উপমহাদেশের প্রাচীন ঈদগাহ ‘শোলাকিয়া’ নাম যেভাবে এল

আপডেট : ১৭ জুন ২০২৪, ০৮:২৯ এএম

কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়ায় এবার ঈদুল আজহার ১৯৭তম জামাত অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ঐতিহ্য ও রেওয়াজ অনুযায়ী বন্দুকের ফাঁকা গুলি ছোড়ার মধ্য দিয়ে এখানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়।

ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ময়দান উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও সর্ববৃহৎ ঈদগাহ। জানা যায়, তৎকালীন পাকিস্তান আমল ও ব্রিটিশ শাসনামলে এ মাঠে সুদূর আসাম ও কুচবিহার থেকে অসংখ্য ধর্মপ্রাণ মুসল্লি ঈদের নামাজ পড়তে এখানে আসতেন। পবিত্র ঈদের এই জামাতে এখনো জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসংখ্য মুসল্লির সাথে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের হাজারো মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন। এখানে বৃহত্তর ময়মনসিংহের জেলাগুলো ছাড়াও সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, নরসিংদী, ঈশ্বরদীসহ কয়েকটি জেলা থেকে অনেক মুসল্লি নামাজ আদায় করতে আসেন। পাকিস্তান আমলে থেকেই এ মাঠে দূর থেকে লোক আসার জন্য বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা রাখা হয়।

শোলাকিয়া মাঠের নাম নিয়ে দুটি জনশ্রুতির বর্ণনা আছে। এর একটি হলো, মুঘল আমলে এখানকার পরগনার রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল শ লাখ টাকা। মানে এক কোটি টাকা। কালের বিবর্তনে শ লাখ থেকে বর্তমান শোলাকিয়া হয়েছে। আরেকটি জনশ্রুতি হলো, ১৮২৮ সালে শোলাকিয়া ঈদগাহে সোয়া লাখ মুসল্লি একসঙ্গে ঈদের নামাজ আদায় করেন। সেই থেকে এটি শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

আবার কেউ কেউ বলেন, বারোভূঁইয়া নেতা ঈশা খাঁর বংশধর শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ ঈদের জামাতের মোনাজাতে ভবিষ্যতে মাঠে মুসল্লিদের প্রাচুর্যতা প্রকাশে ‘সোয়া লাখ’ কথাটি ব্যবহার করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৫০ সালে স্থানীয় দেওয়ান মান্নান দাদ খাঁ (মসনদ—ই—আলা ঈশা খাঁর ষষ্ঠ বংশধর) ঈদগাহের জন্য ৪ দশমিক ৩৫ একর জমি শোলাকিয়া ঈদগাহে ওয়াকফ করেন। এ মাঠে ২৬৫টি কাতার আছে। প্রতিটি কাতারে ৭০০ মুসল্লি নামাজের জন্য দাঁড়াতে পারেন। মুসল্লির উপস্থিতির দিক থেকে শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে অনুষ্ঠিত ঈদুল ফিতরের জামাতই উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ জামাত হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

এবার ঈদুল আজহার জামাত অনুষ্ঠিত হয় সকাল ৯টায়। জামাতে ইসলাহুল মুসলিমীন পরিষদ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ ইমামতি করার কথা ছিল। কিন্তু তিনি অসুস্থ থাকায় তার বিকল্প হিসেবে ইমামতি করেন জেলা শহরের বড় বাজার মসজিদের ইমাম হাফেজ মাওলানা শোয়াইব আব্দুর রউফ। 

কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের পূর্ব প্রান্তে মনোরম পরিবেশে ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের অবস্থান। এই মাঠের দক্ষিণ পাশে দিয়ে নরসুন্দা নদী পূর্ব-পশ্চিমে চলে গেছে। বর্তমানে ঈদগাহটির চারদিক প্রাচীরে ঘেরা। ঈদগাহের মূল মাঠে ২৬৫টি কাতার হয়। প্রতি কাতারে ৮০০ থেকে ৯০০ জন নামাজ পড়েন। সেই হিসেব অনুযায়ী এখানে ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৫০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। 

২০১৬ সালের ৭ জুলাইয়ের ভয়াবহ জঙ্গি হামলার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এবারও জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঈদগাহ ময়দান ও এর আশপাশে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রাসেল শেখ বলেন, ড্রোন ক্যামেরার মাধ্যমে পুরো এলাকার ফুটেজগুলো আমরা সংগ্রহ করবো। নিরাপত্তার ব্যাপারে কোনো ধরনের সন্দেহ হলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া প্রত্যেকটি গেটে আর্চওয়ে থাকবে। নিরাপত্তা বলয় পার হয়ে মাঠে প্রবেশ করতে হবে মুসল্লিদের।

নিরাপত্তার স্বার্থে ঈদগাহে কাউকে ছাতা নিয়ে ঢুকতে দেওয়া হবে না বলে জানান কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও ঈদগাহ মাঠ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, শুধু টুপি ও পাতলা জায়নামাজ নিয়ে মুসল্লিরা প্রবেশ করতে পারবেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত