নতুন কারিকুলামে পরীক্ষায় হ-য-ব-র-ল, প্রশ্ন ফাঁস

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২৪, ০২:২৬ এএম

নতুন কারিকুলামে গতকাল বুধবার ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির ষাণ¥াসিক সামষ্টিক মূল্যায়ন পরীক্ষা হয়েছে। নতুন কারিকুলামে প্রথম পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উৎকণ্ঠা ছিল। কেমন হবে প্রশ্নপত্র। কীভাবে উত্তর দিতে হবে। উৎকণ্ঠার পাশাপাশি নতুনত্বের উচ্ছ্বাসও ছিল। এত দিন স্কুলশিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিয়েছে মুখস্থ পড়ার ভিত্তিতে। কোনো কাগজ নিয়ে পরীক্ষার হলে বসা যেত না। কিন্তু এই পরীক্ষায় তার বই নিয়ে পরীক্ষার হলে যেতে পেরেছে। তবে চার শ্রেণির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র মঙ্গলবার রাতেই ফাঁস হয়েছে বলে গুঞ্জন ওঠে। পরীক্ষার্থীরা পড়া ফেলে নেমে পড়ে প্রশ্নের খোঁজে। পরীক্ষা শেষে সেই গুঞ্জন সত্যি হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্ন হুবহু মিল পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিভাবকরা।

এদিকে প্রশ্ন সম্পর্কে ধারণা না থাকায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে দুশ্চিন্তা ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়ায় অনেকেই এর সুবিধা পেয়েছে। তবে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা ইন্টারনেট-স্বল্পতায় বঞ্চিত হয়েছে প্রশ্নপ্রাপ্তি থেকে।

অভিভাবকরা বলছেন, ‘নতুন কারিকুলামের প্রথম পরীক্ষা। কিন্তু হতাশার বিষয় হচ্ছে, যেভাবে পরীক্ষা হয়েছে, এতে সন্তানরা নতুন কিছু শেখার বদলে নকল করা শিখবে। পরীক্ষার আগের দিন রাতেই ফেসবুকে প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়ে। অনেক শিক্ষার্থী সেই প্রশ্ন পড়েই পরীক্ষা দিয়েছে। সন্তানরা পরীক্ষা দিয়ে বের হয়ে আমাদের নানা প্রশ্ন করেছে।’

জানা গেছে, গতকাল ষষ্ঠ শ্রেণির বাংলা, সপ্তম শ্রেণির ধর্ম, অষ্টম শ্রেণির জীবন ও জীবিকা এবং নবম শ্রেণির ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান পরীক্ষা হয়েছে। পরীক্ষায় লিখিত অংশের মূল্যায়ন ৬৫ ও দলীয় কার্যক্রমভিত্তিক অংশের মূল্যায়ন হবে ৩৫ মার্কে। এই ১০০ মার্কের মূল্যায়ন পাঁচ ঘণ্টায় শেষ করতে হয় শিক্ষার্থীদের।

ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীর মা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে আমার মেয়ে পরীক্ষার প্রশ্ন পেয়েছে। শুরুতে দ্বিধায় ছিল, এই প্রশ্ন হয়তো বানানো হয়েছে। মূল পরীক্ষার প্রশ্নের সঙ্গে হয়তো মিলবে না। কিন্তু আজ (গতকাল) পরীক্ষায় প্রশ্ন পেয়ে দেখি ফেসবুকে পাওয়া প্রশ্নের সঙ্গে হুবহু মিল। তার মতো নাকি অনেকেই রাতে প্রশ্ন পেয়েছে। এই যদি নতুন কারিকুলামের পরীক্ষা পদ্ধতি হয়, তাহলে আমার সন্তান কী শিখবে? তারা তো নতুন কিছু শেখার বদলে চুরি/নকল করা শিখবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই প্রশ্ন দেখার পর আমি স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের জানিয়েছে এভাবে পরীক্ষা হলে সন্তানদের ভবিষ্যতের কী হবে। শিক্ষকরাও বিষয়টি নিয়ে হতাশার কথা জানিয়েছেন।’

এদিকে নতুন কারিকুলাম হওয়ার পরই সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির পরীক্ষার প্রশ্নসহ সমাধান’ পাওয়া-সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি পেজ ও গ্রুপ দেখা গেছে। যেসব পেজ ও গ্রুপেই এই প্রশ্নগুলো দেওয়া হয়েছে। এমনকি সমাধান দেওয়া হয়েছে। মূলত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা এসব পেজে গিয়ে প্রশ্ন পেয়েছেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া আগামী দিনের পরীক্ষার প্রশ্ন ও সমাধান চেয়ে শিক্ষার্থীরা কমেন্ট করেছে।

এ বিষয়ে এক পরীক্ষার্থী দেশ রূপান্তরকে বলে, ‘আমি প্রশ্ন দেখে প্রথম দিকে কিছুই বুঝিনি। পরে শিক্ষকরা আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন। কারণ আমি আগের রাতে ফেসবুকে যাইনি। তবে আমার অনেক সহপাঠী আগের রাতেই প্রশ্ন পেয়ে পরীক্ষা দিয়েছে। তুলনামূলক তারা আমার থেকে ভালো করবে। এজন্য আগামী দিনে আমাকেও এই পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। নয়তো আমি পিছিয়ে পড়ব।’

বিষয়টি নিয়ে ঢাকা ও দিনাজপুরের কয়েকটি স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘এই প্রশ্নে শিক্ষার্থীদের অনেক কিছু শেখার আছে। তবে প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে হবে। পাশাপাশি এনসিটিবি যদি আগেই পরীক্ষার প্রশ্ন সম্পর্কে আমাদের ধারণা দিত, তাহলে আমরা শিক্ষার্থীদের জানাতে পারতাম। এখন খাতা মূল্যায়ন করে বোঝা যাবে শিক্ষার্থীরা আসলে কতটুকু আয়ত্ত করতে পেরেছে। তবে প্রশ্ন ফাঁস রোধ করাটা খুবই কঠিন হবে। কারণ শহরের স্কুলগুলোয় সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকলেও, গ্রামের স্কুলগুলোয় তা নেই।’

এ বিষয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান (রুটিন দায়িত্ব) অধ্যাপক মো. মশিউজ্জামানের সঙ্গে একাধিকবার টেলিফোনে যোগাযোগ করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

এদিকে সারা দেশ থেকে নতুন কারিকুলামে প্রথম পরীক্ষার চিত্র পাঠিয়েছেন প্রতিনিধিরা। তাদের পাঠানো খবর :

রাজশাহী : একটি বালিকা বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়েন নওরিন আরা। প্রথম পরীক্ষা শেষে খুশি সে। সে জানায়, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ইউটিউবে প্রশ্ন দেখে সে বিশ্বাস করেনি। কিন্তু গতকাল পরীক্ষা হলে গিয়ে সেসব প্রশ্নই দেখে নিশ্চিত হয়েছে যে প্রশ্ন ফাঁস হয়েছিল। নওরিন জানায়, ভয় ছিল কেমন প্রশ্ন হবে, কিছুই জানতাম না। তবে পরীক্ষা দেওয়ার পর সেগুলো কেটে গেছে। তার ক্লাসের প্রায় সবাই প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার খবর জেনেছিল। পরীক্ষা শেষে সবাই বলাবলি করেছে, কাল, পরশু আবার ইউটিউবে খুঁজবে প্রশ্নপত্র।

রাজশাহী জেলা শিক্ষা অফিসার আব্দুল আজিজ সরদার বলেন, প্রশ্নপত্র মঙ্গলবার বিকেলে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বিদ্যালয়গুলোয় দেওয়া হয়েছে। আগের দিন প্রশ্ন দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের নয়, ওপরের সিদ্ধান্ত।’ প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়ে তার কিছু জানা নেই।

খুলনা : নতুন কারিকুলামের পরীক্ষায় প্রশ্ন সম্পর্কে ভালো ধারণা পায়নি শিক্ষার্থীরা, যা তাদের বেশ দুশ্চিন্তা ও বিপাকে ফেলেছে। অন্যদিকে নিজ নিজ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের অ্যাপস ও ইমেলে প্রশ্নপত্র দেওয়ায় ফাঁসের অভিযোগও উঠেছে। বিষয়টি অভিভাবকদের ভীষণভাবে ভাবিয়ে তুলেছে।

খুলনা জিলা স্কুলের পরীক্ষার্থী তানভির ইসলাম দেশ রূপান্তরকে জানায়, আগে প্রশ্ন সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যায়নি। পরীক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তাও ছিল। ফলে পরীক্ষাকেন্দ্রে গিয়েও বিপাকে পড়তে হয়। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে বলে বন্ধুদের কাছে শুনেছি।

ডুমুরিয়া চুকনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিনতি কুন্ডু জানান, অ্যাপসে আগের দিন প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়। ডাউনলোড হচ্ছিল না। পরে বিকেল ৫টায় ডাউনলোড করা হয়। পরের দিন সকাল ৮টায় ফটোকপি করে সকাল ১০টায় পরীক্ষা নেওয়া হয়। তবে একদম গ্রামের স্কুলে ফটোকাপি মেশিন না থাকায় তাদের বিপাকে পড়তে হয়েছে।

খুলনা জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ফারহানা নাজ বলেন, ‘খুলনায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেনি। তবে প্রতি বিদ্যালয়ে পরীক্ষার কিছু নির্দেশনা ছিল। আগের পাঠ্যবই পড়ানো হয়েছে। ২০ দিন আগে কোন কোন অধ্যায় থেকে প্রশ্ন আসবে তা জানানো হয়। সে অনুযায়ীই প্রশ্ন করা হয়েছে। সুতরাং দুশ্চিন্তার কিছু নেই।’

রংপুর : শিক্ষার্থীরা নির্দেশনা মেনে বইসহ প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ নিয়ে স্কুলে গেছে। প্রথমবারের মতো এমন মূল্যায়নে অংশ নিয়ে শিক্ষার্থীরা বলছে, তারা আগে থেকে বইপত্র পড়ে পরীক্ষা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল। তবে মঙ্গলবার বিকেলে শোনা যায়, নতুন কারিকুলাম অনুযায়ী এর উত্তর ফেসবুকসহ ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়েছে।

রংপুরে নামকরা এক স্কুলের শিক্ষার্থী বলেন, ‘গত মঙ্গলবার রাতসহ আগে থেকে পুরো বই পড়ে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম পরীক্ষা দেওয়ার জন্য। কিন্তু আজ সকালে দেখি পরীক্ষার উত্তর ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়েছে। আমার অনেক বন্ধু জানাল এগুলো ভালো করে দেখে পরীক্ষা দিতে আয়। আমি সেই মোতাবেক পড়ে পরীক্ষা দিলাম। দেখলাম ইউটিউবে যা আছে পরীক্ষার প্রশ্নেও তাই। বেকার কষ্ট করে আগে থেকে এবং পরীক্ষার আগের রাতে সম্পূর্ণ বই পড়লাম। তবে প্রায় একই ধরনের কথা রংপুরের অন্যান্য স্কুলের শিক্ষার্থীরাও জানিয়েছে।’

জানা গেছে, আগের নিয়মে স্কুলে নিয়মিত উপস্থিতি, ব্যবহার, সততা, নেতৃত্বের গুণাবলি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য কোনো নম্বর ছিল না। সব নম্বরই ছিল পরীক্ষায় লেখার ওপর। তবে নতুন নিয়মে এসব কিছুরই মূল্যায়ন আছে। শিক্ষকরা বলছেন, মূল্যায়ন এখন আর মুখস্থ-নির্ভরতার ওপর সীমাবদ্ধ নেই। সাতটি স্কেলে ফলাফল মূল্যায়ন করা হবে, সেগুলোর নাম হবে অনন্য, অর্জনমুখী, অগ্রগামী, সক্রিয়, অনুসন্ধানী, বিকাশমান ও প্রারম্ভিক।

রংপুর জেলা শিক্ষা অফিসার এনায়েত হোসেন জানান, নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণির ষাণ¥াসিক সামষ্টিক মূল্যায়ন পরীক্ষা শুরু হয়েছে। এই পদ্ধতিতে রংপুরে ভালোভাবে পরীক্ষা হয়েছে।

বরিশাল : নবম শ্রেণির ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞানবিষয়ক পরীক্ষার প্রশ্নপত্রটিও গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরের দিন সেই প্রশ্নপত্র দিয়েই বরিশালে পরীক্ষা নেওয়া হয়। অনলাইনে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্নের হুবহু মিল পাওয়া গেছে। তবে যারা এই ফাঁস হওয়া প্রশ্ন পেয়েছে, তাদের মধ্যে তেমন একটা প্রতিক্রিয়া না থাকলেও, যারা ফাঁস হওয়া প্রশ্ন পায়নি, সেই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন।

বরিশালের সরকারি একটি বালিকা বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী বলে, ‘গতকাল রাতে ফেসবুকে প্রশ্ন পেয়েছি। তবে ভয়ে ছিলাম যদি প্রশ্ন কমন না পরে সেজন্য। কিন্তু ভাগ্য ভালো, কমন পড়েছে।’ ক্লাসের সবাই প্রশ্ন পেয়েছে কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে ওই শিক্ষার্থী বলে, ‘ক্লাসের সবাই পায়নি। তবে অধিকাংশই পেয়েছে।’ একই বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির অন্য এক শিক্ষার্থী বলে, ‘আমি আগে প্রশ্ন পাইনি। কিন্তু আমার পরীক্ষা ভালো হয়েছে। পরীক্ষার হলে কোনো সিট প্ল্যান ছিল না। সবাই সবাইকে সহযোগিতা করেছে। আমার কাছে এটা পরীক্ষা মনে হয়নি। এমন পরীক্ষা হলে আমাদের মেধাশক্তির মূল্যায়ন করা হবে কীভাবে, আমি বুঝি না।’

বরিশালের একটি সরকারি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার বিষয়ে আমি অবগত ছিলাম না। তবে সকালে বিষয়টি জানতে পারি। কিন্তু বোর্ড আমাদের কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত