কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় খুনের সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়া হবে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, তাদের বিচার করতে হবে, তা না হলে মানুষের নিরাপত্তা দেওয়া যাবে না।
গতকাল রবিবার দুপুরে গণভবনে কোটা সংস্কার আন্দোলন কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সহিংসতায় নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সময় এ কথা বলেন সরকারপ্রধান।
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিহত ৩৪ জনের পরিবারের সদস্যরা গতকাল গণভবনে আসেন। প্রধানমন্ত্রী সান্ত্বনা দেওয়ার পাশাপাশি আর্থিক সহায়তা হিসেবে তাদের হাতে পারিবারিক সঞ্চয়পত্র এবং নগদ অর্থ তুলে দেন।
এ ছাড়া গতকাল বিকেলে কোটা সংস্কার আন্দোলন কেন্দ্র করে সহিংসতায় আহত পুলিশ সদস্যদের দেখতে রাজারবাগে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি আহত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কিছু সময় কাটান এবং তাদের চিকিৎসার খোঁজখবর নেন।
গণভবনে নিহতদের স্বজনদের সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমার চেষ্টা থাকবে, যারা এ খুনের সঙ্গে জড়িত, খুঁজে খুঁজে বের করে তারা অবশ্যই যেন শাস্তি পায় সেটাই আমার প্রচেষ্টা
থাকবে, আমি সেটাই করব।’ তিনি আরও বলেন, ‘মানুষ কী দোষ করল যে, এভাবে মানুষ খুন করতে হবে! মানুষ খুন করে সরকার পতন এটা কবে হয়, কখন হয়? সাধারণ মানুষ কী দোষ করেছে?’
অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিতে নিহতের স্বজনদের কাছে সহযোগিতা চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদেরও সাহায্য চাই। যদি আপনারা কিছু জানেন, আমাদের জানাবেন। কারণ এভাবে বারবার বাংলাদেশটাকে নিয়ে খেলা, এটা আর হতে দেওয়া যায় না। কাজেই আমি আপনাদেরই সাহায্য চাই।’
শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘মানুষ মেরে লাশ ঝুলিয়ে রাখার মতো এই বর্বরতা, জানোয়ারের মতো ব্যবহার এটা কি কেউ করতে পারে। একজন মুসলমান আরেকজন মুসলমানের লাশ ঝুলিয়ে রাখবে পা বেঁধে! যারা এগুলোর সঙ্গে জড়িত অবশ্যই তাদের বিচার হবে। তাদের বিচার করতে হবে, তা না হলে মানুষের নিরাপত্তা দেওয়া যাবে না।’
সরকারপ্রধান বলেন, ‘আপনারা দেখেছেন প্রত্যেকটা জিনিস পুড়িয়ে-জ¦ালিয়ে ছারখার করে দিয়েছে। যেখানে মানুষ সেবা পাবে সেই জায়গাগুলো। সেই কভিড হাসপাতাল থেকে শুরু করে যে যে জায়গায় আমরা মানুষের জন্য কাজ করব, সেই জায়গা, প্রত্যেকটা জায়গা একে একে পুড়িয়ে দেওয়া। আর এভাবে গুলি করে মানুষকে মারা!’
স্বজন হারানো পরিবারের সদস্যদের শেখ হাসিনা বলেন, ‘আপনাদের কাছে শুধু এটুকু বলব, আপনারা সবুর করেন। আর আল্লাহকে ডাকেন যেন এসব খুনি-জালেম, এদের হাত থেকে আমাদের দেশটা যেন রেহাই পায়।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারীদের দাবি মানা এবং ধৈর্য ধরে তাদের বোঝানো হয়েছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ধৈর্য ধরে সবসময় তাদের বোঝানো, তাদের সঙ্গে কথা বলা, সব চেষ্টা করেছি। কিন্তু আজকে চারদিকে এই হাহাকার। এটা তো সহ্য করা কষ্টকর।’
শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘যারা আন্দোলন করেছে, তাদের সব দাবিই তো মেনে নিয়েছি। তাতেও নাকি দাবি শেষ হয় না। একটা মানি তো আরেকটা। তারপর আরও দুইটা। আবার চারটা। আবার আটটা। এ কী? বারবার বলেছি যে, ঠিক আছে, আমরা দেখছি, যা দাবি সবই তো মানলাম।’
সাম্প্রতিক সহিংসতায় নিহতদের পরিবার ও আহতদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যতক্ষণ বেঁচে আছি আপনাদের পাশে আছি। আমি আসলে আপনাদের কী বলে সান্ত্বনা দেব? শুধু এটুকু বলব যে, আমি আপনাদের মতোই একজন। বাবা-মা, ভাই হারানো সেই এতিম। কাজেই আপনাদের কষ্ট আমি বুঝি। আমি আছি আপনাদের জন্য, আপনাদের পাশে।’
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বজন হারানোর স্মৃতিচারণ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি তো বুঝি আপনাদের কষ্ট, আপনাদের বেদনা। প্রতিনিয়ত বাপ-মা-ভাই-বোনদের হারানোর ব্যথা নিয়ে আমাদের চলতে হয়। এমনকি লাশটাও তো দেখতে পারিনি, কাফন-দাফনটাও করতে পারিনি। দেশেও ফিরতে পারিনি, ছয় বছর আসতে দেয়নি আমাকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যখন (দেশে) এসেছি, সারা বাংলাদেশ ঘুরছি। চেয়েছি যেন এ দেশের মানুষের একটু আমার বাবা বলতেন দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাব। আমি সেই চেষ্টাই করে যাচ্ছিলাম। কিন্তু বারবার এ ধরনের ঘটনা ঘটাবে, এ সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটাবে এটা তো কাম্য নয়।’
নিহতদের স্বজনরা গণভবনে আসায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘সবাই এসেছেন কষ্ট করে, দুঃসময়ে। আজকে যদি ভালো সময় হতো কত হাসিখুশি করে সবাই যেতে পারতেন। আর এখন আমারও আপনাদের চোখের পানি দেখতে হচ্ছে। এটিই সবচেয়ে কষ্ট।’ বক্তব্যের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
নিহতদের পরিবারের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলার সময় অশ্রুসজল প্রধানমন্ত্রী তাদের সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ‘আমাকে দেখেন, আমি কত শোক নিয়ে বেঁচে আছি।’
এ সময় গণভবনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন উদ্দিন।
এদিকে বিকেলে প্রধানমন্ত্রী রাজারবাগে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি আহত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কিছু সময় কাটান এবং তাদের খোঁজখবর নেন। উন্নত চিকিৎসা এবং দ্রুত সুস্থতার জন্য আহত পুলিশ সদস্যদের সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস দেন শেখ হাসিনা। গুরুতর আহত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের অবস্থা দেখে এবং তাদের ওপর অমানবিক নির্যাতনের কথা শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তাকে অশ্রুসজল হতে দেখা যায়।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব মো. জাহাঙ্গীর আলম, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমান।
আরও উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য শেখ হেলাল উদ্দিন, মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. মাহবুব হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব মো. নাঈমুল ইসলাম খান।
পরে প্রধানমন্ত্রী সাম্প্রতিক সহিংসতায় আহতদের দেখতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন আহতদের খোঁজখবর নেন তিনি। এ সময় প্রধানমন্ত্রী আহতদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেন।
বিএসএমএমইউ উপাচার্য প্রফেসর ড. দীন মো. নুরুল হক ও হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার মো. জেনারেল ডা. মো. রেজাউর রহমান আহতদের চিকিৎসার জন্য নেওয়া ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে জানান।
কোটা আন্দোলনে জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীরা অনুপ্রবেশ করে : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীরা প্রাথমিকভাবে লো-প্রোফাইল বজায় রেখে কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের ছদ্মবেশে প্রবেশ করেছিল। কিন্তু পরে তারা বিপজ্জনকভাবে আন্দোলনের সামনের সারিতে চলে আসে।
গতকাল বাংলাদেশে নিযুক্ত স্পেনের রাষ্ট্রদূত গ্যাব্রিয়েল মারিয়া সিসতিয়াগা ওচহোয়া ডি চিনচিক্রু গণভবনে তার সঙ্গে সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব মো. নাঈমুল ইসলাম খান সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)।
শেখ হাসিনা বলেন, সন্ত্রাসীরা আসলে সেই স্থাপনাগুলোতে হামলা করেছে, যা জনগণের কল্যাণে কাজ করার পর সরকার যে সাফল্য অর্জন করেছে, তা তুলে ধরছে।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী কভিড হাসপাতাল, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে, সেতু ভবন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবন এবং ডেটা সেন্টারের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সব উন্নয়নের প্রতীক, যা জনগণকে স্বাচ্ছন্দ্য ও সুবিধা দিয়েছিল, সেগুলো ধ্বংসের শিকার হয়েছে।’ সেনা মোতায়েনের বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, সেনাবাহিনীর সদস্যরা এ পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ধৈর্য দেখিয়েছেন।
শেখ হাসিনা আরও বলেন, আওয়ামী লীগের প্রায় ২১ জন এ সহিংসতায় নিহত হয়েছেন। দলমত নির্বিশেষে নিহত বা আহত সবাইকে সাহায্য করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি তাদের সাহায্য করার সময় দলীয় পরিচয় বিবেচনা করিনি। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের দাবির বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, তারা আন্দোলনের গতির শীর্ষে থাকতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের স্থিতাবস্থার কারণে দেশে কোটার অস্তিত্ব ছিল না।
প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, সরকার মৃত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের বেঁচে থাকা ও জীবিকা নির্বাহের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং আহত ব্যক্তিদের আর্থিক সহায়তা ও তাদের বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করছে।
স্পেনের রাষ্ট্রদূত শান্তি ও সমৃদ্ধির স্বার্থে সেনা মোতায়েন এবং কারফিউ জারির প্রশংসা করে বলেন, এখন ধীরে ধীরে সবকিছুর উন্নতি হচ্ছে।
রাষ্ট্রদূত উল্লেখ করেন, শান্তি ও অগ্রগতি নিশ্চিত করতে যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা তিনি বোঝেন এবং এর প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, আমি টেলিভিশনে সবকিছু দেখেছি। কিন্তু ভাষার পার্থক্যের কারণে সেগুলো সঠিকভাবে বুঝতে পারিনি, তবে সংবাদপত্র থেকে আমি ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ এবং মারামারি থেকে ধ্বংসের বিষয় জানতে পেরেছি। রাষ্ট্রদূত জানান, তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের সঙ্গে কয়েকটি ভাঙচুরের স্থান পরিদর্শন করেছেন।
গ্যাব্রিয়েল মারিয়া সিসতিয়াগা ওচহোয়া ডি চিনচিক্রু বলেন, বাংলাদেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বাজেট বরাদ্দ জনগণের কল্যাণে সরকারের আন্তরিকতা নিশ্চিত করে। অনেক দেশে এ ধরনের বাজেট সমর্থন বিদ্যমান নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এ সময় অ্যাম্বাসাডর অ্যাট লার্জ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. তোফাজ্জেল হোসেন মিয়া এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাসুদ বিন মোমেন উপস্থিত ছিলেন।
