বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০২৪, ৩ শ্রাবণ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

নেলসন ম্যান্ডেলাকে কি ভুলতে বসেছে দক্ষিণ আফ্রিকা?

  • বেকারত্ব, দুর্নীতি, অপরাধ আর সন্ত্রাস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জর্জরিত দক্ষিণ আফ্রিকা
  • দেশটির এমন পরিস্থিতি থেকে বের হতে নতুন নেতৃত্বের কাউকে চাইছে তরুণ প্রজন্ম
আপডেট : ০৩ জুন ২০২৪, ০৩:২৩ পিএম

বিংশ শতাব্দীর সর্বশেষ ও জীবন্ত সংগ্রামী ছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা। তিনি ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং আকর্ষণীয় রাষ্ট্রনায়কদের একজন, যিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদের অবসান ঘটিয়ে বহু বর্ণ ভিত্তিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, প্রখর রসবোধ, উদারতা এবং বর্ণাঢ্য ও নাটকীয় জীবন কাহিনী, সব মিলিয়ে নেলসন ম্যান্ডেলা ছিলেন এক জীবন্ত কিংবদন্তী।

বর্ণবাদের অবসানের পর ১৯৯৪ সালের ১০ই মে নতুন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন নেলসন ম্যান্ডেলা। সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গ শাসিত দক্ষিণ আফ্রিকায় এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ছিল এক অকল্পনীয় ঘটনা।

এই পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা। শুধু দক্ষিণ আফ্রিকায় নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায়ও তিনি ভূমিকা রাখেন।

তরুণ নেলসন ম্যান্ডেলা

১৯১৮ সালে নেলসন ম্যান্ডেলার জন্ম। তাঁর বাবা ছিলেন ইস্টার্ণ কেপ প্রদেশের থেম্বো রাজকীয় পরিবারের কাউন্সিলর। বাবা নাম রেখেছিলেন রোলিহ্লাহলা ডালিভুঙ্গা মানডেলা। স্কুলের এক শিক্ষক তার ইংরেজী নাম রাখলেন নেলসন। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার আপামর মানুষের কাছে তিনি ছিলেন ‘মাদিবা’।

তরুণ বয়সে নেলসন ম্যান্ডেলা জোহানেসবার্গে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের যুব শাখার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়েন দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনে। একই সঙ্গে তিনি কাজ শুরু করেন একজন আইনজীবী হিসেবেও।

১৯৬০ সালে বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন তীব্র হলে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে নেলসন ম্যান্ডেলাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি কারাগারে বন্দি থাকলেও দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ টাউনশীপগুলোতে বর্ণবাদ বিরোধী লড়াই অব্যাহত থাকে। দীর্ঘ ২৭ বছর কারাভোগের পর তিনি মুক্তি পান ১৯৯০ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারী।

পুরনো দক্ষিণ আফ্রিকাকে পেছনে ফেলে নতুন আফ্রিকা গড়ার কাজটা সহজ ছিল না। কিন্তু নেলসন ম্যান্ডেলা অতীতের তিক্ততার প্রতিশোধ নেয়ার পরিবর্তে তার সাবেক শ্বেতাঙ্গ নিপীড়কদের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিলে শুরু হয় এক নতুন দক্ষিণ আফ্রিকার পথ চলা। ১৯৯৪ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন নেলসন ম্যান্ডেলা।

দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারের সাথে শান্তি আলোচনায় অবদান রাখার জন্য ১৯৯৩ সালে নেলসন ম্যান্ডেলাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়।

নেলসন ম্যান্ডেলার জনপ্রিয়তা

নেলসন ম্যান্ডেলার অসীম সাহস, দক্ষ নেতৃত্ব ও নিঃস্বার্থ নীতির জন্য সারা বিশ্বের মানুষ তার প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। শান্তির স্বপক্ষে কাজ করা এবং আফ্রিকার নবজাগরণে ভূমিকা রাখার জন্য তিনি ২৫০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন।

এছাড়া মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট সদস্যদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে বিশ্ববরেণ্য এই মহান নেতাকে মর্যাদাপূর্ণ কংগ্রেশনাল স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়।

তাকে দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যে গভীর শ্রদ্ধার সাথে দেখা হয় এবং দেশটিতে তাকে তার বংশের নাম মাদিবা দ্বারা উল্লেখ করা হয় এবং "জাতির পিতা" হিসাবে বর্ণনা করা হয়।

বিশ্বব্যাপী একটি অ-বর্ণবাদী সাংবিধানিক গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। এই গণতন্ত্র মানুষের মর্যাদা, সাম্য এবং অন্যান্য ধরণের স্বাধীনতা অর্জন নিশ্চিত করবে। সংখ্যালঘুদের অধিকার পূরণ করা হবে বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। যার কারণে বিশ্বব্যাপী তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করেন এই নেতা।

জীবদ্দশায় তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যাঁকে ক্ষমতার ক্লেদ স্পর্শ করতে পারেনি। আর তাই ম্যান্ডেলা তাঁর দেশের সীমা ছাড়িয়ে সবার কাছে এক আদর্শ হয়ে উঠেছিলেন। যে আদর্শ বিশ্ববাসীকে ক্ষমতা ও সম্পদের প্রতি নির্মোহ থাকতে এবং জাতি-ধর্ম-বর্ণের ভেদরেখামুক্ত এক মানবতাবোধে উদ্বুদ্ধ করে। ২০১৩ সালের ৫ ডিসেম্বর তার বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।

জনগণ ভুলে যাচ্ছে নেলসন ম্যান্ডেলাকে?

১৯৯৪ সালে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই দক্ষিণ আফ্রিকায় ক্ষমতায় রয়েছে নেলসন ম্যান্ডেলার দল আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (এএনসি)। দীর্ঘ তিন দশক ধরে বর্ণবৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনীতিতে শাসন করে আসছে বিশ্বনেতার হাতে গঠিত দলটি।

কিন্তু এবার পরিবর্তন আসছে দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনীতিতে। দীর্ঘ আড়াই যুগ ক্ষমতায় থাকা দলটি এবার সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। দেশটির জাতীয় নির্বাচনে ৩০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ফলাফল করেছে এএনসি। ক্ষমতাসীন দলটি এবার ভোট পেয়েছে মাত্র ৪০ শতাংশ। ফলে জোট সরকারে যেতে হবে দলটিকে।

তাহলে কি দক্ষিণ আফ্রিকাতে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাকারী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলাকে ভুলতে বসেছে মানুষ? ভুলতে বসেছে তার নিঃস্বার্থ অবদান?

উত্তর পাওয়া যাবে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মধ্যেই। বেকারত্ব, দুর্নীতি, অপরাধ আর সন্ত্রাস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জর্জরিত এ দেশ। আর তাই নির্বাচনেও সেই ক্ষোভ প্রতিফলিত হয়েছে বলছেন ভোটাররা। দেশটির জনগণ বলছে নেলসন ম্যান্ডেলার নীতি ধরে রাখতে পারেননি বর্তমান প্রেসিডেন্ট রামাফোসা। যার কারণে দেশটিতে নেতৃত্বের পরিবর্তন চাচ্ছেন সবাই।

জনপ্রিয়তা হারিয়েছে এএনসি

দক্ষিণ আফ্রিকায় এক সময়ের তুমুল জনপ্রিয় দল আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের (এএনসি) প্রতি আস্থা হারাচ্ছেন দেশটির জনগণ।

দ্য ইকোনমিস্ট জানাচ্ছে, দেশটির মাত্র ২৯ শতাংশ মনে করে যে, তাদের জীবন আগামী পাঁচ বছরে আরও ভালো হবে। দুই দশক আগে গণতন্ত্র নিয়ে অনেক দক্ষিণ আফ্রিকান যতটা সন্তুষ্ট ছিল এখন তার চেয়ে অনেক বেশি অসন্তুষ্ট তারা।

এক জরিপে দেখা গেছে, দেশটির ৭৯ শতাংশ জনগণ রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি আস্থা হারিয়েছে। ইকোনমিস্ট ডটকম আরও বলছে, ১৯৯৪ সালে গণতন্ত্রে ফিরে আসার প্রথম ১৫ বছরে দেশটিতে জনগণের জীবনে ব্যাপক উন্নতি হলেও বিগত ১৫ বছরে তা ‘মারাত্মক’ হয়ে উঠেছে। ২০০৮ সালে বেকারত্ব ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৩ শতাংশ। গত বিশ বছরে দক্ষিণ আফ্রিকায় খুনের হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

এক জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৭২ শতাংশ নাগরিক বলেছেন যে, অনির্বাচিত সরকার যদি তাদের চাকরি, নিরাপত্তা এবং আবাসন নিশ্চিত করতে পারে তবে তারা ভোট দেওয়া ছেড়ে দেবে।

অন্যদিকে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানাচ্ছে, বিভিন্ন ধরনের কর, অত্যধিক নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় সম্পত্তির ওপর অধিকারের দুর্বলতার কারণে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৪ সালের প্রথম তিন মাসে দক্ষিণ আফ্রিকায় বেকারত্ব ছিল ৩২.৯ শতাংশ। ১৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের জন্য এ হার ৪৫.৫।

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জনগণ বলছেন, গত এক বছরে তাদের দেশে দুর্নীতি আরও খারাপ হয়েছে। তাদের জ্বালানি অবকাঠামো পুরনো এবং ব্যবস্থাপনার অভাবে ধুঁকছে। এ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পরিষেবা এসকমকে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২৮০ দিন বিভিন্ন সময়ে ব্ল্যাকআউট দিতে হয়েছিল।

ক্ষুব্ধ তরুণ প্রজন্ম

ব্যাপক দুর্নীতি, দারিদ্রতা, বেকারত্ব এবং খুনের হার বেড়ে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ দক্ষিণ আফ্রিকার তরুণ প্রজন্ম। এ পরিস্থিতিতে আর থাকতে চায় না দেশটির তরুণরা। যে কারণে পরিস্থিতি বদলাতে নির্বাচনকেই অবলম্বন হিসেবে ব্যবহার করতে চাচ্ছে তারা।

তরুণ প্রজন্মের ভাবনা দেশটির এমন পরিস্থিতি থেকে বের হতে দরকার নতুন কাউকে। প্রয়োজন নতুন নেতৃত্বের। আর তাই আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (এএনসি) এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার বদলে নতুন কাউকে চাইছে দেশটির তরুণদের পাশাপাশি অধিকাংশ জনগণ।

তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত