শনিবার, ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

আঁচল ফাউন্ডেশন

আত্মহত্যার চিন্তা ৩৯ শতাংশ শিক্ষার্থীর

আপডেট : ০৮ জুন ২০২৪, ০৯:৫২ এএম

উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে পারেন না অনেকেই। পড়াশোনার মান ও হলের পরিবেশ নিয়ে অসন্তুষ্টি, জ্যেষ্ঠ সহপাঠী ও শিক্ষকদের বুলিং (বিরূপ আচরণ), যৌন হয়রানি, ভবিষ্যৎ পেশা নিয়ে দুশ্চিন্তা এবং মন খুলে কথা বলতে না পারার কারণে হতাশা ও বিষণ্ণতায় ভুগতে থাকেন অনেক শিক্ষার্থী। এমন পরিস্থিতিতে প্রচণ্ড মানসিক অস্থিরতা ও প্রতিকূল পরিবেশে খাপ খাওয়াতে না পারার কারণে ৩৯ শতাংশ শিক্ষার্থীর মনে আত্মহত্যার চিন্তা এসেছে। ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তারা ভবিষ্যৎ পেশাজীবন নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগছেন। বেসরকারি সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশনের এক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল শুক্রবার অনলাইনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির কারণ’ শিরোনামের ওই জরিপের তথ্য তুলে ধরা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেছেন, হতাশা, বিষণ্ণতা ও আত্মহত্যার প্রবণতা ঠেকাতে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে চলার মতো প্রস্তুত করে তুলতে হবে শিক্ষার্থীদের। তাদের মানসিক দৃঢ়তা বাড়ানোর প্রশিক্ষণ দিতে হবে। দেশের ৮৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ হাজার ৫৭০ জন শিক্ষার্থী জরিপে অংশ নেন।

জরিপের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে হতাশার বিভিন্ন উপসর্গে ভোগেন বলে জানিয়েছেন। তাদের ক্লান্তি, ওজন কমে যাওয়া, কোনো কিছু উপভোগ না করা, ঘুমের ধরনের পরিবর্তন, আত্মহত্যার চিন্তা, কাজে মনোযোগ দিতে না পারা ইত্যাদি অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৩ শতাংশ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬১ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তারা এ ধরনের উপসর্গের মধ্য দিয়ে গেছেন।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩২ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। প্রায় ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী সরকারি চাকরি করতে চান, প্রায় ১০ শতাংশ ব্যবসা বা উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন, মাত্র ৭ শতাংশ বেসরকারি চাকরি করতে চান। পেশাজীবন নিয়ে এখনই কোনো ভাবনা নেই প্রায় ২২ শতাংশ শিক্ষার্থীর।

শিক্ষার্থীদের একটি অংশ জানিয়েছেন, জ্যেষ্ঠ সহপাঠী ও শিক্ষকদের বুলিং, যৌন হয়রানি তাদের বিষণ্ণতার দিকে ধাবিত করে। ৩১ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তারা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হয়েছেন সহপাঠী ও জ্যেষ্ঠ সহপাঠীদের হাতে, এ হার প্রায় ৮৬ শতাংশ। প্রায় ৩৪ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তারা শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে অসস্তুষ্ট। ৫৯ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তারা মন খুলে কথা বলার মতো কোনো শিক্ষক পান না।

জরিপের তথ্যে আরও উঠে এসেছে যে, প্রচণ্ড মানসিক অস্থিরতা ও প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে উঠতে না পারা থেকে অনেকের মনে আত্মহত্যার চিন্তা এসেছে। জরিপে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৬ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন, আত্মহত্যার চিন্তা এসেছে কিন্তু আত্মহত্যার চেষ্টা করেননি ৩৯ শতাংশ, আত্মহত্যার চিন্তা এসেছে এবং উপকরণও জোগাড় করেছেন ৭ শতাংশ। এ ছাড়া মা-বাবার সঙ্গে অভিমান, প্রেমঘটিত বিষয়, অর্থনৈতিক সমস্যা, অন্যরা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করায় আত্মহত্যা করার চিন্তা এসেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তবে প্রায় ৪৮ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তাদের মাথায় কখনো আত্মহত্যার চিন্তা আসেনি।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে সামাজিক সংস্কার, অসচেতনতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার অপ্রতুলতার বিষয়টিও উঠে এসেছে জরিপের তথ্যে। প্রায় ৩৬ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয় না। ২৬ শতাংশ শিক্ষার্থী এ সম্পর্কে কিছু জানেন না।

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশার উপসর্গ অনুভব করার হার বেশি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তথ্য বলছে, ৮৩ দশমিক ৪ শতাংশ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বিষণ্ণতার উপসর্গগুলোর মুখোমুখি হয়েছেন। বাকি ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের মধ্যে হতাশার উপসর্গ দেখা যায়নি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মদ্যে হতাশার চিত্র তুলনামূলক কম। ৭৯ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তারা হতাশার উপসর্গগুলো অনুভব করেছেন। অন্যদিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তারা এ ধরনের উপসর্গের মধ্য দিয়ে গেছেন।

সংবাদ সম্মেলনে ক্যাম্পাসে কাউন্সেলিং ইউনিটের ব্যবস্থা করা, মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মশালার আয়োজন করা, নিরাপদ বাসস্থান ও উন্নতমানের খাদ্যব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক উন্নয়ন, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী ও শিক্ষা-সংক্রান্ত মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

 ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল উদ্দীন আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘পরিবার ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষের দায়িত্ব রয়েছে শিক্ষার্থীরা কেন হতাশা ও বিষণ্ণতায় ভুগছে, তা বোঝা ও সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। বিশেষ করে হলের পরিবেশ নিয়ে যে অস্থিরতা, সেই সমস্যার সমাধান নিয়ন্ত্রণের মধ্যে। এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তিশালী একটি পক্ষের সদিচ্ছা দরকার। মা-বাবাকেও সচেতন হতে হবে সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্য গঠনে। প্রতিকূল পরিবেশ থেকেও যে উঠে দাঁড়ানো যায়, সেই সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।’

ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের (আইইউবি) সামাজিক বিজ্ঞান ও মানবিক বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ওবায়দুল্লাহ আল মারজুক বলেন, ‘মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক না থাকলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে বিপর্যয় নেমে আসে। তরুণরা সবচেয়ে বেশি মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকে। প্রস্তুতির অভাবে তারা পরিবারে একটি গণ্ডির মধ্য থেকে নতুন পরিবেশে এসে সব সময় খাপ খাওয়াতে পারেন না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরও এখানে দায়িত্ব পালন করতে হবে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত