হেপাটাইটিসে দেরি নয় প্রয়োজন দ্রুত চিকিৎসা

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২৪, ১২:১৫ এএম

যকৃৎ বা লিভার দেহের বৃহত্তম ও গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থি। শরীরে শর্করা, ফ্যাট ও প্রোটিনের বিপাক, হিমোগ্লোবিনের ভাঙন এবং পিত্ত উৎপাদনের মতো আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া সম্পাদন করে যকৃৎ। হেপাটাইটিস হলো সেই যকৃতের প্রদাহজনিত রোগ, যা হেপাটাইটিস ভাইরাসের সংক্রমণে হয়।

হেপাটাইটিসকে বলা হয়

‘নীরব ঘাতক’।

হেপাটাইটিস থেকে লিভার

সিরোসিস এমনকি লিভার

ক্যানসারও হতে পারে।

লিখেছেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি

অব হেল্থ সায়েন্সের

এপিডেমিওলজি বিভাগের শিক্ষার্থী জান্নাতুল কাওসার

দিবসের সূচনা

প্রতি বছর ২৮ জুলাই পালিত হয় বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস। হেপাটাইটিস বিষয়ক সচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে ২০১১ সাল থেকে হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধক টিকার আবিষ্কারক বারুচ স্যামুয়েল ব্লুমবার্গের জন্মদিনে এই দিবস পালিত হয়ে আসছে। উন্নত পরিষেবা প্রদান, টেস্টিং প্রোটোকল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে হেপাটাইটিস ডি শনাক্তকরণ এবং উচ্চমানের পরিষেবা  দেওয়ার সঙ্গে ডায়াগনস্টিকগুলো উন্নত করা এই তিন লক্ষ্যকে জোরদার করে ‘its time to act’ প্রতিপাদ্য নিয়ে পালিত হচ্ছে এবারের বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস। এই দিবস পালনের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হলো হেপাটাইটিসে আক্রান্তদের সহায়তা করা এবং হেপাটাইটিস প্রতিরোধ, পরীক্ষা এবং চিকিৎসার প্রচার করা।

হেপাটাইটিসের ধরন

হেপাটাইটিস ভাইরাস ৫ ধরনের রয়েছে। হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি এবং ই। এর মধ্যে এ এবং ই ভাইরাসটি পানিবাহিত। দূষিত পানি এবং খাদ্যের মাধ্যমে হেপাটাইটিস এ এবং ই মানুষের মধ্যে ছড়ায়। সব ধরনের মধ্যে এই দুটি প্রকারের ভাইরাস সংক্রমণ হলো স্বল্পমেয়াদি। পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও চিকিৎসা নিলে কিছুদিনের মধ্যেই রোগী ভালো হয়ে ওঠে। বাকি তিনটি ধরন বি, সি এবং ডি হলো জটিল ধরনের হেপাটাইটিস। বি ও সি হেপাটাইটিস ভাইরাস রক্ত ও মানবদেহের তরল পদার্থের মাধ্যমে ছড়ায়। যারা হেপাটাইটিস বি দ্বারা আক্রান্ত হয় শুধু তাদের মধ্যেই হেপাটাইটিস ডি-এর সংক্রমণ হয়। বলা বাহুল্য, বি এবং ডি দুটি ভাইরাস দ্বারা একই সঙ্গে আক্রান্ত হলে তার ফলাফল বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয় ভয়াবহ।

লিভার ক্যানসারের প্রধানতম কারণ হলো হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাস। আর লিভার ক্যানসার বিশ্বে ও বাংলাদেশে ক্যানসারজনিত মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ। এই দুই ভাইরাসজনিত লিভার রোগের কারণে বিশ্বজুড়ে প্রতি ৩০ সেকেন্ডে একজন মানুষের মৃত্যু হয়।

নীরব ঘাতক এই হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাস বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রথম পর্যায়ে রোগের কোনো উল্লেখযোগ্য লক্ষণ প্রকাশ করে না। ১০ জন আক্রান্তের মধ্যে ৯ জনই জানেন না যে, তারা হেপাটাইটিস দ্বারা আক্রান্ত।  বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, হেপাটাইটিস সংক্রমণে বিশ্বব্যাপী প্রতিদিন ৩,৫০০ জন মারা যাচ্ছে। এদের মধ্যে হেপাটাইটিস বি থেকে ৮৩ শতাংশ, হেপাটাইটিস-সি থেকে ১৭ শতাংশ। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, হেপাটাইটিসে আক্রান্তের দুই-তৃতীয়াংশই বাংলাদেশ, চীন, ইথিওপিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, রাশিয়া এবং ভিয়েতনামে।

দেশের অবস্থা

বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২২,০০০ রোগী হেপাটাইটিস বি এবং সি ঘটিত লিভার রোগে মারা যায়। প্রায় ১৮ কোটি জনগণের মধ্যে প্রায় ১ কোটি আক্রান্ত। বাংলাদেশে হেপাটাইটিসের বি ভাইরাসে ৫ শতাংশ ও সি ভাইরাসে ৮ শতাংশ আক্রান্ত। এই ভাইরাস মানবদেহে প্রবেশ করে শুরুতে তেমন কোনো লক্ষণ না দিয়ে পড়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। হেপাটাইটিস বি ভাইরাস আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি ৩০ থেকে ৫৪ বছর বয়সীদের। অর্থাৎ কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সময় বেশি আক্রান্ত হয়। বোঝার আগেই সব কিছু শেষ হয়ে যায়।

কীভাবে আক্রান্ত হয়

বাংলাদেশে হেপাটাইটিস রোগ নীরবে অনেক মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হলো সেলুনে শেভ করতে গিয়ে ক্ষুর থেকে, সিরিঞ্জের মাধ্যমে ড্রাগস গ্রহণ, ট্যাটু করার মাধ্যমে, নাক-কান ফুটানো, রক্ত পরিসঞ্চালন, অনিরাপদ যৌনমিলন। ভাইরাস সংক্রমণ হলে দ্রুত ধরা পড়লে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে শুরুতেই এই ভাইরাসকে শরীর থেকে বিতারিত করা যায়। কিন্তু যদি ৬ মাস বা তার বেশি সময় এটি শরীরে অবস্থান করে সে ক্ষেত্রে এটিকে দীর্ঘমেয়াদি বা ক্রনিক হেপাটাইটিস বলে চিহ্নিত করা হয়।

বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে হেপাটাইটিস সংক্রমণ জন্ডিস হিসেবে পরিচিত। আমাদের দেশে এই রোগে মৃত্যুর আরেকটি কারণ হলো, এ রোগে আক্রান্তরা অনেক ক্ষেত্রেই সুচিকিৎসা পান না। আর বাংলাদেশে হেপাটাইটিসে আক্রান্তদের একটা বড় অংশ ঝাড়ফুঁক, পানি পড়া, ডাব পড়া নেওয়ার মতো কবিরাজি চিকিৎসার দ্বারস্থ হন। এতে সঠিক চিকিৎসা পেতে তাদের দেরি হয়ে যায় এবং রোগটি আরও গভীরে চলে যায়। এ ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক কুসংস্কারের কারণে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ভয়ে অনেকে এই রোগের বিষয়টি গোপন রাখেন।  বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তে দেখা গেছে, উন্নত বিশ্বের তুলনায় আমাদের দেশে লিভার ফেইলিউরের রোগীর সংখ্যা বেশি। পাশাপাশি মৃত্যুর হারও বেশি। দেশে তীব্র লিভার ফেইলিউরের চিকিৎসায় প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা সেভাবে শুরু হয়নি। এ চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা কম থাকায় মৃত্যু হচ্ছে বেশি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া রোগীদের দেখা যায়, ১৫-২০ ভাগ রোগী লিভারের কোনো না কোনো সমস্যা নিয়ে ভর্তি হয়েছেন। তবে এত নিরাশার মাঝে একটি আশার কথা এই যে, গত দশ বছরের তুলনায় লিভার রোগীর পরিমাণ কমেছে। এর পেছনে রয়েছে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির অবদান উল্লেখযোগ্য। দেশে এখন শিশুদের হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসের টিকা শতভাগ দেওয়া হচ্ছে।

হেপাটাইটিস বি এবং সি সংক্রমণের কারণে লিভার ফেইলিউর হয় আর সে ক্ষেত্রে লিভার প্রতিস্থাপন করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। আমাদের দেশে এখন সফলভাবে লিভার প্রতিস্থাপন সম্ভব হলেও বৃহৎ পরিসরে সেই সুযোগ এখনো নেই এবং ব্যয়বহুলও বটে। এ কারণে লিভার ফেইলিউর প্রতিরোধে আমাদের মনোযোগী হতে হবে বেশি।

‘বি’ ভাইরাস যেহেতু আমাদের দেশে লিভার ফেইলিউরের বড় কারণ, তাই ‘বি’ ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে হবে। এখন শুধু শিশুদের এ ভাইরাসের টিকা দেওয়া হচ্ছে। এটি সব বয়সী লোকদের মধ্যে দিতে হবে। ব্যবহৃত সুইয়ের ব্যবহার একেবারে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কান বা নাক ফোঁড়ানোর ক্ষেত্রে পুরনো পদ্ধতি অর্থাৎ অপরিচ্ছন্নভাবে না করে আধুনিকভাবে করতে হবে। এন্ডোস্কপি, কোলনোস্কপি ও দাঁতের চিকিৎসাসহ এ ধরনের ক্ষেত্রে জীবাণুমুক্তকরণ পদ্ধতি সঠিকভাবে মেনে চলতে হবে। চিকিৎসাকে আরও সহজলভ্য করতে হবে। প্রয়োজনে প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে আলাদাভাবে হেপাটাইটিস ইউনিট গঠন করতে হবে।

নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন

রক্তের মাধ্যমে হেপাটাইটিস বি এবং সি, বিশেষ করে সি ভাইরাস, যেটি লিভার ক্যানসারের কারণে সবচেয়ে বেশি ছড়ায়।  আক্রান্ত রক্ত সংস্পর্শে এলে আরেকজনও আক্রান্ত হয়ে পড়ে, তাই নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন ব্যবস্থা জরুরি। কিন্তু বাংলাদেশে রক্তদানের আগে যে পরীক্ষা করা হয় সেখানে সবসময় হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস ধরা পড়ে না। বি ও সি ভাইরাস রক্তে সংক্রমণের পর একটা উইন্ডো পিরিয়ড থাকে ২ থেকে ৬ মাস। এ সময় সাধারণ রক্ত পরীক্ষায় এ ভাইরাস ধরা পড়ে না। এ সময় কেউ যদি রক্ত আদান-প্রদান করেন তাহলে অগোচরেই ভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে পড়ে। এটি নিরূপণে ডিএনএ ভাইরাল মার্কার বা এইচভিসি টোটাল টেস্ট প্রয়োজন হয়। আমাদের দেশে জেলা-উপজেলা হাসপাতালগুলোকে আমরা প্রাইমারি সেকেন্ডারি হসপিটাল বলে থাকি। কিন্তু এগুলোর সব হাসপাতালে রক্তে হেপাটাইটিস পরীক্ষায় এইচভিসি ভাইরাল মার্কার বা এইচভিসি  টোটালÑ এই টেস্টগুলো করার ব্যবস্থা নেই। এগুলো ছাড়া নিশ্চিত হওয়া যায় না যে, রক্তে ভাইরাস আছে কী নেই। কাজেই এই টেস্ট যেন সব হাসপাতালে করা যায় সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

সচেতনতা

মানুষের মধ্যে সচেতনতা এবং স্বাস্থ্যশিক্ষা বাড়িয়ে তুলতে হবে। হেপাটাইটিস ধরা পড়লে সেটির উপশমে কম খরচের জেনেরিক ওষুধই কার্যকরী। তবুও অনেক মানুষ দ্রুত চিকিৎসার শরণাপন্ন হয় না বিধায় রোগটি মারাত্মক আকার ধারণ করে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন মাধ্যমে মানুষের মধ্যে হেপাটাইটিস সংক্রান্ত সচেতনতা বাড়িয়ে তুলতে সরকারি এবং বেসরকারি সম্মিলিতভাবে মাঠ পর্যায় থেকে কাজ করতে হবে। উচ্চ ঝুঁকিতে যারা রয়েছে যেমন মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা, যারা ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ করে তাদের নিয়ে কাজ করতে হবে। সবার জন্য হেপাটাইটিসের টিকা সহজলভ্য করে দেওয়া প্রয়োজন। এর সঙ্গে অবশ্যই স্ক্রিনিংয়ের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে কেউ হেপাটাইটিসের বাহক কিনা এটি জানা গেলে, তার থেকে যেন এই রোগ অন্যদের মাঝে না ছড়ায় সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে রক্তের হেপাটাইটিস পরীক্ষা করার ক্যাম্পেইন করা হলে দ্রুত হেপাটাইটিস শনাক্ত করা সম্ভবপর হবে।

আমাদের দেশে হেপাটাইটিসজনিত মৃত্যুর হার কমাতে হলে সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ নিশ্চিত করা, ভ্যাক্সিনকে সহজলভ্য করা এবং সবার মাঝে হেপাটাইটিস ভ্যাক্সিন প্রদান করার কর্মসূচি, পাশাপাশি ব্যাপক পরিসরে হেপাটাইটিস স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম চালু করা সম্ভব হলেই খুব দ্রুতই আমাদের দেশ থেকে হেপাটাইটিস নির্মূল করা সম্ভব হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত