বঞ্চিত কৃষক

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২৪, ১২:১১ এএম

রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র রায় অষ্টাদশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালি ও মঙ্গলকাব্যের শক্তিমান কবি। নদিয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায় অন্নদামঙ্গল কাব্যের স্বীকৃতিতে তাকে ‘রায়গুণাকর’ উপাধিতে ভূষিত করেন। অন্নদামঙ্গল ও এই কাব্যের দ্বিতীয় অংশ বিদ্যাসুন্দর তার শ্রেষ্ঠ কীর্তি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার কাব্যকে তুলনা করেছিলেন ‘রাজকণ্ঠের মণিমালা’র সঙ্গে। ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর রচিত ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যের প্রধান চরিত্র ঈশ্বরী পাটনী মাঝি ছদ্মবেশী দেবী অন্নপূর্ণা কুলবধূ বেশে খেয়াপারের জন্য নদীর ঘাটে আসেন। মাঝি ঈশ্বরী পাটনী তার পরিচয় জানতে চাইল। কুলবধূ স্বামীর নাম মুখে আনবেন না। কথা যথার্থ। মাঝি রাজি হয়ে তাকে নৌকায় তুলল। নৌকায় কাঠের সেঁউতিতে পা রেখে তিনি বসলেন। মুহূর্তেই কাঠের সেঁউতি সোনায় রূপান্তরিত হলো। এ কী কাণ্ড! মাঝি ঈশ্বরী পাটনী বুঝে গেল এ তো কুলবধূ নয়, নিশ্চয় কোনো দেবী। অন্নপূর্ণা ছদ্মবেশ ছেড়ে বলল, তুমি কী বর চাও? তখন ‘প্রণামিয়া পাটনী কহিছে জোড় হাতে/আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।’

এই ভাত যে ধান থেকে আমরা পাচ্ছি, তার চাষ কে করছে? সেই কৃষক। যে কৃষক বরাবরই অবহেলিত, উপেক্ষিত। সমাজের স্তরবিন্যাসে তার অর্থনৈতিক অবস্থান আমাদের দেশে একেবারেই তলানিতে। কোনো দিনই এই পেশার মানুষ সচ্ছল জীবনযাপন করেনি। উল্টো তাদের ব্যবহার করে আমরাই ফুলে-ফেঁপে উঠেছি। দেশ রূপান্তরে শুক্রবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ‘স্কুলছাত্রদের চেয়েও সঞ্চয় কম কৃষকের’ প্রতিবেদন জানাচ্ছে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যে কৃষক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন, তাদেরই নেই আর্থিক নিরাপত্তা। কৃষকের উৎপাদিত ফসল নিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীরা কোটি কোটি টাকা আয় করলেও তাদের সঞ্চয় তলানিতে। গড়ে তাদের সঞ্চয় মাত্র ৬৩৭ টাকা, যেখানে স্কুলছাত্রদের সঞ্চয় গড়ে ৫৫০০ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর ছিল একদা। তাদের হাত ধরেই দেশ সমৃদ্ধির পথে পা বাড়ায়। শিল্পায়নের কারণে দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষি খাতের অবদান কমে এখন ১১ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, কৃষিজমি কমে যাওয়া ও প্রযুক্তিগত কারণে অনেক কৃষক পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন। কয়েক দশকে দেশে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। প্রান্তিক কৃষক, অতিদরিদ্র মানুষ, মুক্তিযোদ্ধা এবং পোশাকশ্রমিকদের সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় নো-ফ্রিল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একজন কৃষক মাত্র ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ পান। এর বাইরে কৃষক হিসেবে আলাদাভাবে সঞ্চয়ের সুযোগ তাদের নেই। ১ কোটি ৪ লাখ কৃষক নো-ফ্রিল হিসাবের মাধ্যমে ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এসব হিসাবের পরিমাণ পর্যাপ্ত হলেও কৃষকের গড় সঞ্চয় মাত্র ৬৩৭ টাকা। যে

কৃষকরা হিসাবের বাইরে রয়েছেন, তাদের আমলে নিলে গড় সঞ্চয় ৩০০ টাকারও কম। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে কৃষকের সংখ্যা ২ কোটি ৫৬ লাখ। ৬৬৩ কোটির বিপরীতে ২ কোটি ৫৬ লাখ কৃষকের সঞ্চয় ধরলে প্রতি কৃষকের সঞ্চয় দাঁড়ায় মাত্র ২৫৯ টাকা। অথচ দেশে স্কুলশিক্ষার্থীদের ৪০ লাখ ব্যাংক হিসাবেও প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা আমানত রয়েছে। প্রতি শিক্ষার্থীর আমানত প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ স্কুলছাত্রের চেয়েও কৃষকের সঞ্চয় কম।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট কৃষিঋণের স্থিতি ৫৬ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। যদিও ঋণের বড় অংশই পান ফসল উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত নন এমন ব্যবসায়ীরা। প্রকৃত কৃষক অপাঙক্তেয়ই থাকেন। প্রতি বছর কৃষিতে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দেয় সরকার। এ নীতি কৃষকদের আর্থিক সংকট কাটাতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। বলছেন, অর্থনীতির মেরুদ- হিসেবে ভূমিকা রাখলেও কৃষক বরাবরই বঞ্চিত, উপেক্ষিত।

এই বঞ্চনা, উপেক্ষার অবসান অচিরেই হবে, এমন সম্ভাবনা নেই। কৃষকরা থাকবেন, অন্ধকারেই। তাদের শ্রম, ঘামকে পুঁজি করে দুর্বৃত্তরা টাকার পাহাড় করবে। ক্ষুধা আর তৃষ্ণায় কৃষক থাকবেন নীরবে, একাকী, দ্রোহহীন মেরুদন্ডহীন চিংড়ির মতো।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত