গাজা যুদ্ধ ও তিনটি ঘটনা

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২৪, ১২:৫২ এএম

গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে এ পর্যন্ত যত ঘটনা ঘটেছে, তার মধ্যে গত কয়েকদিনে ঘটা তিনটি ঘটনা খুবই গুরুত্ব বহন করে। সৌভাগ্যক্রমে তিনটি ঘটনাই আশা জাগানিয়া। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিজে) জানিয়েছে, ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে। এরপরেই আমেরিকার নির্বাচনের প্রার্থিতা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। আর সর্বশেষ ফিলিস্তিনের দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী হামাস ও ফাতাহর মধ্যে বেইজিংয়ে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।

পাশাপাশি আমেরিকার ইহুদি সম্প্রদায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার দাবি জানিয়েছে। ওদিকে হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে জার্মানিতে একটি মুসলিম সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গত ২৩ জুলাই ইসরায়েলের প্রতি অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার দাবিতে বিক্ষোভরত কয়েকজন ইহুদিকে গ্রেপ্তার করে মার্কিন ক্যাপিটল পুলিশ। তারা ক্যাপিটল ভবনের ভেতরে বিক্ষোভ করছিলেন। এমন এক সময় এই ঘটনা ঘটল, যখন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু কংগ্রেসে বক্তব্য প্রদানের জন্য আমেরিকায় অবস্থান করছেন। জার্মানিতে নিষিদ্ধ ঘোষিত মুসলিম ধর্মীয় সংগঠন ইসলামিক সেন্টার হামবুর্গ (ICJ)-এর বিরুদ্ধে ‘উগ্রবাদ’ প্রচার এবং ইরান ও হিজবুল্লাহকে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে জার্মানির চারটি শিয়া মসজিদ বন্ধ হয়ে যাবে এবং ওতঐ-এর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

গাজার যুদ্ধে হিজবুল্লাহর অংশগ্রহণ নতুন খবর নয়। নতুন হলো, তারা ইসরায়েলের নতুন লক্ষ্যবস্তুতে হামলার হুমকি দিয়েছে। এই হুমকির পর ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। ‘ইরানের অক্ষ’ বলে পরিচিত ইয়েমেনের হুতিদের হামলাও একই সঙ্গে আরও জোরদার হয়েছে। জাতিসংঘের ইয়েমেন বিষয়ক দূত হান্স গ্রুন্ডবার্গ সতর্ক করেছেন যে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের কারণে অঞ্চল জুড়ে একটি বিপর্যয়কর উত্তেজনা বাড়তে পারে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ইয়েমেনের পরিস্থিতি নিয়ে এক ব্রিফিংয়ে তিনি জানান, হুতি বিদ্রোহীদের বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা এবং ইসরায়েলের প্রথমবারের মতো ইয়েমেনে বিমান হামলার পর এই বিপদের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। গ্রুন্ডবার্গের মতে, পরিস্থিতি উত্তপ্ত এবং উত্তেজনা কমার কোনো লক্ষণ নেই, যা একটি সমাধান খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনাকে কমিয়ে দেয়।

ইসরায়েলি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা তাচি হানেগবি এই ঘটনাকে একটি ‘গ্লোবাল ইস্যু’ বলে অভিহিত করে বলেন, ইসরায়েল বিশ্বকে সময় দিচ্ছে এটি প্রতিরোধ করার, অন্যথায় দেশটি নিজেই নৌ-অবরোধ সরাতে পদক্ষেপ নেবে। এই বক্তব্যের ফলাফল আমরা দেখেছি ২০ জুলাই ইসরায়েলি বিমানের হোদেইদাহ বন্দরে সামরিক স্থাপনা ও তেলের ডিপোতে আক্রমণ, যার ফলে অন্তত ৬ জন নিহত এবং ৮৩ জন আহত হয়। এর আগে গত ৩ ডিসেম্বর হুতিরা জানায়, ফিলিস্তিনিদের জন্য খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ না হওয়া পর্যন্ত তারা ইসরায়েলি জাহাজগুলোকে রেড সি-তে চলাচল করতে দেবে না।

ইরাকের ইসলামিক প্রতিরোধ গোষ্ঠী ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন ও মিসাইল হামলা অব্যাহত রেখেছে। তেল আবিবসহ অন্তত ৯টি সামরিক এলাকায় হামলা চালিয়ে তারা দায় স্বীকার করেছে। তারা জানিয়েছে যে, ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ইসরায়েলি হামলার প্রতিশোধ নিতে তারা এই হামলা চালিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তারা শত্রুর ঘাঁটিতে আঘাত করতে থাকবে। জড়িয়ে গেছে সিরিয়াও। দামেস্কের ইরানি দূতাবাসে হামলা এবং ইরানের পক্ষ থেকে ইসরায়েল অভিমুখে পাল্টা কয়েকশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্য দিয়ে এর সূচনা। সর্বশেষ গত ১৩ জুলাই ইসরায়েলি বিমান হামলায় দামেস্ক এবং তার আশপাশের এলাকায় একজন সৈনিক নিহত এবং তিনজন আহত হয়। 

তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কূটনৈতিক উদ্যোগও চলছে সমানতালে। ২৩ জুলাই আরব আমিরাত, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে গাজায় যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করেছে। তারা একটি পুনর্গঠিত প্যালেস্টাইন অথরিটির (চঅ) ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক বাহিনীর অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা করেন। আরব আমিরাতের প্রস্তাবিত পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে যে পুনর্গঠিত চঅ গাজায় নিরাপত্তা এবং মানবিক সহায়তা প্রদান করার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগীদের আমন্ত্রণ জানাবে। এই পদক্ষেপ কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে এবং আঞ্চলিক সম্পর্কের গতি পরিবর্তন করেছে। আলোচনার ফলে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের ওপর নতুন করে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। 

এবার শুরুতে বলা ঘটনাগুলোর দিকে একবার নজর দিই। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ওঈঔ) গত ১৯ জুলাই সর্বসম্মতিক্রমে রায় দেয় যে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে। ভূমি দখল, বসতি সম্প্রসারণ, প্রাকৃতিক সম্পদ শোষণ, এবং ফিলিস্তিনিদের বলপ্রয়োগ করে উচ্ছেদসহ বিভিন্ন কার্যক্রমকে অবৈধ ঘোষণা করে ওঈঔ ইসরায়েলের পার্লামেন্টের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোর ওপর গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থটি বলেছে, ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনিদের সম্পত্তি ফিরিয়ে দিতে হবে এবং সব অবৈধ বসতিকে সরিয়ে ফেলতে হবে; এ ছাড়া, ইসরায়েলকে তার অপরাধের জন্য ফিলিস্তিনিদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এই রায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরও আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াভ গালান্তের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত (ওঈঈ) থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হতে পারে। যদিও তেল আবিব এই রায়কে প্রত্যাখ্যান করেছে।

গত ২৩ জুলাই ফিলিস্তিনি গ্রুপ হামাস ও ফাতাহ চীনে একটি ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছে যাতে তারা ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের পর পশ্চিম তীর এবং গাজা উপত্যকা পরিচালনার জন্য একটি ঐক্য সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই চুক্তিটি বেইজিংয়ে মঙ্গলবার ঘোষণা করা হয়েছে এবং এতে আরও ১২টি ছোট ফিলিস্তিনি দলও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই চুক্তিটি ফাতাহ-হামাসের মধ্যে দীর্ঘদিনের শত্রুতার পর সম্পর্কের উত্তাপ কমাতে এবং পুনর্মিলনের দিকে একটি সম্ভাব্য পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে হামাস বা ফাতাহর নেতৃত্বাধীন প্যালেস্টাইন অথরিটি দ্বারা গাজা পরিচালনার উদ্যোগকে ইসরায়েল প্রত্যাখ্যান করেছে। চীনের এই চুক্তি কেবলমাত্র ফাতাহ এবং হামাস কীভাবে একসঙ্গে কাজ করবে তার একটি সাধারণ ধারণা প্রদান করে। যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য পশ্চিমা দেশগুলো হামাসকে অন্তর্ভুক্ত করে গঠিত কোনো ফিলিস্তিনি সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি যদি না এটি ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়। ফলে চুক্তিটি চীনের মধ্যস্থতায় হলেও এর কার্যকারিতা এবং বাস্তবায়ন এখনো অনিশ্চিত।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অনেকে মনে করেন, বাইডেনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর পেছনে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ অনেকখানি দায়ী। বাইডেন প্রশাসন ইসরায়েলকে বিশাল সামরিক সহায়তা প্রদান করেছে এবং ইসরায়েলের প্রতি দৃঢ় সমর্থন দেখিয়েছে, তা গাজার সংকটকে আরও গভীর করেছে। গাজার মানবিক সংকটের আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে বারবার আলাপ হয়েছে যে, নেতানিয়াহুকে বাঁচাতে গিয়ে বাইডেন তার ক্যারিয়ার ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন।

বাইডেন পুনর্নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর, কমলা হ্যারিসকে ডেমোক্র্যাটদের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে দেখছেন অনেকে। কিন্তু হ্যারিসও ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন অব্যাহতই রাখবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে, ফিলিস্তিনিরা বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনরায় প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনায়ও শঙ্কিত। তাদের মতে, ট্রাম্পের শাসনামলে তাদের কষ্ট আরও বেড়ে যাবে।

বেশ কয়েকবার হামাসের হাতে আটক বন্দিবিনিময়ের বিষয়ে আন্তর্জাতিকভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হলেও গত দশ মাসেও তা আশার আলো দেখায়নি। হামাস বড় ছাড় দিতে রাজি হয়েছিল, যার ফলে চুক্তিটি এই সপ্তাহে সম্পন্ন হতে পারত এবং আগামী সপ্তাহে পণবন্দিরা মুক্তি পেত। তবে নেতানিয়াহুর নতুন শর্তগুলো আলোচনার পরিবেশ নষ্ট করেছে। নেতানিয়াহু তার সরকার পতনের ঝুঁকি এড়াতে নতুন দুটি শর্ত যুক্ত করেছেন। তিনি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীকে (ওউঋ) মিসর এবং গাজার মধ্যবর্তী ফিলাডেলফি করিডর নিয়ন্ত্রণে রাখার এবং সশস্ত্র হামাস বাহিনীকে উত্তর গাজায় ফিরে আসার অনুমতি না দেওয়ার শর্ত আরোপ করেছেন। জেরুজালেম পোস্ট বলছে, ‘এই শর্তগুলো কেবলমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এবং নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে প্রাসঙ্গিক নয়। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সক্রিয়ভাবে বন্দিমুক্তির চুক্তি নষ্ট করছেন।’

এরই মধ্যে ফিলিস্তিনে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। তবে গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলের অবস্থাও সুবিধাজনক নয়। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধের ফলে ইসরায়েলের মানবিক, সামরিক এবং মানসিক দিক থেকে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আহত সৈন্যসংখ্যা ও গোলাবারুদের ক্ষতি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা না জানা গেলেও, এই যুদ্ধের প্রভাব স্পষ্ট। সৈন্যদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং নারী সৈন্যদের নিয়োগ নিয়ে কোর্টের রায় ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীকে নতুনভাবে চিন্তা করতে বাধ্য করেছে। ইতিমধ্যে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গাজায় চলমান যুদ্ধে আহত ৯,৪০০ সৈন্যর মধ্যে প্রায় ৩৬ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পুনর্বাসন বিভাগ অনুমান করছে যে বছরের শেষে কমপক্ষে ৫,৬০০ জন মানসিক রোগে আক্রান্ত হবেন।

যুদ্ধের সমাপ্তি ঠিক কবে হবে, তা এখনো বলা যাচ্ছে না। হয়তো দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানই এই সংকটের একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ। বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। ভবিষ্যতে একটি বাস্তবসম্মত এবং টেকসই শান্তির জন্য এটি একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ। এ জন্য রাজনৈতিক ইচ্ছা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের শক্তিশালী সমর্থন প্রয়োজন।

তথ্যসূত্র : আলজাজিরা, এপি নিউজ, জেরুজালেম পোস্ট,

প্যালেস্টাইন ক্রনিকলস, ওয়াশিংটন পোস্ট 

লেখক: অনুবাদক ও কলাম লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত