় রেমাল মোকাবিলায় ফায়ার স্টেশন কাজ করছে। এছাড়া খুলনা সদরদপ্তরে স্ট্যান্ডবাই রাখা হয়েছে ২০ সদস্যের স্পেশাল টিম।
