বায়ুদূষণের কারণে ২০২১ সালে বাংলাদেশে ২ লাখ ৩৫ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা ১৯ হাজারের বেশি।
গতকাল বৃহস্পতিবার ইউনিসেফের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট (এইচইআই) থেকে প্রকাশিত ‘স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার ২০২৪’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশে শিশুদের ওপর বায়ুদূষণজনিত রোগের প্রভাব বেড়েই চলেছে’।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাপী বাতাসের মানের উদ্বেগজনক অবস্থা তুলে ধরে বলা হয়, এই পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ও বিশ্বজুড়ে শিশুদের জন্য বাতাসের গুণগত মান উন্নত করতে অবিলম্বে পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে ব্যাপক হারে ওজোন গ্যাসের উপস্থিতি রয়েছে, যা বায়ুদূষণজনিত রোগের অন্যতম কারণ। ২০২১ সালে বিশ্বব্যাপী ওজোন-সম্পর্কিত ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিসঅর্ডার (সিওপিডি) জনিত মৃত্যুর প্রায় অর্ধেক (৫০ শতাংশ) ঘটেছে ভারতে (২৩৭,০০০ মৃত্যু), চীনে (১২৫,৬০০ মৃত্যু) এবং বাংলাদেশে (১৫,০০০ মৃত্যু)।
বায়ুদূষণজনিত রোগের প্রভাব ও প্রাদুর্ভাব বিশ্বব্যাপী সমান নয় বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে মানুষের ইসকেমিক হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পেছনে বায়ুদূষণের অবদান গড়ে ২৮ শতাংশ হলেও ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার মতো উচ্চ আয়ের দেশগুলোয় এর হার ১০ শতাংশ; অন্যদিকে পূর্ব, পশ্চিম, মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলীয় আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় (যেমন নাইজেরিয়া, কেনিয়া, রুয়ান্ডা ও বাংলাদেশ) এর হার ৪০ শতাংশের বেশি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা বায়ুদূষণজনিত রোগের বেশি শিকার হয়ে থাকে। এর প্রভাবে অপরিণত অবস্থায় জন্মগ্রহণ, কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ, হাঁপানি ও ফুসফুসের রোগসহ বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দেয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালে বায়ুদূষণ-সম্পর্কিত কারণে বিশ্বব্যাপী পাঁচ বছরের কম বয়সী ৭ লাখের বেশি শিশুর মৃত্যু হয়। সারা বিশে^ এই বয়সী শিশুর মৃত্যুর প্রধান কারণ ‘অপুষ্টি’ ও দ্বিতীয় শীর্ষস্থানীয় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ‘বায়ুদূষণ’। এই শিশুদের মধ্যে প্রায় ৫ লাখ শিশুর মৃত্যু হয়েছে আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। এসব দেশে দূষিত জ্বালানি ব্যবহার করে ঘরের ভেতরে রান্না করাই ছিল এই বায়ুদূষণের কারণ।
শিশুর স্বাস্থ্যের ওপর বায়ুদূষণের ভয়াবহ প্রভাব তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, বায়ুদূষণের ফলে শিশুদেরই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেখা যায়। বায়ুদূষণের ক্ষতিকর এই প্রভাব শিশু মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থাতেই শুরু হয়ে সারা জীবনের জন্য স্থায়ী হতে পারে। প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের তুলনায় শিশুরা তাদের শরীরের ওজনের অনুপাতে শ্বাস নেওয়ার সময় বেশি বাতাস গ্রহণ করে। এ সময় তারা দূষিত বায়ুর সঙ্গে দূষিত সব উপাদানও গ্রহণ করে থাকে। এর মারাত্মক প্রভাব পড়ে তাদের বিকাশমান ফুসফুস, শরীর ও মস্তিষ্কের ওপর।
এ বছরের এসওজিএ প্রতিবেদনে বায়ুদূষণের স্বাস্থ্যগত প্রভাব এবং বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসংকট মোকাবিলায় সমন্বিত প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে দেশগুলো যখন জনস্বাস্থ্যবিষয়ক নীতিমালাকে আরও উন্নত করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশ তার জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য বায়ুদূষণ মোকাবিলায় একটি বড় চ্যালেঞ্জের সামনে রয়েছে।
সারা বিশ্বে এই বয়সী শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণ অপুষ্টির পরই বায়ুদূষণ দ্বিতীয় শীর্ষস্থানীয় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। দূষিত জ্বালানি ব্যবহার করে ঘরের ভেতরে রান্না করাই ছিল এই বায়ুদূষণের কারণ।
এ ব্যাপারে প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ইউনিসেফের রিপ্রেজেন্টেটিভ শেলডন ইয়েট বলেন, ‘বায়ুদূষণের কারণে লাখো মানুষ, বিশেষ করে শিশুরা স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। নিম্নমানের বাতাসের ক্ষতিকর প্রভাব শিশুদের ওপরই বেশি দেখা যায়। এর প্রভাবে তারা হাঁপানি ও নিউমোনিয়ার মতো রোগে আক্রান্ত হয়।
ইউনিসেফের এই প্রতিনিধি আরও বলেন, ‘শুধু আজ আমাদের শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও বাতাসের গুণগত মান উন্নত করতে টেকসই সমাধান বাস্তবায়ন করা গুরুত্বপূর্ণ।’
