আত্মবিশ্লেষণে আওয়ামী লীগ

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৪, ০২:২৩ এএম

কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে দেশ জুড়ে সংঘাতময় পরিস্থিতির পর ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সর্বস্তরে এখন চলছে আত্মবিশ্লেষণ। সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা মনে করছেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতি সামলাতে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ ব্যর্থ হয়েছে। আর এতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে। শুধু সাধারণ কর্মীরাই নন, কেন্দ্রীয় নেতাদেরও মুখায়বে দুশ্চিন্তার ছাপ দেখা যাচ্ছে। আর এই ব্যর্থতার জন্য সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় নেতাদেরও একটি অংশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতাকে দায়ী করছেন। তারা বলেন, কয়েকজন নেতার খামখেয়ালিপনা ও অতিমাত্রায় আত্মবিশ্বাস কোটা আন্দোলনের মতো ‘ছোট’ ইস্যুতে আওয়ামী লীগকে ব্যর্থ প্রমাণ করেছে।

দলটির সাধারণ কর্মীরা মনে করছেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন সামলাতে দলের শক্তি, সামর্থ্য ও ভাবমূর্তি যেভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, তা ফিরিয়ে আনতে অনেক সময় লেগে যাবে। দল এ ক্ষতি কবে কাটিয়ে উঠতে পারবে, তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন সাধারণ কর্মীরা। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় এবং দলীয় সভাপতির ধানমণ্ডির রাজনৈতিক কার্যালয় ঘুরে সাধারণ কর্মীদের সঙ্গে কথা বলার সময় কোটা সংস্কার আন্দোলন সামলাতে ব্যর্থতা নিয়ে নানা হতাশার কথা শোনা গেছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় নেতাদের দেখলেই নিজেদের ক্ষোভের প্রকাশ ঘটাতেও দেখা গেছে তাদের। যে যেখানে একত্রিত হচ্ছেন, দলের ব্যর্থতার জন্য নেতাদের সমালোচনা করতে পিছপা হচ্ছেন না। যারাই কার্যালয়ের সামনে এসে জড়ো হয়েছেন আড়ালে-আবডালে, প্রকাশ্যে সবার ভেতরেই এই ইস্যুতে আলোচনা ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে কথা বলতে শোনা যায়নি। দুটি কার্যালয়ে উপস্থিত সাধারণ কর্মীদের সংগঠন নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবেÑ নিজেদের মধ্যে এমন আলোচনা করতে দেখা যায়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলের কিছু দুর্বলতা নানাভাবে ফুটে উঠেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

গত শনিবার থেকে কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য, বিবৃতি ও কর্মসূচি বন্ধ রেখেছে আওয়ামী লীগ। দলীয় কার্যালয়ে আসা-যাওয়ার ভেতরেই সীমাবদ্ধ রয়েছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। শনিবারের পর থেকে এ ইস্যুতে দলীয় অবস্থান জানাতে সংবাদ সম্মেলনে আসেননি দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। কারফিউ শিথিল হওয়ার সময়ে দলের কেন্দ্রীয় নেতারা দলীয় কার্যালয়ে উপস্থিত হন। নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা সেরে নেন। তবে গণমাধ্যমে কোনো বক্তব্য দিচ্ছেন না তারা। গতকাল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের অন্য নেতাদের নিয়ে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করেন। বৈঠক শেষ করে সবাই নির্দিষ্ট সময়ে কার্যালয় ত্যাগ করেন। এ সময় কোনো নেতাই গণমাধ্যমের মুখোমুখি হননি। দলের দায়িত্বশীল এক নেতা জানান, দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা সংস্করণ আন্দোলন ইস্যুতে রাজনৈতিক কোনো বক্তব্য থেকে বিরত থাকতে নির্দেশনা দিয়েছেন। পুরো বিষয়টি দেখভাল করছেন সরকারের চার মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী। প্রয়োজন হলে সরকারের অবস্থান অবহিত করতে গণমাধ্যমের সামনে আসছেন তারা।

গতকাল বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতি নিয়ে সাধারণ কর্মীদের বলতে শোনা যায়, ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে, এখন কেন্দ্রীয় নেতারা গর্ত থেকে বের হয়ে এসেছে। তিন দিন আগে কোথায় ছিল এসব নেতা।’ সাধারণ কর্মীরা একজন আরেকজনকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন ছুড়ে দেন, ‘কোথায় ছিল গত তিন দিন আমাদের দলের বড় বড় নেতা?’

গতকাল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে কথা হয় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে। তাদেরই একজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কার্যালয়ের মধ্যেই এমন নেতা আছেন যাদের শিকড় বিএনপি-জামায়াতের। পুরো পরিবার ভিন্ন আদর্শের। আমাদের কোনো নেতার হাত ধরে আওয়ামী লীগের পদ পেয়েছেন। ১৫ বছর ধরে যারা আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক, তারা এভাবেই সংগঠন করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তিন দিন ধরে আমাদের দলের পদ-পদবি পাওয়া কয়েকজন বলে বেড়াচ্ছেন, খালেদা জিয়া মারা গেছেন। আমরা গুজব রোধ করার কথা বলি, কিন্তু গুজবের কারখানা তো আমাদের দলের ভেতরেই। রাতে বিএনপি, দিনে আওয়ামী লীগ, এমন লোক খুঁজলে এ কার্যালয়ে এখনো তিনশ পাওয়া যাবে।’ এ সময় তার বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন ২৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের অন্য নেতাকর্মীরা। শুধু এই ইউনিটের নেতাকর্মীরাই নন, এমন সুর ছিল গতকাল দলীয় কার্যালয়ে জমা হওয়া আরও শত শত সাধারণ কর্মীর ভেতরে।

কারফিউ শিথিলের সময় গতকাল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আসেন মতিঝিলে বসবাস করা দলের একজন সাধারণ কর্মী। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে তার সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। তিনি বলেন, ‘স্বাভাবিক সময়ে এখানে আসতে পারিনি। ভিড় ঠেলে আসার সুযোগ আমাদের হয় না। কিন্তু দুঃসময়ে এসেছি। যাদের কারণে ভিড় ঠেলে ঢুকতে পারিনি তারা এখন এখানে নেই। আমি, আমরা যারা দলটাকে ভালোবাসি তারাই এখানে এসেছে। গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগের ব্যর্থতা এটাই। দুঃসময়ের আমি ও আমাদের চিনতে পারেনি আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা।’

তিনি আরও বলেন, ‘কোথায় ঢাকা শহরের সংসদ সদস্যরা? কোথায় তাদের অনুসারীরা? কোথায় ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের লাখ লাখ নেতা? কোথায় ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুবলীগ? টাকা দিয়ে পদ নিয়েছে, এখন বাসায় আরাম-আয়েশ করছে। আর অন্যদিকে আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করেছে। আওয়ামী লীগের এ ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে অনেক সময় লেগে যাবে।’

ধানমণ্ডিতে দলের সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে মোহাম্মদপুর থেকে আসা সাধারণ কর্মী হুমায়ুন কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংগঠনকে আজকের অবস্থায় নিয়ে আসার দায় কেন্দ্রীয় নেতাদের। আওয়ামী লীগকে পরগাছানির্ভর আওয়ামী লীগ করে তোলা হয়েছে। গত ১৫ বছরে যারা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিতে আওয়ামী লীগে ঢুকেছে, তাদের সুবিধাও দিয়েছে, পদও দিয়েছে আওয়ামী লীগ। এ কারণেই দুঃসময়ে তারা মাঠে নামেনি। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সংবাদ সম্মেলন করে নেতাকর্মীদের মাঠে থাকতে নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু কই ছিল নেতাকর্মীরা?’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলের ভেতর যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, সে ক্ষত দূর করতে হবে। পরিবেশ-পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সাংগঠনিক সমস্যাগুলো নিয়ে বৈঠক করব আমরা।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত