যুক্তরাষ্ট্রের অস্থির রাজনৈতিক যুগের প্রতিচ্ছবি

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৪, ১২:৩১ এএম

শনিবার বিকেলে পেনসিলভানিয়ার সমাবেশে ছোড়া গুলিটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের কানে ঘষা দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে থাকলেও তা আসলে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণার বুকেই বিদ্ধ হয়েছে। দুমড়ে দিয়েছে দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর বুনটকে। নাটকীয়ভাবে গুঁড়িয়ে গেছে মার্কিন রাজনীতির অঙ্গনের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা বিভ্রম। এই মত পশ্চিমা বিশ্লেষকদের।

টানা কয়েকটি গুলির শব্দ, একজন রাজনৈতিক নেতার মাটিতে লুটিয়ে পড়া, সিক্রেট সার্ভিস এজেন্টদের তাকে রক্ষা করতে ছুটে আসা এসব ছবি মার্কিন রাজনীতি ও সমাজের পুরনো এক ক্ষতকে সামনে নিয়ে এসেছে আবার। ট্রাম্পের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা সেদিনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তো বটেই, গোটা মার্কিন সমাজ, রাজনীতি তথা গণতন্ত্র নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে। বিষয়গুলো একে একে দেখা যাক।

অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়ে কড়া প্রশ্ন উঠেছে। বলা হচ্ছে, সমাবেশস্থলটা ছিল খোলা জায়গায়। এর একটা নির্দিষ্ট সীমা ছিল। তাহলে কেন নিরাপত্তাকর্মীরা ভেন্যুর চারপাশের প্রতিটি নিচু ছাদে অবস্থান নেননি? বা কেন তারা ওই ছাদগুলো পরীক্ষা করে দেখেননি? আধা-স্বয়ংক্রিয় রাইফেলধারী একজন ব্যক্তি কীভাবে এত কাছের একটি ছাদে উঠে একজন সাবেক প্রেসিডেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে গুলি করার সুযোগ পেল? ট্রাম্পের প্রচারণা দলের একজন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ইতিমধ্যে অভিযোগ করেছেন, সিক্রেট সার্ভিস কতটা প্রস্তুত ছিল তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তার কথা সহজে উড়িয়ে দেওয়ার অবকাশ নেই।

আসলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে এ এক নিদারুণ মুহূর্ত। চারদিকে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। এখন দেখার বিষয় এর পরিণাম কী হবে। কেবল এবারের নির্বাচনী প্রচারণার জন্য নয়, যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যতের জন্য এ ঘটনার প্রভাব কী হতে চলেছে সেটাই ভাবার বিষয়। মার্কিন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সামনে করণীয় একটাই। এ ঘটনাকে তারা কীভাবে সামলাবেন, কীভাবে দেশকে এ পরিস্থিতি থেকে বের করে আনবেন তা নিয়ে ভাবতে বসতে হবে তাদের। কাজটা যদি সঠিকভাবে না করা হয় তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

১৯৮১ সালে জন হিঙ্কলি জুনিয়র রোনাল্ড রিগ্যানকে গুলি করার পর থেকে কোনো প্রেসিডেন্ট বা প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীর বিরুদ্ধে এরকম হামলা হয়নি। ঘটনাটি যেন মার্কিন ইতিহাসের এক অন্ধকার সময়কে ফিরিয়ে এনেছে। অর্ধশতাব্দীরও বেশি আগে ঘাতকের বুলেটে নিহত হন দুই কেনেডি ভাই একজন প্রেসিডেন্ট এবং একজন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী। রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন মেডগার এভারস, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র এবং ম্যালকম এক্সের মতো নাগরিক অধিকার নেতারাও। আজকের মতো ১৯৬০-এর দশকেও যুক্তরাষ্ট্র আক্রান্ত হয়েছিল তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং অচলাবস্থায়। তখন শুধু একটি আগ্নেয়াস্ত্র এবং তা ব্যবহার করতে ইচ্ছুক একজন ব্যক্তি ইতিহাসের গতিপথই বদলে দিতে পারত।

ট্রাম্পকে গুলির ঘটনা যুক্তরাষ্ট্র এবং এর রাজনৈতিক চালচিত্রের ওপর কী প্রভাব ফেলবে তা এখনই অনুমান করা কঠিন। ইতিমধ্যেই দুদলের নেতারাই বাগাড়ম্বর বন্ধ ও জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন। গুলির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন টিভি ক্যামেরার সামনে হাজির হয়ে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের সহিংসতার কোনো স্থান নেই। এটা অসুস্থ মানসিকতার কাজ। যুক্তরাষ্ট্র এমন হতে পারে না। আমরা এটা মেনে নিতে পারি না।’ পরে ট্রাম্পের সঙ্গে নিজে ফোনে কথা বলেন বাইডেন।

সাম্প্রতিক দশকগুলোতে মার্কিন রাজনীতির বৈশিষ্ট্যই হয়ে উঠেছে নগ্ন রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত। কয়েকজন জ্যেষ্ঠ রিপাবলিকান রাজনীতিবিদ বলেছেন, কিছু ডেমোক্র্যাট নেতা যে ভাষায় ট্রাম্পকে মার্কিন গণতন্ত্রের প্রতি ভয়াবহ হুমকি আখ্যায়িত করেছেন সেসব কথাই এজন্য দায়ী। ওহাইও অঙ্গরাজ্যের সিনেটর জেডি ভ্যান্স বলেছেন, বাইডেনের প্রচারণা দলের মূল ভিত্তিই হচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একজন কর্র্তৃত্ববাদী ফ্যাসিবাদী হিসেবে তুলে ধরা, যাকে যে কোনো মূল্যে থামাতে হবে। ভাইস-প্রেসিডেন্ট পদে ট্রাম্পের পছন্দের লোকদের মধ্যে একজন এই সিনেটর ভ্যান্স। তার মতে, এ ধরনের বাগাড়ম্বর সরাসরি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হত্যা প্রচেষ্টার পথ তৈরি করেছে।

ট্রাম্পের প্রচারাভিযানের ম্যানেজার ক্রিস লাসিভিটা বলেছেন, ‘বামপন্থি কর্মী, ডেমোক্র্যাট দলের চাঁদাদাতা এমনকি জো বাইডেনকে পর্যন্ত শনিবারের হামলা ডেকে আনা ‘ঘৃণায় ভরা মন্তব্যের’ জন্য নভেম্বরে ব্যালট বাক্সে জবাবদিহি করতে হবে। ডেমোক্র্যাটরা হয়তো আপত্তি করবেন। তবে বামঘেঁষা অনেকেই কিন্তু ২০১১ সালে কংগ্রেস সদস্য গ্যাবি গিফোর্ডের গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগে দেওয়া ডানপন্থিদের ঝাঁজালো বক্তব্যের নিন্দা করতে এমন ভাষাই ব্যবহার করেছিলেন।

পেনসিলভানিয়ার সহিংসতা নিঃসন্দেহে সোমবার থেকে শুরু হওয়া রিপাবলিকান দলের কনভেনশনের ওপর কালো ছায়া ফেলবে। এখানেই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করা হবে ট্রাম্পকে।

বৃহস্পতিবার রাতে রিপাবলিকান দলের মনোনীত প্রার্থী হয়ে ট্রাম্প যখন মঞ্চে উঠবেন তখন পাদপ্রদীপের আলো পুরোটাই থাকবে তার ওপর। সম্মেলনে সবার মন জুড়ে থাকবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রক্তাক্ত মুখাবয়ব ও মুষ্টিবদ্ধ হাতের ছবি। রিপাবলিকান পার্টি ইতিমধ্যেই শক্তি এবং কঠিন পৌরুষকে নির্বাচনী লড়াইয়ের মূল ভাব হিসেবে তুলে ধরার পরিকল্পনা করছিল। শনিবারের গুলির ঘটনা একে নতুন শক্তি জোগাবে। ট্রাম্পের ছেলে এরিক ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, ‘এই যোদ্ধাই এখন আমেরিকার প্রয়োজন!’

প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ঘটনার সম্পূর্ণ তদন্ত করা হবে, তবে সময় লাগবে। অতীতের অন্য আরও ঘটনার মতো শনিবার ঘটনাস্থলেই নিহত ‘খলনায়ক’ টমাস ম্যাথিউ ক্রুকসের উদ্দেশ্যও শেষ পর্যন্ত অজানাই থেকে যাবে কি? রিপাবলিকান দলের নিবন্ধিত সদস্য ছিলেন টমাস। আবার অতীতে ডেমোক্র্যাট দল ও বামপন্থিদের চাঁদা দিয়েছেন। ঘটনা নিয়ে গুজব গুঞ্জনের ডালপালাও কম ছড়ায়নি। এত কাছ থেকে কয়েকটি গুলি করার পরও ট্রাম্পের শুধু কানে লাগল কেন, তাহলে কি ঘটনা সাজানো? এমন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব খোঁজার প্রশ্নও কেউ কেউ করেছেন।

আপাতত একটা বিষয় পরিষ্কার : অনিশ্চিত এক নির্বাচনী বছরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি একটি নতুন, মারাত্মক মোড় নিয়েছে। দেশটির রাজনৈতিক সহিংসতার অভিশপ্ত গাথার আরেকটি নতুন অন্ধকার অধ্যায়ের পাতা ওল্টানো হলো। দেশটি ইতিমধ্যেই তার আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় গভীরভাবে বিভক্ত মার্কিন সমাজকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে ট্রাম্পকে গুলির ঘটনা। রাজনৈতিক মহলসহ গোটা জাতিকে আত্মানুসন্ধানে বাধ্য করবে এটি।

মনোনয়ন পাওয়ার মাত্র কয়েকদিন আগে একজন সাবেক প্রেসিডেন্টকে লক্ষ্যবস্তু করা কার্যত গণতন্ত্র এবং জনগণের নেতা বেছে নেওয়ার অধিকারের ওপরই আক্রমণ। গুলির পর আমেরিকান জাতীয় পতাকার সামনে কানে এবং গালে রক্তমাখা অনমনীয় ট্রাম্পের ছবিটি তাৎক্ষণিকভাবে আইকনিক হয়ে উঠেছে। চিত্রটি হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের একটি অস্থির রাজনৈতিক যুগের প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকবে। ট্রাম্প বর্তমান প্রেসিডেন্ট না হলেও তার ওপর হামলাটি সরকারি উচ্চপদ এবং যারা এর জন্য লড়েন তাদের গর্দানের ওপর সদাই খাঁড়ার মতো ঝুলে থাকা হুমকিটাকে তুলে ধরে।

তথ্যসূত্র : বিবিসি ও সিএনএন অনলাইন

লেখক : অনুবাদক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত