সৌদি আরবের জিজান শহরে থাকেন নড়াইলের সোবহান (ছদ্মনাম)। স্ত্রী ও পাঁচ বছরের ছেলে সন্তান রেখে গত বছর জানুয়ারিতে স্থানীয় দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে যান। দালাল রেস্টুরেন্টে কাজ দেয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু সৌদিতে নেওয়ার পর কাজের বদলে তাকে একটি কক্ষে বন্দি রাখেন। কাজ পাইয়ে দেওয়ার নামে অতিরিক্ত আরও দুই লাখ টাকা দাবি করেন। কিন্তু সৌদিতে যাওয়ার সময়েই পাঁচ লাখ টাকা ঋণ করেন সোবহান। তাই দুই লাখ টাকা ম্যানেজ করা তার পরিবারের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে। টাকা দিতে না পেরে কিছুদিন বন্দি অবস্থায় ছিলেন।
পরে স্থানীয় আরেকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেখান থেকে মুক্তি পান। মুক্তি পাওয়ার আগেই তার আকামা মেয়াদ শেষ হয়। আকামা মেয়াদ শেষ হওয়ায় অবৈধ হয়ে পড়েন। তখন থেকেই দুঃসহ জীবন কাটছে তার। সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের আশায় দেশ ছেড়ে এখন তার সঙ্গী হয়েছে হতাশা। বাড়িতে টাকা পাঠানো তো দূরের কথা নিজের দৈনন্দিন জীবন কাটাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সৌদি আরবে আজ পবিত্র ঈদুল আজহা পালিত হচ্ছে। এ বছর কেমন কাটল ঈদ সেই প্রশ্ন করা হয় সোবহানকে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যে ঋণ করে সৌদিতে এসেছিলাম, তা এখনো পরিশোধ হয়নি। তাই রোজ পাওনাদার বাড়িতে যায়। বউ-বাচ্চাকে নানান কথা শুনিয়ে আসে। তাই ঋণের বোঝা পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত শান্তি নেই। এদিকে আমি অবৈধভাবে সৌদিতে থাকি। এতে করে তেমন উপার্জন করতে পারছিনা। লুকিয়ে-পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে যা ইনকাম হয় তার কিছুটা বাড়িতে পাঠাই। তাই আমার ঈদ নেই, ঋণ আমার আনন্দ কেড়ে নিয়েছে।’
দেশের বাড়িতে থাকা স্ত্রী-সন্তানের কথা জানতে চাইলেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছেলের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই দেশে ফিরছি না। আমি যে ঋণে জড়িয়েছি তা আমার গলার কাঁটা হয়েছে। সন্তান ও স্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলি। ঈদের দিনও বলেছি। আশা ছিল সৌদিতে যাওয়ার পর ভাগ্য বদলাবে। কিন্তু আমার জীবনে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। আমার মতই আজ বিবর্ণ ঈদ কাটছে স্ত্রী-সন্তানের।’
শুধু সোবহান না ঠিক এমনই ঈদ কাটছে সৌদি আরবে থাকা হাজার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশির। যারা কয়েক লাখ টাকা ঋণ করে দালালের খপ্পরে পড়ে সৌদিতে গেছেন। যাদের অধিকাংশই গেছেন ফ্রি নামক ভিসায়। যে ভিসায় যাওয়ার পর কাজের বদলে তাদের পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হতে হচ্ছে। একদিকে দেশের গ্রামের বাড়িতে পরিবারের সদস্যের ওপর ঋণের বোঝা অন্যদিকে সেই ঋণ থেকে মুক্তি পেতে নিরন্তর প্রচেষ্টা করে যাচ্ছেন এসব প্রবাসীরা ।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত সৌদি আরবে গেছেন ৪৯ হাজার ২৬২ জন। গত বছর গেছেন ৪ লাখ ৯৭ হাজার ৬৭৪ জন। ২০২২ সালে ৬ লাখ ১২ হাজার ৪১৮ ও ২০২১ সালে ৪ লাখ ৫৭ হাজার ২২৭ এবং ২০২০ সালে গেছেন ১ লাখ ৬১ হাজার ৭২৬ জন। চলতি বছরসহ চার বছরে সৌদিতে গেছেন ১৭ লাখ ৭৮ হাজার ৩০৭ জন শ্রমিক। সৌদি আরবে এখন বাংলাদেশের শ্রমিকদের অনেকেই দুঃসহ জীবন পার করছে। এর মূলে রয়েছে দালালরা। তাদের খপ্পরে পড়ে নিঃস্ব অনেক প্রবাসী শ্রমিক। বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক নতুন করে প্রবাসীর তালিকায় যুক্ত হলেও সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাচ্ছে। এর জন্য দক্ষ শ্রমিকের অভাব এবং দালালের খপ্পরে পড়ে কাজ না পেয়ে বেকার থাকাকে দায়ী করছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্স এসেছিল ৪৫৪ কোটি ডলার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রেমিট্যান্স ৩৭৬ কোটি ডলারে নেমে আসে। আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) দেশটি থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ১৪২ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৯০ কোটি ডলারের বেশি।
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, আবাসন, শ্রম ও সীমান্ত আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে চলতি মাসের এখন পর্যন্ত ২৩ হাজার ৪০ জন বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত দুই বছরের বেশি সময়ের মধ্যে এটাই সর্বোচ্চসংখ্যক গ্রেপ্তারের ঘটনা। গত ২৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, আবাসন আইন লঙ্ঘনের দায়ে ১২ হাজার ৯৫১, সীমান্ত সুরক্ষা আইনে ৬ হাজার ৫৯২ এবং শ্রম আইনের আওতায় ৩ হাজার ৪৯৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আর বসবাসের অনুমতিহীনতা এবং শ্রম ও সীমান্ত আইন লঙ্ঘনের দায়ে ৪ হাজার ৬৯০ জন নারীসহ ৫৯ হাজার ৭২১ জনের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত প্রবাসীদের মধ্যে ৫২ হাজার ৮১৫ জনকে দেশে ফেরত পাঠানোর আগে ভ্রমণের প্রয়োজনীয় নথি জোগাড়ের জন্য কূটনৈতিক মিশনে পাঠানো হয়েছে। আরও ১ হাজার ৯৬৩ জনকে সৌদি আরব থেকে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের ৯ হাজার ১৭৯ জনকে সৌদি আরব থেকে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসীকল্যাণ ডেস্কের সহকারী পরিচালক দেবব্রত ঘোষ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন প্রতিদিন গড়ে বিভিন্ন দেশ থেকে ৩০০ জন আউট পাস নিয়ে দেশে ফিরছেন। তাদের মধ্যে অনেক সৌদি-প্রবাসীও আছেন। সম্প্রতি ওই দেশে আকামার মেয়াদ শেষ হওয়া শ্রমিকদের গ্রেপ্তার করছে পুলিশ। তবে সৌদি থেকে কতজন ফিরেছেন, এ রকম তথ্য আমাদের কাছে নেই।’
