বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০২৪, ৩ শ্রাবণ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বিদেশ যেতে যে নিয়ম মানতে হয় মন্ত্রী-এমপিদের

  • অধিবেশন না চললে দেশের বাইরে যেতে সংসদের অনুমতির প্রয়োজন নেই
  • মন্ত্রীরা ছুটি নেন প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকারের কাছে
  • আসন শূন্যের জটিলতায় আইনের খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ চলছে
আপডেট : ২৮ মে ২০২৪, ১০:২৬ পিএম

চিকিৎসার জন্য ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে খুন হয়েছেন সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার। গত ২২ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে আনারের মরদেহ এখনো পাওয়া যায়নি। দুই দেশের পক্ষ থেকে আসামি গ্রেফতার এবং রিমান্ডে পাওয়া স্বীকারোক্তিতে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি অনেকটাই স্পষ্ট। 

এদিকে দেশের বাইরে গিয়ে সংসদ সদস্যের মৃত্যুর ঘটনায় মন্ত্রী এবং সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগত বিদেশ সফর ও দেশের বাইরে তাদের নিরাপত্তা কি হবে সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীরা ব্যক্তিগতভাবে কিভাবে দেশের বাইরে যান তা-ও আলোচনায় এসেছে।

আনোয়ারুল আজীম আনার

দেশের সংবিধান, কার্যপ্রণালী বিধি ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অধিবেশন না থাকলে একজন সংসদ সদস্য দেশের বাইরে গেলে তা স্পিকারকে অবহিত করা বাধ্যতামূলক নয়। তাছাড়া ব্যক্তিগত সফরে কোনো সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী যদি দেশের বাইরে যান তবে সেসব দেশে সাধারণত কোনো ব্যক্তি বিশেষ নিরাপত্তা পান না। 

কার্যপ্রণালী বিধি মোতাবেক, সংসদ অধিবেশন চলাকালে কোনো সংসদ সদস্য যদি দেশের বাইরে ব্যক্তিগত কাজে যান তবে তা স্পিকারকে অবহিত করবেন। অন্য সময় স্পিকারকে বিষয়টি অবহিত করা বাধ্যতামূলক নয়। 

কার্যপ্রণালী বিধির ১৭৯ অনুচ্ছেদের (১) ধারায় বলা হয়েছে,  ‘একাধিক্রমে ৯০ দিন বৈঠকে অনুপস্থিত থাকার জন্য অনুমতি লাভ করিতে ইচ্ছুক কোনো সদস্য তাহার অনুপস্থিতির আরম্ভ ও সমাপ্তির তারিখ এবং উহার কারণ নিকট লিখিতভাবে আবেদন করিতে পারিবেন তবে শর্ত থাকে যে যেকোনো সময়ে আবেদনকৃত অনুপস্থিতির মেয়াদ ৯০ দিনের অধিক হইবে না।’

মন্ত্রীদের ছুটির ব্যাপারে বলা আছে, প্রধানমন্ত্রীর কাছে তিনি তার ব্যক্তিগত ছুটির আবেদন করবেন এবং তিনি যদি মন্ত্রী ও একাধারে সংসদ সদস্য হন তাহলে স্পিকারকে অবহিত করবেন। আর টেকনোক্রেট কোটার মন্ত্রীদের ক্ষেত্রে তারা শুধু প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করে যাবেন। 

সংসদ সচিবালয়, সংসদ সদস্য এবং সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আনোয়ারুল আজীম আনারের বিষয়টি একটি ব্যতিক্রম ঘটনা। তিনি যদি স্পিকারকে চিঠিও দিয়ে যেতেন, তাহলেও যে দেশে তিনি গিয়েছেন সেখানে তার জন্য আলাদা নিরাপত্তার বিষয় নেই। এটা শুধু ভারতেই নয়, পৃথিবীর কোনো দেশেই বেসরকারিভাবে কোনো এমপি বা মন্ত্রী এবং ভিআইপিরা ভ্রমণ করলে বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকে না।

হাসানুল হক ইনু

এ ব্যাপারে জাতীয় সংসদে এমপি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু দেশ রুপান্তরকে বলেন, সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনোয়ারের ঘটনাটি একটা অনভিপ্রেত ঘটনা। এ ঘটনার সঙ্গে অন্য যা কিছুই জড়িত থাকুক না কেন, স্পিকারকে অবহিত করা না করা এর সঙ্গে যুক্ত নয়। তাছাড়া একজন সংসদ সদস্য দেশের বাইরে ব্যক্তিগত কাজে গেলে নিরাপত্তার বিষয় বিশেষভাবে হয় না। এটা শুধু ভারতে নয়, কোনো দেশই এই রকমের নিরাপত্তা দেয় না। কোনো দেশেই এমন নিয়ম নেই যে একজন সংসদ সদস্য বা কোনো দেশের একজন ভিআইপি দেশটি সফরে গিয়ে সংশ্লিষ্ট থানা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করবেন। শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় সফরে কিংবা যে দেশে যাচ্ছেন সে দেশের সরকারের কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণে গেলে সফর ঘিরে নিরাপত্তার বিষয় দেখেন।

জ্যেষ্ঠ এই সংসদ সদস্য ও জাসদের সভাপতি বলেন, আনোয়ারুল আজীমের ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম। এর জন্য সব আইন পরিবর্তনের সুযোগ নেই। এখানে ভারতের পক্ষ থেকেও কোনো সমস্যা নেই। একজন বিশেষ পাসপোর্টধারীর জন্য দ্রুত ইমিগ্রেশন পাওয়া সম্ভব। আবার কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী আনোয়ারুল আজীম গত ৫ মে সংসদের শেষ অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন। অধিবেশন চলাকালীন যদি তিনি দেশের বাইরে যেতেন তাহলে হয়তো ছুটি নেওয়ার বিষয় বা অনুমতির বিষয় থাকত।

চাঁদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুহম্মদ শফিকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংসদ সদস্যরা অধিবেশন চলাকালে দেশের বাইরে গেলে স্পিকারকে অবহিত করেন। আর বেশিদিন অর্থাৎ ৯০ দিনের মতো ছুটি লাগলে সেটির অনুমতি আগেও নিতে পারেন আবার পরে এসেও তিনি সংসদকে অবহিত করতে পারেন।

এই সংসদ সদস্য বলেন, আনারের বিষয়টি দুঃখজনক। আনারের আসন শূন্য ঘোষণার বিষয়ে যে জটিলতা রয়েছে এ প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, সব কিছুরই সমাধান আছে। সংসদ নেতা শেখ হাসিনা, স্পিকার, আইন বিশেষজ্ঞরা বসে অবশ্যই একটা সমাধান করবে।

আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল

এদিকে সংবিধান ও সংশ্লিষ্ট আইন বলছে, মরদেহ পাওয়া না গেলে সংসদে তার আসল শূন্য হওয়া নিয়ে জটিলতা দেখা দিতে পারে। সাধারণত চলতি সংসদের কোনো সংসদ সদস্য মৃত্যুবরণ করলে একদিনের মধ্যেই সংসদ সচিবালয় থেকে আসন শূন্য ঘোষণা করা হয় এবং নির্বাচন কমিশন পরবর্তীতে ওই আসনে উপনির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে থাকে। 

কিন্তু ঝিনাইদহ-১ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীমের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। তাছাড়া আনোয়ারুল আজীম সর্বশেষ অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন। সে হিসেবে অনুপস্থিতি দেখিয়েও আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সময় পাওয়া যাবে।

সংসদ সচিবালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এরমধ্যে বিষয়টি স্পিকার সংশ্লিষ্টদের নিয়ে কথা বলেছেন। এ নিয়ে আইনের খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ  চলছে। প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনা নেবে সংসদ।

এদিকে গতকাল আনোয়ারুল আজীমের মরদেহের অংশ পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদ জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। তিনি বলেন, আমরা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। একমাত্র ডেডবডি ছাড়া খুনের সমস্ত ইনফরমেশনই আমরা পেয়েছি। যারা যারা এ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, যারা যারা খুন করেছেন, সব কিছুরই খবর আমরা পেয়েছি। তারা যেভাবে খুন করেছেন তাতে ডেডবডি উদ্ধার করাই বাকি আছে।

মরদেহ না পাওয়া গেলে কোনো আইনি জটিলতা হবে কিনা এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যারা যারা দেখেছেন, যারা যারা হত্যা করেছেন, তারা তো স্বীকার করেছেন। সেখানে কী হবে তা আইন বিশেষজ্ঞরা বলবেন এবং আইন মন্ত্রণালয় বলতে পারবে। 

সংসদ সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব কে এম আবদুস সালাম গণমাধ্যমকে বলেন, চলতি সপ্তাহে বিষয়টি নিয়ে স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত