শনিবার, ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

শাহীনের গুলশান ও বারিধারার ফ্ল্যাট থেকে আলামত সংগ্রহ

  • লাশ না পেলে মিলবে না মৃত্যুসনদ
  • স্কেচ বানিয়ে লাশ উদ্ধারের চেষ্টা
  • রিমান্ডে একেক সময় একেক তথ্য শিমুলের
আপডেট : ২৮ মে ২০২৪, ১২:৪০ পিএম

সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যাকাণ্ডের লাশ উদ্ধারই করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। যেকোনো উপায়ে তারা লাশের টুকরো উদ্ধার করতে নানা কৌশলে এগোচ্ছে। গ্রেপ্তারকৃতদের তথ্য পেয়ে বাংলাদেশ ও কলকাতার তদন্তকারী দল সেই চেষ্টাই চালাচ্ছেন। এ নিয়ে কলকাতায় থাকা ডিবির কর্মকর্তারা ওই দেশের সিআইডির সঙ্গে গতকাল কয়েক দফা বৈঠক করেছেন। হত্যাকাণ্ডে জড়িত কসাই জিহাদ হাওলাদারকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। আনারকে কীভাবে হত্যা করা হয়েছে তার একটি ‘স্কেচ’ তৈরি করেছে ডিবি পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে ভিডিও কলে ঢাকায় আটক মামলার অন্যতম আসামি আমানুল্লাহ ওরফে শিমুল ভূঁইয়ার সঙ্গেও কথা বলেছেন। জিহাদ ও আমানুল্লাকে মুখোমুখি করে হত্যাকাণ্ডের বিবরণ শুনেছেন কর্মকর্তারা।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে, আনার হত্যার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে পরিচিত আখতারুজ্জামান শাহীনের গুলশান ও বারিধারা ফ্ল্যাট থেকে বেশ কিছু আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। দুটি ফ্ল্যাটই ইতিমধ্যে সিলগালা করা হয়েছে। এসব আলামত ও গ্রেপ্তারকৃতদের জবানবন্দি থেকে হত্যার মোটিভ ও জড়িত অন্যদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা। পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত নানা আলামত ও আনারের দেহাবশেষের সন্ধানে চলছে নানা তৎপরতা। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান করা ডিবি পুলিশের টিম হত্যার ঘটনাস্থল নিউ টাউনের সঞ্জীভা গার্ডেনের ৫৫বিইউ ফ্ল্যাটটি পরিদর্শন করেছে। দুই দফায় বাড়িটি পরিদর্শনের পর গতকাল সোমবার কসাই জিহাদকে সঙ্গে নিয়ে ওই ফ্ল্যাটে গিয়েছে বাংলাদেশের তদন্তকারী দল। তারা প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে সিয়ামের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা শুনেছেন। শিমুলকেও ভিডিও কলে যুক্ত করে তার বর্ণনা শুনেছেন।

স্কেচ তৈরি করে লাশ উদ্ধারের চেষ্টা : এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) হারুন অর রশীদ কলকাতা থেকে মোবাইল ফোনে বলেন, ‘বৈরী আবহাওয়া এবং তুমুল বৃষ্টির মধ্যে আমাদের তদন্তকাজ করতে হচ্ছে। আমার তিন দফায় সঞ্জীভা গার্ডেনের ফ্ল্যাটটি পরিদর্শন করেছি। ঘাতক সিয়ামকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়েছি। সেখানে তার কাছ থেকে বর্ণনা শুনে সেগুলো লিপিবদ্ধ করেছি। ঘটনাস্থলের একটি স্কেচ তৈরি করা হয়েছে। প্রযুক্তির মাধ্যমে ভিডিও কলে শিমুল ভূঁইয়া ও শিলাস্তি এবং সিয়ামকে মুখোমুখি করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। আমরা সিয়ামকে সঙ্গে নিয়ে যে খালে লাশের অংশবিশেষ ফেলে দেওয়া হয়েছে, সেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। পশ্চিমবঙ্গের সিআইডি পুলিশের সঙ্গে বৈঠক করেছি। মামলার তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গেও আমাদের কথা হয়েছে। তারা আমাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করছে, আমরাও তাদের প্রয়োজনীয় সব সহযোগিতা করছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া ঘাতকদের কেউ কেউ প্রকৃত নাম-ঠিকানা ব্যবহার করেনি। শিমুল নিজেও আমানুল্লাহ ছদ্মনাম ব্যবহার করেন। আবার কলকাতায় তিনি পরিচয় দেন জব্বার নামে। এভাবে সেলে নিস্কি ও অন্য ঘাতকরাও ছদ্মনাম ব্যবহার করেন। মূলত পুলিশকে বিভ্রান্ত করতেই তারা ছদ্মনাম ও ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করেছিলেন।’

ডিএমপির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংসদ সদস্য আনারের নিখোঁজের ঘটনায় তার মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিনের রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় করা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ডিবির সহকারী কমিশনার মাহফুজুর রহমান শাহীনের ঢাকার ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালিয়ে কিছু আলামত জব্দ করেছেন। সেখান থেকে কিছু নথিপত্র পাওয়া গেছে। আসামিদের মোবাইল ফোনের সিডিআর বিশ্লেষণ, বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ ও রেজিস্টার দেখে কয়েক ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। প্রয়োজন অনুসারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।’

রিমান্ডে একেক সময় একেক তথ্য শিমুলের : খুলনা অঞ্চলের পেশাদার কিলার ও চরমপন্থি নেতা শিমুল এমপি আনার কিলিং মিশন সরাসরি বাস্তবায়ন করেছেন, সেটা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন। জিজ্ঞাসাবাদে শিমুল খুনের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিয়ে কয়েক ধরনের বর্ণনা দিয়েছেন। এমনকি লাশের খণ্ডিত অংশ যে স্থানে বা খালে ফেলার কথা বলেছেন, তা নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।

জিজ্ঞাসাবাদ-সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, খুনের পরিকল্পনার আলাপ-আলোচনায় শাহীন, শিমুল ও অন্যান্য ঘাতক অ্যাপে কথা বলেছেন। এ ক্ষেত্রে শিমুল ইন্দোনেশিয়ার একটি ফোন নম্বর ব্যবহার করেছেন। আনারকে খুনের কারণ হিসেবে শিমুল জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, ‘এমপি আনারের ওপর দীর্ঘদিন থেকেই তার ব্যাপক ক্ষোভ ছিল। শিমুলের বোন লুচি খানমের সঙ্গে তার ফুপাতো ভাই ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুর সদরের ডা. মিজানুর রহমান টুটুলের বিয়ে হয়েছিল। পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল-লাল পতাকা) কেন্দ্রীয় নেতা টুটুল ছিলেন শাহীনের চাচাতো ভাই। সেই হিসেবে তারা ছিলেন বেয়াই। ২০০৯ সালের ২৫ জুলাই র‌্যাব ঢাকার উত্তরা থেকে ডা. টুটুলকে আটক করে। ওই বছর ২৭ জুলাই ভোররাতে নওগাঁয় র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যান বিসিএস ক্যাডার এ চিকিৎসক। টুটুলের আটক হওয়া ও পরে বন্দুকযুদ্ধে মারা যাওয়ার ঘটনায় এমপি আনারকেই দায়ী করতেন শিমুলসহ এমএল-লাল পতাকার নেতাকর্মীরা। তাই আনারের ওপর পুরনো ক্ষোভ ছিল শিমুলের। প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য মরিয়া ছিলেন তিনি।

জিজ্ঞাসাবাদে শিমুল আরও জানান, আনারের ইন্ধনে ২০০৭-০৮ সাল থেকে বিপুলসংখ্যক এমএল-লাল পতাকার নেতাকর্মী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার এবং ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যান। আনারের কারণে শিমুল নিজেও বহু বছর আত্মগোপনে ছিলেন। পরে গ্রেপ্তারও হন। সবকিছু মিলিয়ে আনারের ওপর শিমুলের ক্ষোভের মাত্রা ছিল ব্যাপক। তাই যখনই আনারকে হত্যার জন্য শাহীন প্রস্তাব দেন তখন শিমুল তাতে রাজি হয়ে যান। শাহীনের পরিকল্পনা অনুযায়ী শিমুল নিজে উপস্থিত থেকে কিলিং মিশন বাস্তবায়ন করেন।

ওই কর্মকর্তারা আরও বলেন, শিমুল গ্রেপ্তারের পর ডিবির কর্মকর্তাদের বলেছিলেন, এমপি আনারকে একটি চেয়ারে বসিয়ে বালিশচাপা দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এরপর লাশ টুকরো টুকরো করে খালে ফেলে দেওয়া হয়। পরে খুনের আরেক রকম বর্ণনা দেন। বলেন, খুনের উদ্দেশ্যে নয়, আপত্তিকর ছবি তুলে (ব্ল্যাকমেইল করে) টাকা আদায়ের লক্ষ্যে আনারকে তারা ফ্ল্যাটে ডেকে নিয়েছিলেন। অতিরিক্ত চেতনানাশক (ক্লোরোফর্ম) প্রয়োগের ফলে আনারের জ্ঞান ফেরেনি। এরপর তাকে বালিশচাপা দিয়ে খুন করা হয়। আবার বলেন, খুনের আগে স্বর্ণ ও হুন্ডির টাকা কোথায় রেখেছে এ নিয়ে বাগ্বিতন্ডায় জড়ান আনার। একপর্যায়ে সিয়ামসহ অন্যদের সঙ্গে আনারের সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়। পরে তার মুখে চেতনানাশক স্প্রে করা হয়। মরদেহ গুম করতে লাশের খণ্ডিত অংশ বাইরে ফেলা নিয়েও একেকবার একেক রকম তথ্য দেয় পেশাদার কিলার শিমুল।

যেসব তথ্য দিচ্ছে জিহাদ : আনারের মরদেহ টুকরো করার জন্য ঘাতক শিমুল সঙ্গে নেন কসাই জিহাদ ও মোস্তাফিজ ওরফে ফয়জুল নামে আরেক সহযোগীকে। জিহাদ ফেব্রুয়ারি থেকেই শাহীনের রাজারহাট এলাকায় থাকা ফ্ল্যাটে অবস্থান করছিলেন।

ফয়জুলকে খুঁজছে পুলিশ : আনার হত্যার আরেক ঘাতক ফয়জুল। কলকাতা সিআইডির এক কর্মকর্তা জানান, গ্রেপ্তারকৃতরা ভারতীয় ‘সিম’ ব্যবহার করেছিলেন। ফয়জুল এখনো গ্রেপ্তার না হলেও তার মোবাইলের ‘কল রেকর্ড ডিটেলস’ (সিডিআর) দেখে তার গতিবিধি জানার চেষ্টা চলছে। একটি ক্যাব ভাড়া করে ঘটনার পর ঘাতকরা বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছিল। ক্যাবটি চিহ্নিত করার কাজ করছেন তদন্তকারীরা। এর আগে লাল ও সাদা রঙের দুটি গাড়ি জব্দ করা হয়েছে। গাড়িগুলোর চালককে জেরা করা হয়েছে। নিউ টাউনের যে ফ্ল্যাটে আনার খুন হয়েছেন, তার মালিক এবং কেয়ারটেকারের সঙ্গে কথা বলেছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ ও ঢাকার ডিবি।

লাশ না পেলে মিলবে না মৃত্যুসনদ : আনারের লাশ এখনো উদ্ধার করা যায়নি। টানা কয়েক দিন ধরে নিরলস তল্লাশির পরও মেলেনি কিছুই। লাশ না পেলে কোনো ধরনের ডেথ সার্টিফিকেট বা মৃত্যুসনদ জারি করা যাবে না। কলকাতার আইন অনুযায়ী মৃত কোনো ব্যক্তির লাশ পাওয়া না গেলে মৃত্যুসনদ জারি করতে সাত বছর সময় লাগতে পারে। এটি প্রতিষ্ঠিত আইন। সাত বছরের অপেক্ষা বাধ্যতামূলক। লাশ নেই, মৃত্যুসনদও নেই। সাত বছর পার হওয়ার পর সিআইডির কাছে খোলা একমাত্র পথ থাকবে ভারতীয় সংবিধানের ২২৬ ধারার অধীনে কলকাতা হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন করা। পরে উচ্চ আদালত প্রশাসনের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার মাধ্যমে বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিতে পারে। সেই তদন্ত শেষ হলে, উচ্চ আদালত আদেশ জারি করতে পারে, যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যুসনদের সমতুল্য হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত