সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ঈদের খুশি নয়, তাড়া করছে গ্রেপ্তার আতঙ্ক

আপডেট : ১৬ জুন ২০২৪, ০৮:৪৯ এএম

জনশক্তি রপ্তানিতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব ও মালয়েশিয়া। এই দুই দেশে কাজের জন্য প্রতি বছর হাজার হাজার বাংলাদেশি দেশ ছাড়েন। তবে সম্প্রতি এই দুই শ্রমবাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে সিন্ডিকেটের কারণে গত ৩১ মে বন্ধ হয়ে গেছে মালয়েশিয়া শ্রমবাজার। আর ‘ফ্রি’ ভিসায় সৌদি আরবে গিয়ে হাজার হাজার প্রবাসী অমানবিক জীবন পার করছেন। ঈদের খুশির পরিবর্তে এই দুই দেশের থাকা হাজারো অবৈধ বাংলাদেশিদের দিন কাটছে অনিশ্চয়তায়।

মালয়েশিয়া শ্রমবাজার বন্ধ হলেও ইতিপূর্বে কলিং ভিসায় দেশটিতে যাওয়া কর্মীরা এখন বিপাকে পড়েছেন। দালালের ওপর ভরসা করে দেশটিতে পাড়ি জমিয়েছেন হাজার হাজার কর্মী। কিন্তু কাজের বদলে এখন ওই দেশে বন্দি জীবন পার করতে হচ্ছে তাদের। কারণ দালালরা ওই দেশের কিছু অসাধু কোম্পানির কাছ থেকে ভিসা কিনে কর্মীদের দিয়েছেন। সেই ভিসায় দেশটিতে যাওয়ার পর কাজের বদলে অনেক বাংলাদেশি প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। কারণ দালালরা কাজ দিতে না পেরে তাদের বন্দি করে রাখছেন। 

এদিকে মালয়েশিয়া সরকার অবৈধ প্রবাসীদের বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রতিনিয়ত অবৈধ অভিবাসীদের ধরতে পুলিশ ব্যাপক ধরপাকড় চালাচ্ছে। সেই আতঙ্কে দিন কাটছে প্রবাসী অনেক বাংলাদেশি কর্মীর। 

কুষ্টিয়া কুমারখালীর আব্দুর রহমান। কাজের জন্য ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে মালয়েশিয়ায় যান। সেখানে যাওয়ার পর জানতে পারেন তার কাজ পেতে কিছুদিন লাগবে। তখন দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। দালাল কাজ দেওয়ার আশ্বাস দেন। কিন্তু তারপর কয়েক মাসেও কাজ দিতে পারেনি। পরে পরিচিতদের মাধ্যমে কিছুদিন লুকিয়ে দৈনিক ভিত্তিকে বিভিন্ন কাজ করতেন। কিন্তু মালয়েশিয়া শ্রমবাজার বন্ধের পর সেই কাজের সুযোগটিও হারিয়ে ফেলেছেন।

তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘এখন মালয়েশিয়া অবৈধদের ধরতে পুলিশ রোজ অভিযান চালায়। তাই আতঙ্কে দিন কাটছে। আগামীকাল ঈদ হলেও তেমন আনন্দ নেই। এখন একটাই চিন্তা ভালোভাবে দেশে ফিরতে চাই। পুলিশ ধরতে জেল খাটতে হবে।’ তার মতো মালয়েশিয়ায় থাকা অনেক প্রবাসী এখন অনিশ্চিত জীবন পার করছেন। 

জানা গেছে, মালয়েশিয়ার কোয়ান্তানে গত ১৩ জুন ১৮ বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের  ৪৩ অবৈধ অভিবাসীকে আটক করেছে ইমিগ্রেশন পুলিশ। দেশটির ইমিগ্রেশন বিভাগ জানায়, স্থানীয় জনসাধারণ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ১৩ জন কর্মকর্তার অংশগ্রহণে রাতে এই অভিযান চালানো হয়। অভিযানে ১০৯ অভিবাসীর কাগজপত্র পরীক্ষা শেষে অভিবাসন আইনের শর্ত লঙ্ঘন করায় ৪৩ জনকে আটক করা হয়। আটকদের মধ্যে ১৮ জন বাংলাদেশি, ৪ জন ইন্দোনেশিয়ান, মায়ানমারের ১৮ জন, ভারতের একজন এবং ২ জন পাকিস্তানের নাগরিক।

এদিকে মালয়েশিয়ার মতই ঝুঁকিতে রয়েছে সৌদি আরব শ্রমবাজার। দেশটিতে হাজার হাজার প্রবাসী অবৈধ হিসেবে বসবাস করছে। আকামা মেয়াদ না থাকা অনেক প্রবাসী ওই দেশের প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে জীবনযাপন করছেন। সৌদি আরবেও পবিত্র ঈদুল আযহা পালিত হচ্ছে। ঈদে সবাই আনন্দময় সময় পার করলেও অনেক প্রবাসীর মুখে হাসি নেই। কারণ একদিকে কাজ নেই, অন্যদিকে অবৈধ। যে কোন সময় পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারে এমন আতঙ্কে দিন কাটছে তাদের। 

নড়াইলের আব্দুল আলিম। দুই বছর আগে স্থানীয় দালাল পাঁচ লাখ টাকায় তাকে সৌদিতে পাঠান। চুক্তি ছিল রেস্টুরেন্টে কাজ দিবেন। আকামার মেয়াদ থাকবে এক বছর। কিন্তু সৌদিতে যাওয়ার পর দেখলেন উল্টো চিত্র। এক বছরের পরিবর্তে দালাল আকামার মেয়াদ দেন মাত্র তিনমাস। আর রেস্টুরেন্ট নয় তাকে পাঠিয়েছেন ফ্রি ভিসায়। এই খবর শোনার পর তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েন। দালাল নির্দিষ্ট কাজ না দিয়ে তাকে একস্থানে আটকে রাখেন। 

পরে সেই স্থান থেকে পালিয়ে তিনি সৌদির জিজান শহরে যান। পরিচিত একজনের সঙ্গে থাকতে শুরু করেন। কিছুদিন পরেই তার আকামার মেয়াদ শেষ হয়। তিনি ওই দেশে অবৈধ হয়ে পড়েন। ওই দেশের প্রশাসন আকামার মেয়াদ না থাকলে যে কোন সময় গ্রেপ্তার করতে পারে। তাই দিনের বেলা বাইরে বের হন না আলিম। দিন পার করছেন গ্রেপ্তার আতঙ্কে। 

সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, আবাসন, শ্রম ও সীমান্ত আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে চলতি মাসের এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০ হাজারের মতো বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত দুই বছরের বেশি সময়ের মধ্যে এটাই সর্বোচ্চ সংখ্যক গ্রেপ্তারের ঘটনা। গত ২৯ ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি মাস পর্যন্ত তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, আবাসন আইন লঙ্ঘনের দায়ে ১২ হাজার ৯৫১, সীমান্ত সুরক্ষা আইনে ৬ হাজার ৫৯২ এবং শ্রম আইনের আওতায় ৩ হাজার ৪৯৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আর বসবাসের অনুমতিহীনতা এবং শ্রম ও সীমান্ত আইন লঙ্ঘনের দায়ে ৪ হাজার ৬৯০ জন নারীসহ ৫৯ হাজার ৭২১ জনের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত প্রবাসীদের মধ্যে ৫২ হাজার ৮১৫ জনকে দেশে ফেরত পাঠানোর আগে ভ্রমণের প্রয়োজনীয় নথি জোগাড়ের জন্য কূটনৈতিক মিশনে পাঠানো হয়েছে। আরও ১ হাজার ৯৬৩ জনকে সৌদি আরব থেকে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের ৯ হাজার ১৭৯ জনকে সৌদি আরব থেকে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত