বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই ২০২৪, ৯ শ্রাবণ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ভারতের নির্বাচনে ইউটিবারদের কৃতিত্ব কতটুকু?

আপডেট : ০৬ জুন ২০২৪, ১০:১১ পিএম

ভারতে এক ঐতিহাসিক নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হলো। ঐতিহাসিক শব্দটা অতি ব্যবহারে ক্লিশে হলেও এই নির্বাচনের বেলায় তা ব্যবহার করা যেতেই পারে। এই নির্বাচনে ৬৪ কোটির বেশি মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন যা পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি। এই ভোটারদের ৩১ কোটির বেশি ছিল নারী, যা আরেকটি বিশ্বরেকর্ড। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশটি আরো একবার গণতান্ত্রিক কায়দায় সে দেশের মানুষের ম্যান্ডেট নেয়ার গৌরব অক্ষুন্ন রাখল।

তবে কেবলমাত্র সংখ্যা আর ইতিহাসই নয়, এই বিপুল যজ্ঞের আরো অসংখ্য আকর্ষণীয় দিক ছিল। টানা দুইবার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিজেপি আরো বড় জয়ের আশা করেছিল, আর ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল, স্বাধীনতার পর কয়েক দশক টানা ক্ষমতায় থাকা কংগ্রেসের জন্য ছিল বাঁচা মরার লড়াই। সারা দুনিয়াতেই যেখানে লোকরঞ্জনবাদের প্রবল উত্থানে পৃথিবী রাজনীতি হয়ে পড়েছে ঘৃণা, বিদ্বেষ আর সংখ্যালঘু নিধনের, সেখানে পুরো দুনিয়া রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছিল ভারতের নির্বাচনের ফল নিয়ে।

এ কারণে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। দেশ-বিদেশে রাজনৈতিক কর্মী, সমর্থক, বিশ্লেষক ও উৎসাহীরা প্রথাগত ভোটযুদ্ধের বাইরে ডিজিটাল মাধ্যমে আরেক মহাযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন। শয়ে শয়ে ভিডিও, মিম, বাকযুদ্ধ ইত্যাদির মূল লক্ষ্য ছিল ভোটারদের প্রভাবিত করা। 

ভারতে দারিদ্র্যর হার এখনো অনেক বেশি হলেও প্রযুক্তি এবং বিশ্বায়নের কল্যাণে ইন্টারনেটের ব্যবহার অবিশ্বাস্য রকম বৃদ্ধি পেয়েছে। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, ভারতে ১২০ কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন যাদের ১০৫ কোটিই মূলত মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। সে দেশের ১২০ কোটি মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর মধ্যে ৬০ কোটি স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। ফলে শহর হোক কিংবা অজোপাড়া গা, এমনকি যাতায়াতের রাস্তা না থাকলেও ইন্টারনেট পৌঁছে গেছে প্রায় সব জায়গায়। আর বড় রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে রাজনীতি সংশ্লিষ্ট সকলেই এর শক্তি সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত ছিলেন।

 
এমনকি ‘বিজেপির আইটি সেল’ কথাটি নেটিজেনদের মধ্যে, বিশেষত বিজেপি বিরোধীদের চোখে কুখ্যাত এক প্রচারযন্ত্র। ফেক নিউজ বা ভুয়া সংবাদ, সংখ্যালঘু বিশেষত মুসলিমদের বিরুদ্ধে তীব্র বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও মিথ্যাচার, ধর্মকে কাজে লাগিয়ে হিন্দু ভোটারদের হাত করাসহ নানা অনলাইন কার্যক্রম অন্যান্য দেশের লোকরঞ্জনবাদী শক্তিগুলোর মডেলেই তথাকথিত বিজেপির আইটি সেল বা বিজেপির সমর্থকেরা করে আসছে কয়েক বছর ধরে। গত কয়েক বছরে আরো একটি জনপ্রিয় টার্ম হচ্ছে হোয়াটসঅ্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়। জনপ্রিয় মাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপে নানারকম ভুল ইতিহাস শিক্ষা দিয়ে বিশেষত হিন্দুত্ববাদ প্রচার ও মুসলিম বিদ্বেষ ছড়ানো হয়। বলাই বাহুল্য, একাডেমি বা প্রকৃত ইতিহাস নয়, বরং মনগড়া ইতিহাস চর্চার কারণেই একে কতকটা ব্যঙ্গ করে হোয়াটসঅ্যাপ বিশ্ববিদ্যালয় বলে।

এসবের পাশাপাশি সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে ইউটিউব ভিডিওর প্লাবন। যেহেতু ভারতে স্মার্টফোন ব্যবহার বাড়ছে এবং ইন্টারনেটের গতি একেবারে উচ্চ না হলেও ইউটিউবের ভিডিওর জন্য উপযুক্ত, ফলে এই মাধ্যমটি প্রবল জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততার পাশাপাশি ভারতে শিক্ষার হার কম হওয়ায় এই জনপ্রিয়তা বড় কারণ।

ফলশ্রতিতে শুধু বিজেপি নয়, বিজেপি বিরোধীরাও এবার এই মাধ্যমকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার দিকে নজর দিয়েছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে বিজেপি মূলধারার মিডিয়াকে মোটামুটি কব্জা করে ফেলেছে, এর ফলে মিডিয়াও অনেকটা গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। এই কারণে কেবল অপেশাদার, শৌখিন ইউটিউবাররাই কেবল নয়, পেশাদার সাংবাদিক ও অনেক গণমাধ্যমও একে ব্যবহার করেছে।
 
টেক্সট থেকে ভিডিওর এই রূপান্তরটা এবার বিজেপি বিরোধী সেকুলার, শিক্ষিত ও তরুণেরা বুঝতে পেরেছেন। তারা দীর্ঘদিন ধরে বিজেপির নানা প্রোপাগান্ডা এবং দেশচালনায় নানা অসংগতির কথা ধৈর্য্যের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন।
 
এখানে কিছু তাত্ত্বিক কথা বলা দরকার। সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, মিডিয়া মারফত যে প্রোপাগান্ডা তা হচ্ছে রাজনীতির মাঠে ব্যাকস্টেজ বা পেছনের সারি। এর একটা বড় কাজ হচ্ছে, দীর্ঘ সময় ধরে হাতুড়িপেটার মতো করে মানুষের মন ও মতামতকে গঠন করা। তবে একইসাথে এই ব্যাপারটা মাথায় রাখা জরুরি যে, মিডিয়ার একটা বড় দুর্বলতা হলো বেশিরভাগ মানুষই সেই বক্তব্যটাই নেয় যা সে বিশ্বাস করে। টেক্সট বা ভিডিওতে তার মতের সঙ্গে মিললেই কেবল সে তা বিশ্বাসযোগ্য মনে করে। একে তাত্ত্বিকভাবে বলা হয় কনফার্মেশন বায়াস।

ফলে মিডিয়ার যে বিপুল শক্তির কথা বলা হয়, আদতে এতোটা নাও হতে পারে। ধরা যাক, আপনি বিশ্বাস করলেন জনাব ক খুব খারাপ মানুষ। সারাদিনে আপনি ২০টা মিডিয়ার বক্তব্য শুনলেন যাতে ১৫টাতে বলা হলো ক খুব ভালো, আর পাঁচটাতে বলা হলো ক খারাপ। কনফার্মেশন বায়াস যেটা করে তা হচ্ছে সে যুক্তি, উপাত্ত থাকলেও সেই ১৫টা মিডিয়ার বক্তব্যকে উড়িয়ে দিতে পারে। যিনি শুনছেন তার মনে হতে পারে এইসব মিডিয়া আসলে ভিত্তিহীন কথা বলছে, এরা ক এর দোসর। আর যেই পাঁচটা মিডিয়া ক কে খারাপ বলছে তার উপাত্ত ও যুক্তি খুব শক্ত না হলেও মনে হবে এরাই সত্যর পক্ষের। 

তাহলে ব্যাপারটা কি দাঁড়ালো? রাজনীতির মাঠ যেহেতু বিশ্বাস, আশা ও আশঙ্কা এই তিনের সমন্বয়ে গড়া, এখানে সমীকরণটা এত সরল না। সমর্থন অর্জন বা হারানো একটা জটিল প্রক্রিয়া যা অধিকতর জটিল মানবমনের ওপর, সমষ্টির ওপর কিভাবে কাজ করবে তা সহজে বলে ফেলা সম্ভব না।

কিন্তু নিশ্চিতভাবেই বলা যায় রাজনীতির মাঠে যোগাযোগ খুব জরুরি। ভারতের নির্বাচনের ক্ষেত্রেই যদি আমরা দেখি, বিজেপি বিরোধীদের প্রবল উচ্ছ্বাসের পরেও দলটি সবচেয়ে বেশি আসন জিতেছে। আবার সরকার গঠন করা প্রায় নিশ্চিত। কিন্তু গত কয়েক বছরে মাঠের রাজনীতির দিকে যদি তাকানো যায় তবে দেখা যাবে, প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস কেবল মাটি কামড়ে মাটি পড়েছিল তাই নয়, নানা রাজ্যের বিজেপি বিরোধীদের একজোট করতে পেরেছে যারা ঐতিহাসিকভাবেই প্রচণ্ডভাবে কংগ্রেস বিরোধী। যেমন পশ্চিমবঙ্গের মমতা বন্দোপাধ্যায়।


দ্বিতীয় মেয়াদে বিজেপি আর নরেন্দ্র মোদির আকর্ষণ অনেকটা ফিকে হয়েছে। নানারকম দুর্নীতি যেমন তাদের প্রশ্নবিদ্ধ করেছে তেমনি প্রবল ধর্মীয় উন্মাদনা অনেককে বিচলিত করেছে। কংগ্রেসের কৌশল আর বিজেপির অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের ফলে নির্বাচনের হাওয়া অনেকটা ঘুরেছে। কৃষকদের পদযাত্রা, বিভিন্ন রাজ্যে আন্দোলন এই পরিবর্তনে গতি দিয়েছে।

ফলে বলাই যায় শিক্ষিত মধ্যবিত্তের যে ইউটিউবের প্রতি অত্যাধিক মোহ, ইউটিউবই এই নির্বাচনের হাওয়া ঘুরিয়ে দিয়েছে এইরকম আলাপ বাড়াবাড়ি। মধ্যবিত্ত ঐতিহাসিকভাবে নিজেদের রাজনীতির গেম চেঞ্জার মনে করে, কিন্তু গত কয়েক দশকে ভারতসহ দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে সম্পদের অসাম্য বেড়েই চলছে। এর ফলে মধ্যবিত্ত কেবল বিত্তের দিক দিয়ে ক্ষমতা হারাচ্ছে তাই না, নিম্নবিত্তের সঙ্গে একজোট হতে না পারায় শ্রেণি হিসেবে নিজেদের আধিপত্য খোয়াচ্ছে। আবার যেহেতু এই শ্রেণিটার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার শিক্ষা, তারা পুরাতন অহমিকা ও আধিপত্য হারানোটা সহজে মানতে চাইছে না।
 
যে কারণে একজন শিক্ষিত ইউটিউবার, যার ভিডিও গড়ে কয়েক লাখ মানুষ শোনে (এদের অনেকেই ভোটার নন), তিনি একাই এই নির্বাচনের হাওয়া বদলে দিয়েছেন এ ধরনের কথা মধ্যবিত্তের সেই জাত্যভিমানের ঘায়ে প্রলেপ দেয়। ভেবে নেয়, আমরাই এখনো গেমচেঞ্জার। এ দাবিটা কিছুটা বাড়াবাড়ি হলেও ভোট, রাজনীতি, সমর্থনের এই জটিল সমীকরণে ইউটিউব বা যে কোনো মাধ্যমের শক্তিকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সামনের দিনে এর শক্তি আরো অনেক বেশি বাড়বে। বহুকিছুর জটিল সমীকরণে আরো গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হয়ে উঠবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত