পরিস্থিতি সুরাহায় আপিল বিভাগের রায়টা যুগান্তকারী

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২৪, ১২:৩৩ এএম

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার তানজীব উল আলম। সরকারি চাকরিতে কোটাবিষয়ক রায়ের আগে আপিল বিভাগ যাদের মতামত নিয়েছিল, তিনি তাদের মধ্যে একজন। ওই সূত্র ধরে তিনি কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরীদেশ রূপান্তর: সম্প্রতি আপিল বিভাগ কোটা সংস্কার নিয়ে যে রায় দিয়েছে এবং সরকার প্রজ্ঞাপনও জারি করেছে। রায়ের আগে আপনিসহ কয়েকজনের মতামতও জানতে চেয়েছিল আদালত। পুরো বিষয়টি নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

তানজীব উল আলম: আমার মনে হয়েছে যে আপিল ডিভিশনের রায়টা দুই পার্সপেক্টিভ থেকে একটা যুগান্তকারী রায়। একটা হচ্ছে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ, স্টুডেন্টদের এক্সপেক্টেশন এবং সরকারের দিক থেকে টোটাল বিষয়টা হ্যান্ডলিং নিয়ে যখন এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে যে সাধারণ জনগণের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল ওই সময় সুপ্রিম কোর্ট তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে শুধু এগিয়ে এসেছে তাই না, তার এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জনমনে একটা স্বস্তি এনেছে। দ্বিতীয়ত, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের যে দাবিটা ছিল সেটা পূরণের একটা আইনগত রাস্তা তৈরি হয়েছে। এই দুই পার্সপেক্টিভ থেকে যদি আপনি দেখেন, হাইকোর্টের রায়টা একটা যুগান্তকারী রায়। সুপ্রিম কোর্ট ১০৪ নম্বর আর্টিকেলের অধীনে প্রাপ্ত ক্ষমতাবলে তার এই সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে এগিয়ে এসেছে। এই ক্ষমতা যদি তখন সুপ্রিম কোর্ট প্রয়োগ না করত তাহলে কিন্তু শুধুমাত্র মামলাটা নিষ্পত্তির মধ্যেই থাকতে হতো এবং যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সেটার সুরাহা হতো না।

দেশ রূপান্তর: কিন্তু সরকারের নীতির বিষয়ে কি আদালত সিদ্ধান্ত দিতে পারে? হাইকোর্ট যখন সরকারের ঘোষণা স্থগিত করেছিল, তখনো এ রকম কথা উঠেছিল যে সেটা সরকারের নীতির ওপরে কোনো হস্তক্ষেপ করা কি না। আপনার মন্তব্য কী?

তানজীব উল আলম: হাইকোর্ট যখন রুলটা ইস্যু করে তখন একটা পার্টিকুলার টার্মে সেটা করেছে। হাইকোর্টে রিপিটিশনটা যখন মামলার পিটিশনাররা ফাইল করেন তখন তারা ২০১৮ সালের প্রজ্ঞাপনকে চ্যালেঞ্জ করেন। সেটার বেসিসটা ছিল যে প্রজ্ঞাপনটার মাধ্যমে তো সব ধরনের কোটা তুলে নেওয়া হয়েছে। এখন তুলে নেওয়ার যে সিদ্ধান্তটা সেটা যদি চ্যালেঞ্জ করতে হয় তাহলে তার তো একটা লিগ্যাল বেসিস লাগবে যে এই কারণে এটা অবৈধ। সেক্ষেত্রে তারা বেসিসটা দিয়েছিল ইতিপূর্বেকার একটা রায় যেটা দিয়েছিল রিট পিটিশন নম্বর ২৩৫-এ। এখন সেই রিট পিটিশন নম্বর ২৩৫ যে রায়টা দেওয়া হয়েছিল এমন একটা সময়ে যখন কোটাব্যবস্থা বহাল ছিল। ওরা বলতে চাচ্ছিল যে ইতিপূর্বে যেহেতু মুক্তিযোদ্ধার স্বজনদের জন্য ৩০% কোটা স্ট্রিক্টলি ফলো করার জন্য হাইকোর্টে একটা রায় দেওয়া আছে এবং সেই রায়টাও আপিল বিভাগে আপহেল্ড করে। সুতরাং এই যে ২০১৮ সালে এসে সেই কোটা বাতিল করার সিদ্ধান্তটা আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট ডিভিশনের ওই সিদ্ধান্ত দুটোরই পরিপন্থী। এ কারণে ২০১৮ সালের সার্কুলারটা অবৈধ। আপনি যদি দেখেন তাদের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে যে মামলাটা করেছে রিট পিটিশনটা ফাইল করেছে সেটার বেসিস আরেকটা হাইকোর্টের রায়। প্রশ্নটা হচ্ছে যে হাইকোর্টের ওই রায়টা একটা মানুষের রাইট অফ বেসিক হতে পারে কি পারে না। তো হাইকোর্ট তখন তার রায়টা দিতে গিয়ে বলেছে যে, হ্যাঁ ওই রায়ের আলোকে যেহেতু বলেছে যে এটা ফলো করো সুতরাং আপনার এটা ফলো না করে কোনো উপায় নাই। কিন্তু এখানে বুঝতে হবে যে রিট পিটিশন নম্বর ২৩৫ এর ভিত্তিতে যে রায়টা হয়েছিল, সে সময় কিন্তু কোটা পদ্ধতি বহাল ছিল। এখন আপনার প্রশ্নের জবাবে যেটা বলতে চাই কোটা পদ্ধতি বাতিল কিংবা বহাল থাকবে কি থাকবে না সেটা তো একটা ইন্ডিপেন্ডেন্ট সোর্স অফ পাওয়ারের বিষয়। আর সেই বিষয়, মানে সেই ক্ষমতাটা সরকারের আছে কি নাই। আপিল বিভাগও তো  বলেনি যে আপনি কখনো এটা পরিবর্তন করতে পারবেন না। পরিবর্তনের ক্ষমতাটা হাইকোর্টের কাছে কখনই দেওয়া ছিল না, এমনকি কোটা নির্ধারণেরও বিষয় ছিল না। হাইকোর্ট যখন বলেছিল আপনি ৩০% ফলো করেন তখন হাইকোর্ট বেসিক্যালি সরকারের সিদ্ধান্তটাকেই ফলো করতে বলেছিল। সিদ্ধান্ত প্রদানের ক্ষমতা এক্ষেত্রে সরকার। কারণ সংবিধান ২৯ নম্বরের ৩ নম্বর উপ-অনুচ্ছেদে ক্ষমতাটা সরকারকে দিয়েছে।

দেশ রূপান্তর: আপিল বিভাগের রায়ে আপনার মতামতের কতখানি প্রতিফলন দেখছেন?

তানজীব উল আলম: আমি এই মামলাটা শুনানিকালে ৩টা লিগ্যাল প্রশ্নে আমার মতামত দিয়েছিলাম। একটা লিগ্যাল প্রশ্ন ছিল যে হাইকোর্ট যে জাজমেন্টটা দিল যেটার মাধ্যমে ২০১৮ সালের পরিপত্রটাকে বাতিল ঘোষণা করল সেটা যথাযথ হয়েছে কি না। আমার অভিমত ছিল যে হাইকোর্টের রায়টা আসলে প্রচলিত আইনের পরিপন্থী এবং হাইকোর্টের এই রায়টা অবশ্যই বাতিল হওয়া উচিত। তো আমি কেন বাতিল হওয়া উচিত সেটার বিভিন্ন কারণ দেখিয়েছিলাম। একটা হলো হাইকোর্ট এ রকম পদ্ধতিতে যে ম্যাটেরিয়ালের ওপরে ভিত্তি করে এই রায়টা দিয়েছে সেই ম্যাটেরিয়ালগুলোই আসলে প্রযোজ্য না। হাইকোর্ট আসলে যে ম্যাটেরিয়ালের ওপর রিলাই করে বলেছে যে ১৮ সালের পরিপত্রটা বাতিল হবে, সেটা ছিল ইতিপূর্বে প্রদত্ত জাজমেন্ট। তখন আমি দেখিয়েছি যে ওই জাজমেন্টের বেসিসটা চেঞ্জ হয়েছে। সুতরাং সরে যাওয়ার রায়ের ওপরে দ্বিতীয় রায় হওয়াটা আইনসম্মত হয়নি। দ্বিতীয়ত যেটা বলেছি সেটা হচ্ছে যে হাইকোর্ট যদিও স্বীকার করেছে কোটা নির্ধারণের ক্ষমতাটা সরকারের নির্বাহী বিভাগের কিন্তু একই সময়ে বলে দিচ্ছে যে সরকার নির্ধারণ করতে পারবে না; চেঞ্জ করতে পারবে না। এখন আপনি যদি একমুখে স্বীকার করছেন যে কোটা নির্ধারণটা সরকারের এখতিয়ার, তাহলে কোটা বাতিল করাটাও সরকারের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে। কারণ বাতিল করাটাও তো এক ধরনের সংস্কার। তার মানে যিনি প্রবর্তন করেছেন তিনিই বাতিল করেছেন। সেখানে কোর্ট বলতে পারে না যে আপনি বাতিল করতে পারেন না। তৃতীয়ত যে বিষয়টা ছিল, কোন কোটা থাকবে, কাকে কী কোটা দেওয়া হবে সেটা পলিসি ম্যাটার। কারণ এটা সরকারেরই নীতি আর সে-ই সেটা নির্ধারণ করতে পারবে যে আমার ডিটারমিনেশনে কে অনগ্রসর কিংবা কোন ফ্রাকশন অব দ্য সোসাইটিকে আমার এ রকমভাবে বিশেষ বিবেচনায় আনা উচিত। ডিসিশনটার ক্ষমতা যেহেতু পলিসি ম্যাটার। সুতরাং হাইকোর্ট ডিভিশন রিটে পলিসি ম্যাটারে ইন্টারফেয়ার করতে পারে না। এটা অনেকটা প্রতিষ্ঠিত প্রিন্সিপাল অব ল’। তো এই গ্রাউন্ডে এভাবে কোটা নির্ধারণ করে দেওয়াটা কিংবা বাতিল করার সিদ্ধান্তটা অবৈধ হয়েছে বলাটারও কোনো এখতিয়ার হাইকোর্টের নেই। এটা ছিল আমার ফার্স্ট আর্গুমেন্ট যে, কী কারণে হাইকোর্টের এই রায়টা বাতিল হওয়া উচিত। সেকেন্ড আর্গুমেন্ট ছিল যে, যেই টার্মে রুলটা ইস্যু হয়েছে সেই টার্মে রুলটা আসলে মেইনটেইনেবল না। সেই টার্মটা কী? এই রুলটা ইস্যু করা হয়েছে এমন সব ব্যক্তিদের, পিটিশনারদের পক্ষে যারা কেউই চাকরিপ্রার্থী না, কেউই আসলে কোটা বঞ্চিত হয়নি। আমাদের সংবিধানে একটা বিধান আছে যে কারা কারা হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করতে যাবেন। একজন ব্যক্তি তখনই রিট পিটিশন দাখিল করতে পারেন যদি তিনি সংক্ষুব্ধ হন। তো যারা পিটিশনার হিসেবে মামলা ফাইল করেছেন তাদের কারোরই কোটাভিত্তিক এপয়েন্টমেন্ট বাতিল হয়নি এবং পার্টিকুলার এপয়েন্টমেন্ট প্রসেসও তাদের কেউ চ্যালেঞ্জ করেনি। আপনি যে দাবি করবেন কোটা বহাল রাখা হোক, সেটার জন্য তো আপনার একটা কজ অফ অ্যাকশন লাগবে। সেই কজ অফ অ্যাকশন এখানে ছিল না। সুতরাং ওই কারণেও ওটা বাতিল করতে হবে।

দেশ রূপান্তর: আপিল বিভাগের রায়ের আলোকে কোটা সংস্কার করে প্রজ্ঞাপনও জারি হয়ে গেল। কিন্তু, আন্দোলনকারীরা বলছেন যে তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা হয়নি, এছাড়া নারী ও জেলা কোটা বাদ দেওয়া নিয়েও নানা রকম কথা উঠছে। আপনার মন্তব্য কী?

তানজীব উল আলম: আমি মনে করি আদালত যে রায়টা দিয়েছে সেটা বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে সুবিবেচনাপ্রসূত একটা রায়। আপিল বিভাগ যদিও একমুখে স্বীকার করে যে কোটা বিষয়ক আইনকানুন কিংবা কোটা বিষয়ে সিদ্ধান্ত দানের ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের ওপর ন্যস্ত আছে। তাহলে নির্বাহী বিভাগের পাওয়ারটা কি আপিল বিভাগ নিজে এক্সপ্রেস করতে পারে? এন্সার হওয়া উচিত, ‘না’। সাংবিধানিকভাবে এটা স্বীকৃত যে, নির্বাহী বিভাগের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়ে আপিল বিভাগ কিংবা হাইকোর্ট বিভাগ ইন্টারফেয়ার করতে পারে না। আমরা যদি এটা স্বীকার করি যে, কোটা বিষয়টা নির্বাহী বিভাগের অন্তর্ভুক্ত তাহলে আপিল বিভাগ কীভাবে ৯৩%, ৫%, ১%, ১% কোটা নির্ধারণ করে দেয় এটা আপাতদৃষ্টিতে কন্ট্রাডিকটরি মনে হতে পারে। কিন্তু আপনাকে দেখতে হবে যে, আদালত হাইকোর্টের যে রায়টা ছিল সেটা বাতিল করেছে এবং বাতিল করার পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের কাছে এই যে উদ্ভূত পরিস্থিতি সেটাকে সমাধানের জন্য সংবিধানের জন্য ১০৪ অনুচ্ছেদ ব্যবহার করা ছাড়া অন্য কোনো পন্থা খোলা ছিল না। কারণ যদি শুধুমাত্র হাইকোর্টের রায়টা বাতিল বলে ঘোষণা করত তাহলে কোটা সংস্কারের বর্তমান যে দাবি সেটার জন্য যে কারফিউ অবস্থা সেটার তো তাৎক্ষণিক সমাধান হতো না। তখন তো এটা গিয়ে পড়ত নির্বাহী বিভাগের ওপর এবং নির্বাহী বিভাগের কাছে দাবি জানিয়ে ছাত্ররা আন্দোলন করছে। ফলে, নির্বাহী বিভাগকে বিষয়টি নিয়ে একটা নেগোসিয়েশন প্রসেসের মাধ্যমে গিয়ে তারপরে সমাধানে আসতে হতো। কিন্তু সেজন্য যে সময়টুকু দরকার সেটা তো আমাদের হাতে ছিল না কিংবা নেই। কারণ তখন চতুর্দিকে কারফিউ, ফলে তাদের দাবির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিতে আদালতের একমাত্র হাতিয়ার হচ্ছে ১০৪ অনুচ্ছেদ। ওদের সঙ্গে বসে নেগোশিয়েট করে সমাধানের কোনো উপায় তো তখন ছিল না। আপনাকে যদি টোটাল কনস্টিটিউশনাল ডিস্পেন্সেশন বিবেচনা করতে হয় তাহলে যেই পদ্ধতিতে সিদ্ধান্তটা নিয়েছে সেটা ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিল না। এবার আসেন, কোটার ভাগ প্রসঙ্গে। যেকোনো নম্বরই সেটা মেধা বা কোটার পরিমাণ বলেন, অল দি নাম্বারস আর অলওয়েজ আর্বিটারি। কারণটা কী, এই যে মেধার ভিত্তিতে ৯৩ বলা হলো, সেটা ৯০ হলে অসুবিধা কী ছিল? যদি পার্সেন্টেজের হিসাব করে সিদ্ধান্ত সঠিক হয়েছে কি হয়নি সেই বিবেচনা করেন, তাহলে আপনি কখনই সমাধানে পৌঁছাতে পারবেন না। যেমন নারীদের কোটা বাদ দেওয়া হলো। এখন সংবিধানের ১০৪  অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী আপিল বিভাগ যে সিদ্ধান্ত দিয়েছে সেটার মধ্যে এটাও বলে দিয়েছে যে সরকার ইচ্ছে করলে এই অনুপাতটা নির্ধারণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে কিংবা এটার যেকোনো পরিবর্তন পরিমার্জন করতে পারবে। তার মানে এই রাস্তা তো খোলা আছে। এখন এসেনশিয়ালি বিষয়টা সরকারের এখতিয়ারাধীন। সরকার তো বলতে পারে যে আমরা নারী কোটা ভবিষ্যতে যদি কখনো প্রয়োজন মনে করি, অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ইন্ট্রডিউস করব।

দেশ রূপান্তর: একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে যেতে চাই। বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিটির কোনো আইনি ভিত্তি আছে?

তানজীব উল আলম: হ্যাঁ, আছে। কমিশন অফ ইনকোয়্যারি অ্যাক্ট ১৯৫৬ বলে আলাদা একটা আইনই আছে। ওই আইনে কোন কোন বিষয়ে বিচারবিভাগের মাধ্যমে তদন্ত করবে সেই ক্ষমতাটা আবার সরকারকে দিয়েছে।

দেশ রূপান্তর: পার্টিকুলার বিষয়ে তদন্ত করার পরে তারা এই রিপোর্টটা সরকারকে দেবে নাকি আদালতকে দেবে?

তানজীব উল আলম: এটা সরকারকেই দেবে।

দেশ রূপান্তর: আমরা তো আসলে সে রকম রিপোর্ট প্রকাশ হতে দেখি না। তাহলে এটার আউটপুটটা আসলে কী? এখন বিচার বিভাগ যে তদন্ত করল আর সেখানে সরকার বা সরকারের কোনো সংস্থার গাফিলতি পাওয়া গেল আর সেই রিপোর্ট সরকার পেয়ে চুপ করে থাকল, তাহলে তো এর কোনো মানে নেই। এটা কি একটু ক্লিয়ার করবেন?

তানজীব উল আলম: আপনার এই কনফিউশনটা দূর হয়ে যাবে যদি আপনি বিচারবিভাগীয় তদন্ত বিষয়ে যে আইনটা আছে সেটায় একটু চোখ বুলানোর সুযোগ পান। জুডিশিয়াল ইনকোয়ারি অ্যাক্ট আইনে বলা আছে যে, দেশে কোনো রকমের কোনো ঘটনা ঘটে যেটার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য সরকার যদি মনে করে যে একজন জুডিশিয়াল অফিসারের মাধ্যমে তদন্ত হওয়া দরকার, তখন সরকার বিচারবিভাগীয় জুডিশিয়াল তদন্তের জন্য তদন্তকারী নিয়োগ করবে। প্রশ্নটা হচ্ছে যে, কেন একজন বিচারবিভাগীয় তদন্তকারী নিয়োগ করা হয়? এটার নাম্বার অফ রিজনস থাকতে পারে। একটা হচ্ছে যে যদি ঘটনাটা এমন ধরনের হয়ে থাকে যেটা সরকার মনে করে তদন্ত হওয়া উচিত এমন একজনকে দিয়ে যিনি প্রশাসনের অংশ নন। কিংবা এমন একজনকে দিয়ে তদন্ত হওয়া উচিত যিনি এই ধরনের তদন্ত প্রক্রিয়ায় আইনগত বিষয়গুলো সম্পর্কে সম্যক অবগত। এই আইনের নাম হচ্ছে কমিশন অফ ইনকোয়ারি অ্যাক্ট ১৯৫৬। এখানে আইনের বিধানে তিন নম্বর সেকশন পড়ে শোনালে বুঝবেন যে কেন আসলে এই কমিশন এপয়েন্ট করার ক্ষমতাটা দেওয়া হয়েছে। এখানে বলা আছে, “The Government may, if it is of opinion that it is necessary so to do, by notification in the official Gazette, appoint a Commission of Inquiry for the purpose of making an inquiry into any definite matter of public importance and performing such functions and within such time as may be specified in the notification, and the Commission so appointed shall make the inquiry and perform the functions accordingly.”

দেশ রূপান্তর: ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রেও কি এই কমিশন কাজ করবে?

তানজীব উল আলম: না না। আপনার প্রশ্নের উত্তরটা আছে এই শব্দের মধ্যে, Inquiry into any definite matter of public importance, মানেটা হচ্ছে সরকারের ক্ষমতাটা এখানে ওয়াইড রেঞ্জিং। যদি সরকার মনে করে এটা এমন একটা বিষয় এনি ডেফিনিট ম্যাটার অফ পাবলিক ইমপর্টেন্স সেটা অপরাধ ঘটিত হোক, বা যে কোনো ঘটনা... যতক্ষণ ম্যাটারটা পাবলিক ইমপর্টেন্স এর, তখনই বিষয়টা তদন্তের জন্য একজন কমিশনার ইনকোয়ারি তৈরি করতে পারবেন।

দেশ রূপান্তর: এবারের ছাত্র আন্দোলনে হতাহতের ঘটনা নিয়ে তো একটা তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। এই তদন্ত কমিটির রিপোর্ট কি আমরা দেখতে পারব বা আমাদের দেখতে চাওয়ার কি কোনো সুযোগ আছে?

তানজীব উল আলম: এখানে আপনাকে আমি আবারও যে আইনের মাধ্যমে এই কমিশনটা গঠন করা হয়েছে সেই আইনটা রেফার করব। এই আইনে সরকারকে বাধ্যবাধকতা দেয়নি যে তদন্ত কমিটির রিপোর্টটা তার প্রকাশ করতে হবে।

দেশ রূপান্তর: নাগরিক হিসেবে আমি কি সেটা কোনোভাবে পেতে পারব? তথ্য অধিকার আইনে?

তানজীব উল আলম: নাগরিক হিসেবে আপনি কোন আইনে সরকারকে বাধ্য করবেন, যে আইনেই যদি এই ক্ষমতা থাকে যে আপনি এটা প্রকাশ করতে বাধ্য না? আপনি কি বেআইনি দাবি সরকারের কাছে করতে পারেন? আর তথ্য অধিকার আইনেই বলা আছে যে যদি এ রকম কোনো আইনে সরকারকে এই ধরনের ক্ষমতা দেওয়া থাকে তাহলে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় সেটা পড়বে না।

দেশ রূপান্তর : বিভিন্ন সময়ে নানান পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের বিচার বিভাগ স্বাধীন কি না, এমন প্রশ্ন অনেকে করে থাকেন। আপনি কি মনে করেন বিচার বিভাগ স্বাধীন?

তানজীব উল আলম: আমি মনে করি যারা এই ধরনের মন্তব্য করেন ওনারা কোনো ধরনের অবজেক্টিভ বেসিস ছাড়া বলেন। বিচার বিভাগ স্বাধীন কি স্বাধীন না সেটা নিয়ে ইদানীংকার কথাবার্তাগুলো দেখা যাচ্ছে যে পার্টি লাইনে হয়ে যাচ্ছে। আপনি কোন পার্টি করেন, সেটার ওপর ভিত্তি করে ডিসিশন আসছে যে আপনার চোখে বিচার বিভাগ স্বাধীন কি স্বাধীন না। কিন্তু আমি মনে করি যে বিচার বিভাগ বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে যথেষ্ট স্বাধীন এবং স্বাধীন বিচারব্যবস্থার প্রতিফলন হচ্ছে কোটা বিষয়ে আপিল বিভাগের এই সিদ্ধান্তটা।

দেশ রূপান্তর: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে

তানজীব উল আলম: আপনাকেও ধন্যবাদ, আল্লাহ হাফেজ।

অনুলিখন : মোজাম্মেল হৃদয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত