শনিবার, ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বৃষ্টির দিনে রিকশাওয়ালাদের কী হয়?

আপডেট : ২৭ মে ২০২৪, ০৯:২২ পিএম

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের কালজয়ী উপন্যাস ‘নিঃসঙ্গতার একশো বছর’-এ একবার মাকেন্দো শহরে মাসের পর মাস অবিরত বৃষ্টি পড়ছিল। থামাথামির নাম নেই। আজকের দিনে ঢাকা শহরে যাদের বাসা থেকে বের না হবার মতো দারুণ সুবিধা ছিল তাদের কেউ কেউ কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে, বৃষ্টির অপরূপ রূপে নিজেকে মাকেন্দো শহরের একজন ভাবার বিলাসিতাটা করতে পারেন।

তবে যাদের সেই বিলাসিতা করার সুযোগ নেই তাদের জন্য সোমবারের ঢাকা ছিল এক বীভৎস অভিজ্ঞতার। আগের রাত থেকে অবিরত ধারায় বৃষ্টি পড়ছে, কোথাও হাঁটু কোথাও বা কোমর পর্যন্ত পানি উঠে যাচ্ছে। খালবিলবিহীন, জলাবদ্ধ শহরের আবার কোথায় খানাখন্দ, কোথাও ইলেক্ট্রিকের তার পানির সঙ্গে মিশে মৃত্যুফাঁদ হয়ে গেছে। আর এই বাস্তবতাতেই লড়তে হচ্ছে রোজগারের চাপে বের হতে হওয়া মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্তদের।

এইরকম মহাপ্রলয়ের দিন, মধ্যবিত্তের জন্য বড় সমস্যার নাম যানবাহন। পানির ভয়ে বাসের সংখ্যা কমে যায়, সিএনজি অটোরিকশা প্রায় নেই হয়ে যায় আর রিকশা যদিও বা পাওয়া যায় তার ভাড়া হয় আকাশচুম্বী। অন্যদিনের তুলনায় একই দূরত্বে যেতে অন্তত দ্বিগুণ ভাড়া দিতে হয়। তাও যদি পাওয়া যায় সেটা ভাগ্য। আর যখন রিকশাওয়ালারা দ্বিগুণ বা তিনগুণ দাম হাঁকায়, দিশেহারা, সীমিত আয়ের যাত্রীদের কেউ কেউ মেজাজ হারিয়ে ফেলেন। রিকশাওয়ালাদের শাপশাপান্ত করেন, রাস্তায় ও ফেসবুকে এসে গালাগাল দেন ‘শ্যালকেরা সব নবাব। বাটপারের দল সুযোগ বুঝে আমাদের থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে।’ আসলেই কি তাই? ব্যাপারটা সব দিক থেকে ভেবে দেখা যাক।

রিকশাচালনা এমন একটি পেশা যার নির্দিষ্ট কোনো বেতন বা ইনস্যুরেন্স নেই। এই পেশায় যে সেবা দেয়া হয়, তা সে উন্মুক্ত বাজারে নিলামে তোলে এবং সেবাগ্রহীতার সঙ্গে দরকষাকষিতে মিলে গেলে উভয়ের সম্মতিতে সেবা প্রদান করা হয়। ব্যাপারটা দিনমজুর কিংবা অন্য যারা স্বাধীনভাবে নিজেদের সেবা বিক্রি করেন তাদের সকলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। বাজার অর্থনীতিতে এই ধারনার ওপর কেবল সেবা নয়, পণ্যও বিক্রি হয়।

ফলত চাহিদা ও যোগানের একদম মূলগত ধারণা থেকে মূল্য নির্ধারণ হয়। এই সরল হিসেবেই, যেদিন চাহিদা বেশি থাকবে সেদিন সেবা বা পণ্যর মূল্যবৃদ্ধি পাবে। প্রশ্ন উঠতে পারে, তবে কি চাইলেই এই মূল্য অনেকগুণ বাড়িয়ে তোলা যায়? রাষ্ট্র ও কর্তৃপক্ষের কি দায়িত্ব নেই? রিকশাওয়ালাদের আচরণও কি তবে মজুতদারদের মতো হয়ে যাচ্ছে না যাদের আমরা গালাগাল দেই? রিকশাওয়ালা কি কেবল গরীব বলেই ছাড় পাবে?

বেশি ভাড়া দিতে হওয়ার মেজাজ খারাপটা সরিয়ে, আমরা রিকশাওয়ালার দৃষ্টিতে ভাবি। প্রথমত, বাজার অর্থনীতি চাহিদা বেড়ে যাওয়ার ফলে ভাড়া বাড়ানোর ব্যাপারটা পূর্ণ সমর্থন করে। কারণ সামনের কোনো দিনে যদি দেখা যায়, যাত্রীর তুলনায় রিকশার সংখ্যা বেশি তখন যাত্রী দরকষাকষির বেলায় সুবিধাজনক অবস্থানে থাকেন। এইভাবেই ভারসাম্য রক্ষা হয়।

বাজার অর্থনীতি বলে, মজুতদারদের যতই গালাগাল দেই না কেন, সে একটা ঝুঁকি নিচ্ছে ভবিষ্যতে দাম বাড়বে এই আশায়। যদি কোন কারণে  সেই ইপ্সিত দাম না বাড়ে, বা এই ঝুঁকির ফলে তার পণ্য নষ্ট হয়ে যায়, তবে কিন্তু সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ক্ষতিগ্রস্ত হবার এই ঝুঁকির বিপরীতেই সে লাভ করবে। যে কোনো ব্যবসার একদম মূলকথাই তাই।

প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে রাষ্ট্র কি দামের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে পারে? পারে, যদি সে পণ্য বা সেবার ইনস্যুরেন্স দেয়। অর্থাৎ রাষ্ট যদি চাহিদা বেশি থাকা সত্ত্বেও দাম জোর করে কমিয়ে রাখে, তবে যখন যোগান বেশি হবে তখনও ভর্তুকি কিংবা তার জিনিস নষ্ট হবার ক্ষতিপূরণ দেয়ার দায়িত্ব নেয়। রাষ্ট্র তথা কর্তৃপক্ষ সেই দায়িত্ব নেবে নাকি পুরোটাই বাজারের ওপর ছেড়ে দেবে এই তর্ক বিশাল। অর্থনীতিবিদ আর রাজনীতিবিদরা সেই আলাপ বহুযুগ ধরে নিরন্তর করে আসছেন। সে আলাপ এখানে করার সুযোগ নেই।

মোদ্দা কথা, রিকশা ভাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগেও একই থাকতে পারে তখনই, যখন কেউ দায়িত্ব নেবে অসুস্থ হয়ে সে বিছানায় পড়ে থাকলে তার জীবিকার দায়িত্ব অন্য কেউ নেবে। এখন রিকশাওয়ালার ব্যাপারটা বোঝা যাক। এই পেশায় বিপুল কায়িক শ্রম প্রয়োজন। একজন বলিষ্ঠ তরুণের পক্ষেও অবিরাম রিকশা চালনা সম্ভব নয়। ফলে অফিসের ডেস্কে কাজ করার সঙ্গে এর পার্থক্য আছে। একজন রিকশাচালক দিনে সর্বোচ্চ আট ঘণ্টার মতো চালাতে পারেন। আর এইভাবে মাসে ২০ দিনের বেশি রিকশা চালানো সম্ভব নয়। চাকরিতে বয়স বাড়লে বেতন যত  বাড়তে থাকে এই পেশায় বয়সের সঙ্গে সঙ্গে জোর কমে যায়, অবশ্যম্ভাবীভাবে আয়ও।

অর্থনীতিতে ‘রেইনি ডে ফান্ড’ বলে একটা কথা আছে। বৃষ্টির দিনে কাজে যেতে পারবে না, সেই দূর্যোগের দিনের কথা ভেবে যে সঞ্চয় তাকেই রেইনি ডে ফান্ড বলে। রিকশাওয়ালার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, প্রতিদিনের আয়ের সঙ্গে কেবল রেইনি ডে ফান্ডের জন্য টাকা জমাতে হয় তাই না, বেশি বয়স হয়ে গেলে রোজগার কমে যাওয়া বা অবসরের চলার জন্যও টাকা জমাতে হয়। কারণ সে রিকশা চালাতে অক্ষম হয়ে পড়লে সেই দায় রাষ্ট্র বা যাত্রী নেবে না।

বৃষ্টির দিনে সর্বদা এই সমীকরণ মেলাতে থাকা রিকশাওয়ালার জন্য একটা জটিল হিসাব নিয়ে আসে। এইদিন সে দুই থেকে তিনগুণ অর্থ উপার্জন করল। কিন্তু এর বিপরীতে দুইটা বড় ঝুঁকি থাকল। যদি বড়সড় দুর্ঘটনায় পড়ে তবে বহুদিনে উপার্জন, চিকিৎসার খরচ তো বটেই, জীবনও চলে যেতে পারে। আর যদি তা নাও হয়, প্রবল বৃষ্টিতে টানা রিকশা চালিয়ে পরের কদিন তার শরীর তুলনামূলক দুর্বল থাকবে এবং এর ফলে কম সময় রিকশা চালানোয় আয় কমে আসবে।

রিকশাওয়ালাদের একটা বড় অংশ এই ঝুঁকি না নিয়ে বাড়িতেই থাকবেন, রেইনি ডে ফান্ড থেকে দিনটা কোনোমতে কাটাবেন। এরা বের না হওয়ায় বলাই বাহুল্য, চাহিদার তুলনায় যোগান অনেক কমে যাবে আর মূল্য বেড়ে যাবে।

রিকশাওয়ালার যৌক্তিকতা তো বোঝা গেল। কিন্তু সীমিত আয়ের মধ্যবিত্ত কিভাবে বৃষ্টির দিনে দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া দেবে? তার সীমিত বেতন তো মূল্যস্ফীতির বাজার আর বাড়িওয়ালার ক্রমবর্ধমান ভাড়াতেই শেষ হয়ে যায়। এই বাড়তি ভাড়া সে পাবে কোথায়? বৃষ্টির দিনে অফিস না গেলেও তো উপায় নেই।

একদিক দিয়ে দেখতে গেলে, নিরাপদ চাকরির জীবন বেছে নেয়ার খেসারত এই ভাড়া। মাস গেলে বেতনের নিশ্চয়তা, অসুখ হলে ছুটিছাটা, বয়সকালে পেনশন, এমনকি মরে গেলে ইনস্যুরেন্স। এতো নিরাপত্তার বিপরীতে এই বাড়তি খরচ।

কিন্তু দায়টা মধ্যবিত্তের ঘাড়ে চাপালেও অন্যায় হয়। শুধু চাকরি করে বলে সে এই খেসারত দিচ্ছে তা না, সে এই খেসারত দিচ্ছে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে পরাস্ত হওয়ায়। সেই ঔপনিবেশিক আমল থেকে এই শ্রেণির জন্য কেরানির চাকরি এতটাই অপরিহার্য, সে চাকরির বাজারে দর কষাকষি করতে পারে না।

একটা প্রচলিত গল্প এইরকম, সকালে অফিস সময়ে এক লোক বাসের পাদানিতেও জায়গা না পেয়ে দরজার হ্যান্ডেল ধরে প্রায় উড়ে উড়ে যাচ্ছিল। এই বিপদজনক দৃশ্য দেখে এক পথচারী মন্তব্য করেন, ভাই, এত তাড়াহুড়া করে যাবার কি দরকার? চাকরি বড় নাকি জীবন? উত্তরে, ঝুলন্ত মানুষটি বলেন, এই বাজারে চাকরির মূল্য জানেন? একবার গেলে আর পাব? এর সঙ্গে বাপ-মা থেকে ফ্রিতে পাওয়া জীবনের তুলনা চলে?

মধ্যবিত্তের দায় সে চাকরি করে বলে না, সে শ্রেণি সচেতন হয়ে রাষ্ট্রের কাছ থেকে নিজের নিরাপত্তা আদায় করতে পারে না। মধ্যবিত্ত সেই রাজনীতিটা ঠিকঠাক করতে পারলে গরীব রিকশাওয়ালাও নিরাপত্তার চাদরে থাকত, বৃষ্টির দিনে বেশি ভাড়া চাইতে হত না। এই না পারার ফলে রিকশাওয়ালা নিজের হিস্যা যদ্দুর পারে আদায় করার চেষ্টা করে। মধ্যবিত্ত ক্ষমতার সঙ্গে না পেরে রিকশাওয়ালাকে বড়জোড় গালাগাল দিতে পারে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত