সড়ক নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে তবে পরিশোধ করা হয়নি টাকা। অধিগ্রহণ মূল্য না পাওয়ায় সেই কাজে বাধা দেন জমির মালিকরা। এ অবস্থায় স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে বিনা নোটিসে বসতবাড়ি ভেঙে কাজ শুরু করতে যান ঠিকাদার ও তার লোকজন। এতে বাড়িহারা হয়েছেন এক নারী।
গত ২৬ জুন খুলনা জেলা প্রশাসকের দপ্তরে লিখিত অভিযোগে এ ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন জমির মালিক ভুক্তভোগী ওই নারী শাহীনুর বেগম। সড়ক নির্মাণের কাজটি করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, ডুমুরিয়ার শরাফপুর ইউনিয়নের গজোন্দ্রপুর ভদ্রা নদীর ওপর ৮৪ মিটার দৈর্ঘ্যরে গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ করছে খুলনা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর। ৪ কোটি ৪৬ লাখ ৭৪ হাজার টাকা ব্যয়ে ব্রিজটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের ২০ ডিসেম্বর। এক বছর মেয়াদি কাজটি সমাপ্ত হওয়ার কথা ২০১৯ সালের ১৯ ডিসেম্বর। তবে নির্ধারিত মেয়াদে কাজ শেষ হয়নি। তাই দ্বিতীয় দফায় সময় ও ব্যয় বাড়ানো হয়। এ দফায় ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪ কোটি ৮২ লাখ টাকায়। মেয়াদ বাড়ে ২০২৩ সালের ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত। বাড়তি এ মেয়াদে কাজের অগ্রগতি হয়েছে শতকরা ৯৮ ভাগ। এ কাজ বাবদ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চলতি ১১তম বিলসহ ৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা তুলে নিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ব্রিজের পূর্বপাশে ১০০ মিটার সংযোগ সড়কটি ১৪ থেকে ১৫ জনের জমির ওপর দিয়ে যাচ্ছে। জমির মালিকরা জেলা প্রশাসনের ৭ ও ৪ ধারার নোটিস পেলেও অধিগ্রহণ মূল্য ও ক্ষতিপূরণের টাকা পাননি। অন্যদিকে দীর্ঘদিনেও তাদের কথা কানে তোলেনি এলজিইডি। অধিগ্রহণের অর্থ ও ক্ষতিপূরণ না দিয়ে বাকি থাকা ১০০ মিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ করতে গেলেই বাধা দেন জমির মালিকরা। তাদের বাধায় প্রকল্প সমাপ্ত হচ্ছে না। সড়কটি নির্মাণ শেষ না হলে বাকি বিল তুলতে পারছেন না ঠিকাদার। এ নিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও বাস্তবায়নকারী সংস্থা এলজিইডির সঙ্গে জমির মালিকদের বিরোধ দেখা দেয়।
ভুক্তভোগী জমির মালিক শাহীনুর বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সড়কটি তার বসতভিটার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু জমি অধিগ্রহণের কথা এলজিইডি কখনোই বলেনি। পরে জানতে পেরে তিনি চিন্তিত হয়ে পড়েন। কারণ বসতভিটা ছাড়া আর কোনো জমিই নেই তার। তাই এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন তিনি। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসনের এলএ শাখা থেকে ৭ ও ৪ ধারায় দুটি নোটিস জারি করা হয়। এরপর কয়েক দফা ডেকে সাদা কাগজে স্বাক্ষরও নেওয়া হয়। অথচ চূড়ান্ত নোটিস, অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণের টাকা দেওয়া হয়নি।
শাহীনুর বেগম আরও জানান, হঠাৎ গত ২ জুন জেলা প্রশাসনের (এলএ শাখা) সার্ভেয়ার আব্দুর রশিদ, উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ রবিউল ইসলাম ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আলামিনকে সঙ্গে নিয়ে ঠিকাদার আবু হানিফ তার লোকজন দিয়ে বসতবাড়ি ভাঙচুর করেন। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনিও খারাপ আচরণ করেন। ঠিকাদারের লোকজন এখনো হুমকি অব্যাহত রেখেছেন।
তিনি জানান, ১৭ ফুট চওড়া ও ২০ ফুট লম্বা একটি টিনশেড ঘরে চার সন্তান নিয়ে বসবাস করেন তিনি। বিনা নোটিসে ক্ষমতাবলে সেই ঘর ভাঙচুর করা হয়েছে। ঘরবাড়ি হারিয়ে বোনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। পুনর্বাসনে জমি অধিগ্রহণ মূল্য ও ক্ষতিপূরণ দরকার।
জমির আরেক মালিক শেখ সাইদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে জানান, সড়কের জন্য তার পৈতৃক ১৮ শতকের মধ্যে ১০ শতক নিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অথচ কোনো টাকা দেওয়া হচ্ছে না। জমি দখলে নেওয়ার জন্য ঠিকাদারের লোকজন ঘরবাড়ি ভাঙচুর করেছেন। গাছ উপড়ে ফেলেছেন।
জমির মালিক মো. মিজানুর রহমান ও মালি রানী দাস দেশ রূপান্তরকে জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে আইনের মধ্যে সবকিছু করতে অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু তিনি ঘরবাড়ি ভেঙে নিতে ও গাছপালা কেটে ফেলতে বলেছেন। বলেছেন টাকা পরে পাবেন। তারা গরিব মানুষ। অন্য কোনো জায়গা নেই। টাকা না পেলে ঘরবাড়ি ভেঙে নিয়ে অন্যত্র কীভাবে বসত গড়বেন।
শাহীনুর বেগমের অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ রবিউল ইসলাম বলেন, ‘ঘরটি পরিত্যক্ত ছিল। কোনো ভাঙচুর করা হয়নি। জনস্বার্থে সংযোগ সড়কটি দ্রুত করার চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র।’ তিনি আরও বলেন, প্রকল্প যখন নেওয়া হয়, তখন জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি ছিল না। পরে ব্রিজটি একপাশে সরে নির্মিত হওয়ায় জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তবে তিনি যোগ দেওয়ার পর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েই দেখেছেন।
প্রকৌশলী বলেন, ‘সর্বশেষ ৯৬ লাখ টাকা অধিগ্রহণ মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আশা করি, দ্রুতই তারা টাকা পাবেন। তবে কাজ এখন বন্ধ রয়েছে।’
জানতে চাইলে ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আল আমিন বলেন, ‘অনেক টাকার ব্রিজটি অনেক দিন ধরে পড়ে আছে। মানুষের চলাচলে অসুবিধা হচ্ছে। গাড়ি চলাচল করতে পারছে না। তাই সংযোগ সড়ক নির্মাণে ও নির্বিঘ্ন চলাচলের জন্য স্থানীয় প্রশাসক হিসেবে তিনি গাছপালা কাটতে অনুরোধ জানান। তবে তার উপস্থিততে ঘরবাড়ি ভাঙচুর হয়নি। তারা কাজ করতে দিচ্ছেন না। তাই ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের ও ঠিকাদারের লোকজনের মধ্যে বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া মাঝামাঝি অবস্থায় রয়েছে। ইতিমধ্যে প্রশাসনিক অনুমোদন মিলেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের নামের তালিকা তৈরি করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তবে টাকা না আসায় তাদের দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফান্ড এলে তারা টাকা পেয়ে যাবেন।’
ঠিকাদার আবু হানিফ বলেন, ‘নীতিমালা অনুয়ায়ী ভূমি অধিগ্রহণ ও প্রকল্পের কাজ একসঙ্গে চলতে থাকে। তা ছাড়া স্থানটিতে প্রায় দুর্ঘটনা ঘটছে। মানুষের চলাচলের অসুবিধা হচ্ছে। তাই মানুষের কথা চিন্তা করে এলজিইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও স্থানীয় লোকজন সেখানে উপস্থিত হন। আলোচনা শেষে সমঝোতার ভিত্তিতে কাজ শুরু করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। সেই নির্দেশনা অনুয়ায়ী কাজ করতে গেলে শাহীনুর বেগম এসে গালাগাল শুরু করেন, মারতে যান ও পুলিশকেও গালাগাল করেন। তার ঘরবাড়ি ভাঙচুর করা হয়নি।’
