ভিনদেশি উদ্ভিদ একাশিয়া, মেহগনি, ইউক্যালিপটাস দেশের মাটি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর। পুষ্টি এবং অর্থনৈতিকভাবে ও জীববৈচিত্র্যগতভাবে সমৃদ্ধির জন্য ফলদ বাংলাদেশ ১১ বছর আগে শুরু করে ফলদ গাছের রোপণ। সম্প্রতি তারা বাংলাদেশের ৬৪ জেলায় ফলের গাছ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করল। লিখেছেন অরণ্য রহমান
‘বাংলার নিসর্গ আজ মেহগনি, একাশিয়া, রেইনট্রি, ইউক্যালিপটাসের দখলে, যেসব গাছ আমাদের জাতীয় পুষ্টি ও অর্থনৈতিক ক্ষতিসহ জীববৈচিত্র্যের মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই গাছগুলো আমাদের স্থানীয় পশুপাখি ও অনুজীববান্ধব নয়। কেবল কাঠের কথা চিন্তা করে এই ভুল বনায়নের কারণে ইতিমধ্যেই স্থানীয় বিভিন্ন প্রজাতির গাছের স্থান দখল করে তাদের সমূলে বিনাশ করে দিয়েছে এই গাছগুলো। কাঠ ছাড়া আমাদের জীবনে এদের আর কোনো অবদান নেই। অথচ অধিক হারে ফলদ গাছ রোপণের মাধ্যমে একযোগে দেশের পুষ্টি-অর্থনীতি ও জীববৈচিত্র্য উভয়ের উন্নয়ন সম্ভব। ফলগাছ মানেই একই গাছ থেকেই কাঠ, পুষ্টি, অর্থ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা। যে কোনো হিসাবেই একটি ফলগাছ এসব বহিরাগত কাঠগাছ থেকে অধিক লাভজনক। শুধু সেটা বিবেচনা করার মানসিকতা প্রয়োজন।’
এক যুগ আগে এমন কিছু ভাবনা থেকে কয়েকজন তরুণ একত্রিত হন এবং দেশের বৃক্ষপ্রতিবেশের এমন দুর্যোগ প্রতিরোধে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে গড়ে তোলেন একটি সংগঠন ‘ফলদ বাংলাদেশ’। এর মাধ্যমে সারা দেশে মেহগনি, একাশিয়া, রেইনট্রি, ইউক্যালিপটাসের বদলে ফলগাছ রোপণ ও সচেতনতা তৈরিতে কাজ করবেন তারা। তারা স্বপ্ন দেখলেন একদিন সারা দেশে তারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৫ কোটি ফল গাছ রোপণ করবেন। কিন্তু হাতে গোনা সদস্য ও নগণ্য আর্থিক শক্তি নিয়ে এই কাজ কীভাবে সম্ভব! তবু প্রাথমিক পর্বের কাজ হিসেবে তারা পরিকল্পনা করলেন প্রতি বর্ষায় সাধ্যমতো কোনো না কোনো জেলায় এক বা একাধিক গ্রামে ফলগাছ রোপণ করতে করতে একদিন সমগ্র বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেবেন এই বার্তা। কিন্তু নিজেদের ক্ষুদ্র সামর্থ্যে রোপিত চারা গাছগুলো টিকে থাকবে তো? সে কারণে সিদ্ধান্ত হলো, ফলের চারাগুলো রোপণ করা হবে মানুষের বাড়িতে বাড়িতে। এতে রোপণ করে চলে এলেও বাড়ির মানুষেরাই যত্ন করে সেসব গাছ বড় করতে পারবেন, পাশাপাশি তাদের বিদেশি কাঠনির্ভর বৃক্ষরোপণের বদলে ফলগাছ রোপণে সরাসরি সচেতন করার কাজটিও করা যাবে।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০১৩ সালে শুরু হয়ে গেল কাজ। প্রথম চারা রোপণ করা হলো নেত্রকোনা জেলায়। তারপর চাঁদপুর, ময়মনসিংহ, মুন্সীগঞ্জ, পাবনা এভাবে একে একে সারা দেশে। বন্ধু, আত্মীয়, পরিচিতজনদের সূত্র ধরে গ্রাম নির্বাচন করে প্রতি বর্ষায় সামর্থ্য অনুযায়ী জেলায় জেলায় ফলের চারা হাতে পৌঁছে গেছেন সংগঠনের সদস্যরা। দিনে দিনে বৃদ্ধি পেয়েছে সদস্য সংখ্যাও। ছাত্র-শিক্ষক-সাংবাদিক বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার স্বেচ্ছাসেবী সদস্যদের শ্রমের সঙ্গে স্বাবলম্বী সদস্যদের আর্থিক সহায়তায় কাজ এগিয়ে চলেছে। এরই মাঝে ফলদ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনে রূপ নেয়। ১২ বছর শেষে সত্যিই একদিন কক্সবাজারে গিয়ে শেষ হলো ফলদ বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় ফলের গাছ রোপণের কর্মসূচি।
৬৪ জেলা পদার্পণ উপলক্ষে সম্প্রতি ফলদ বাংলাদেশ কক্সবাজারে রামুর কেচুয়াবনিয়া গ্রামে ফলগাছ রোপণের পাশাপাশি কক্সবাজার শহরে আয়োজন করেছিল বৃক্ষ শোভাযাত্রা, সেমিনার ও ফল উৎসবের। প্রথম দিনের কর্মসূচি হিসেবে বিকেলে শহর ও সমুদ্রসৈকতে শোভাযাত্রায় অংশ নেয় ফলদ বাংলাদেশের অর্ধশতাধিক কর্মী ও অতিথিরা। তারপর আয়োজিত সেমিনারে বক্তব্য রাখেন কক্সবাজার পৌরসভা মেয়র মাহাবুবুর রহমান চৌধুরী, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সোহেল রানা। মূল বক্তা হিসেবে ছিলেন উদ্ভিদবিদ আজহারুল ইসলাম খান। তারা সবাই বাংলাদেশের বৃক্ষরোপণের সমস্যা এবং একাশিয়া-ইউক্যালিপ্টাসের অতিরিক্ত রোপণের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরেন। আর ফলদ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি দ্রাবিড় সৈকত সংগঠনের এক যুগের কর্মকান্ডের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
যেভাবে ছড়াল ভিনদেশি উদ্ভিদ
বাংলাদেশ একটি অতি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। অধিক জনসংখ্যার চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলার জন্য মাটিকে সর্বাধিক উপযুক্তভাবে ব্যবহার আমাদের ভবিষ্যতের জন্য জরুরি। অথচ গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের এই উর্বর মাটিকে অনেকাংশে পতিত করে ফেলা হয়েছে ভিনদেশি আগ্রাসী উদ্ভিদ ইউক্যালিপটাস, একাশিয়া, মেহগনি, রেইনট্রি ইত্যাদি গাছ একচেটিয়া রোপণের মাধ্যমে যা আমাদের জাতীয় উন্নয়নকে নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করছে আমাদের সবার চোখের সামনে।
ইংরেজরা এ অঞ্চলের বনের পুরনো গাছ কেটে শেষ করে এক সময় এখানে ফরেস্ট অফিস খোলে। এই ফরেস্ট অফিসের অন্যতম উদ্দেশ্যই ছিল, কী পরিমাণ কাঠ কেটে ব্যবসা করলেও পরে আবার কাটার মতো গাছ থাকবে, সেভাবে কাঠ চাষ করা। স্থানীয় বহু জাতের গাছপালা বিনাশ করে শুধু প্রমাণ সাইজের কাঠের গাছের কয়েকটা জাত চাষ করা হতে লাগল। ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পরও এই বনের স্থানীয় প্রজাতির গাছপালা সাফ করে কাঠগাছ লাগানো চলতে থাকে। বাংলাদেশেও বন বিভাগ এক সময় বিদেশি আগন্তুক কাঠগাছের বীজ এনে লাগানো শুরু করে। যেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো একাশিয়া, ইউক্যালিপটাস, মেহগনি। আর এভাবে বৃক্ষরোপণের নামেই নিজ হাতে নিজেদেরই চোখের সামনে একটা আত্মঘাতী বৃক্ষ বিপর্যয় সৃষ্টি করা হলো। সরকারের দেখাদেখি সবাই এখন কাঠচাষি। বাড়ির উঠান থেকে শুরু করে পতিত জায়গা, এমনকি স্কুল-কলেজ-হাসপাতালেও এখন এই বহিরাগত গাছের ছড়াছড়ি। যে গাছ শুধু কাঠ ও টাকা দেয়, কিন্তু স্থানীয় পশুপাখি কীটপতঙ্গের জন্য উপযোগী নয়। অথচ যেখানে ফল গাছ ও দেশি অন্যান্য বনজ গাছ রোপণের মাধ্যমে একযোগে অর্থ ও পুষ্টি লাভ এবং পরিবেশের উপকারে সমন্বিত অবদান রাখতে পারি আমরা। আর এ জন্যই ‘পুষ্টি অর্থ সবুজ পথ, ফলের গাছেই ভবিষ্যৎ’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে কাজ করছে ফলদ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন। তাদের রোপণ করা তিন লক্ষাধিক ফলদ ও দেশীয় বনজ গাছের অধিকাংশ এখন বড় হয়ে ফল দিচ্ছে সারা দেশের বিভিন্ন গ্রামে। কিন্তু সড়কে-মহাসড়কে, পতিত জমি ও বনাঞ্চলে থেমে নেই মেহগনি-একশিয়া-ইউক্যালিপটাস রোপণ। এই বিদেশি জাতের বৃক্ষের রোপণ এখনই বন্ধ করা প্রয়োজন। সে লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে ফলদ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন।
