নির্বাচন জটিলতায় যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক খাত

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২৪, ১২:৫০ এএম

আমেরিকার মোট জাতীয় ঋণ প্রথমবারের মতো ৩৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। পাবলিক ব্যালান্স শিটে রোজকার প্রতিবেদন বিস্তারিত দাখিল করার সময় গত সোমবার (২৯ জুলাই) ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট আমেরিকার অর্থনীতির এই মাইলফলক রেকর্ড করেছে। এমন সময় এই সংবাদ এলো, যখন ওয়াশিংটন কর ও ব্যয়ের বিষয়ে আইন প্রণয়নের কঠিন লড়াইয়ে লিপ্ত। মার্কিনিদের আর্থিক পরিস্থিতি কতটা নাজুক, এই ঘটনাকে তার প্রতীক বলা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রে ঋণের পরিমাণ অনেক অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাসের চেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গৃহীত ফেডারেল প্রোগ্রামগুলোর খরচ প্রাথমিক পূর্বাভাস ছাড়িয়ে গেছে। নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে, ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে, অথচ প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা ঋণ কমানোর ধারণা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাচ্ছেন বলেও মনে হচ্ছে না। ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস এবং প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে. ট্রাম্প, দুজন প্রধান প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর একজনও নির্বাচনী প্রচারণায় জাতীয় ঘাটতি সম্পর্কে কথাবার্তা তেমন বলছেন না। বোঝা যায়, অর্থনৈতিক সমস্যাটি আমেরিকানদের বেশ ভোগাবে এবং আগামী বছরগুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

ঋণ ইস্যুতে রাজনৈতিক বিভাজন সবচেয়ে গভীর। এক দিকে থাকে কর কমানোর এবং ব্যয় বাড়ানোর চেষ্টা, অন্যদিকে কর বাড়িয়ে এবং ব্যয় কমিয়ে ঋণ কমানোর দ্বন্দ্ব। ক্ষমতায় যে-ই আসুক, এই দোদুল্যমানতা কাটাতে কেউ কাজ করে না। যদিও জাতীয় ঋণের সবচেয়ে বড় চালক সামাজিক নিরাপত্তা ও মেডিকেয়ারের মতো ফেডারেল প্রোগ্রাম মনে হয় না এ-নিয়ে কারও দ্বিমত আছে। ঋণ কমাতে হলো, এই দুটি ক্ষেত্রে কাটছাঁট করার বিকল্প নেই। কিন্তু এসব খাতে হাত দেওয়ার প্রস্তাব জনপ্রিয় হবে না, বরং ভোটারদের উল্টা বিমুখ করার সম্ভাবনা থাকে। আর্থিক সংকট মোকাবিলা করার প্রয়োজনীয়তা না বুঝলে আখেরে ক্ষতি ভোটার বা নাগরিকদেরই হবে, তা তারা বুঝতে চান না। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ‘অগ্রাধিকার নীতি’র মতবিরোধ এখন প্রকাশ্য। ফলে এমন অজনপ্রিয় কাজে তারা নাক গলাতে চাচ্ছে না তারা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, উভয় দলের যে পাল্টাপাল্টি মনোভাব, তা-ই এখন যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ কমানোর প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলেছে।

সন্দেহ নেই, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণের প্রধান উৎস ফেডারেল বাজেট ঘাটতি। বিশেষ করে যখন সরকারের ব্যয় রাজস্বের চেয়ে বেশি হয়। এছাড়া মুদ্রাস্ফীতি এবং কভিড-১৯’র মতো অপ্রত্যাশিত আর্থিক সংকটও এর জন্য দায়ী। বিভিন্ন সময়ের যুদ্ধ পরিচালনার ব্যয়ভারও ঋণের পরিমাণ বাড়িয়েছে। ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দাও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। গত মাসে কংগ্রেসনাল বাজেট অফিস বলেছে যে, এ-অবস্থা চলতে থাকলে ২০৩৪ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ৫৬ ট্রিলিয়ন ডলারের শীর্ষে পৌঁছাবে, কারণ ব্যয় ও সুদের খরচ রাজস্ব আয়কে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

মার্কিন সরকারের জন্য ঋণ পরিচালনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উচ্চ জাতীয় ঋণ অর্থনীতিতে বিভিন্ন প্রভাব ফেলে। সুদের হার বৃদ্ধি করতে হয়, যা বিনিয়োগ ও ভোক্তা খরচ কমিয়ে দেয়। বাজেট ঘাটতি বাড়ায় এবং সামাজিক সেবা ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় কমিয়ে দেয়। ঋণের বোঝা বাড়লে সরকারের নতুন প্রকল্প বা উন্নয়নমূলক কাজের জন্য অর্থ বরাদ্দ করাও কঠিন হয়ে যায়।

ইতিমধ্যে উচ্চসুদের হার যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ঋণের বোঝা পরিচালনা করা কঠিন করে তুলেছে। ‘এমপ্লয়ি রিটেনশন ট্যাক্স ক্রেডিট’র মতো মহামারীর সময়ের কতক ফেডারেল প্রোগ্রাম বাজেট বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি ব্যয়বহুল হয়েছে। বলা হয় জালিয়াতি এবং অপব্যবহারের কারণেই প্রোগ্রামটি এখন গলার কাঁটা। এ ছাড়া ২০২২ সালের ইনফ্লেশন রিডাকশন অ্যাক্টের মাধ্যমে প্রদত্ত ট্যাক্স ক্রেডিটগুলোর চাহিদাও প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হয়েছে, যা বার্ষিক ঘাটতি বাড়িয়ে দিয়েছে।

গত সোমবার দৈনিক প্রতিবেদন উল্লেখ করার সময় ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট বলেছে যে, তারা এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ২৩৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ পেয়েছে, যা তাদের প্রত্যাশার চেয়ে কম। তারা আশা করছে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৭৪০ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়া যাবে। ট্রেজারি সেক্রেটারি জ্যানেট এল. ইয়েলেন জুন মাসে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের বোঝা অর্থনীতির আকার বিবেচনায় যুক্তিযুক্ত রয়েছে এবং তিনি সুদের খরচ স্থিতিশীল রাখার দিকে মনোনিবেশ করেছেন। তবে বর্তমান মাইলফলক ঘোষণার পর তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। হোয়াইট হাউজ মন্তব্য করেছে, রিপাবলিকানরা ওয়াশিংটনে ক্ষমতায় এলে তারা জাতীয় ঋণকে আরও খারাপ করবে। বাইডেন প্রশাসন তাদের সাম্প্রতিক বাজেটে এক দশকে ৩ ট্রিলিয়ন ডলার ঘাটতি কমানোর প্রস্তাব করেছে। এই প্রস্তাবের মূলে আছে উচ্চআয়কারী এবং করপোরেশনগুলোর ওপর কর বৃদ্ধি।

বিবৃতিতে হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র জেরেমি এম. এডওয়ার্ডস বলেছেন, ‘কংগ্রেসনাল রিপাবলিকানরা আবারও ৫ ট্রিলিয়ন ডলার ট্রাম্পের ট্যাক্স কাটস দিয়ে ঋণ বাড়ানোর কথা ভাবছে। এই ঋণ কীভাবে পরিশোধ হবে? তখন কঠোর পরিশ্রমী পরিবারগুলো তাদের সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসাসেবা এবং ‘অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট কাটিং’র মাধ্যমে মূল্য চুকাতে বাধ্য হবে। সাধারণ পরিবারগুলোর ওপর যেন চাপ না পড়ে, তাই প্রেসিডেন্ট বাইডেন চলতি বাজেটে ৩ ট্রিলিয়ন ডলার ঘাটতি কমানোর প্রস্তাব করেছেন। বিলিয়নিয়ার এবং বৃহত্তম করপোরেশনগুলো তাদের ন্যায্য অংশ প্রদান করে এবং বিশেষ স্বার্থে ব্যয় কমিয়ে এই ঘাটতি পরিশোধের অর্থ জোগাবে।’ রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা অবশ্য এই প্রস্তাবে একমত হননি। টেক্সাসের প্রতিনিধি জোডি সি. আরিংটন, হাউজ বাজেট কমিটির রিপাবলিকান চেয়ারম্যান প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘আমাদের সেরা ভরসা হলো, আগামী বছর রিপাবলিকান নেতৃত্ব সময় শেষ হওয়ার আগেই আর্থিক দায়িত্ব পুনরুদ্ধার করবে।’

বাজেট অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০৩৪ সালে বার্ষিক সুদের খরচ ৮৯২ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১.৭ ট্রিলিয়ন ডলার হবে। তখন যুক্তরাষ্ট্র প্রায় মেডিকেয়ারের সমান পরিমাণ সুদের পেমেন্টে ব্যয় করবে। আগামী জানুয়ারিতে কংগ্রেসের আইনপ্রণেতাদের আবারও জাতীয় ঋণের সীমা বাড়ানোর একটি উপায় খুঁজে বের করতে হবে, গত বছর রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ব্যয়ের অগ্রাধিকার নীতি বিষয়ে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর যা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল। আগামী বছর কংগ্রেসকেও ২০১৭ সালে ট্রাম্পের প্রণীত ট্যাক্স কাটসের মেয়াদ শেষ হওয়া নিয়ে কী করা যাবে, তা আলোচনা করতে হবে। ট্রাম্প ট্যাক্স কাটস বাড়ানোর যে প্রস্তাবনা সামনে এনেছেন, বাজেট গ্রুপগুলো বলেছে যে, তাতে ১০ বছরে প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ হবে। ওদিকে ডেমোক্র্যাটরা চান, মধ্যবিত্তের জন্য উপকারী ট্যাক্স কাটগুলো সংরক্ষণ করতে এবং কোম্পানি ও ধনীদের ওপর কর বাড়াতে।

কমলা হ্যারিস এখনো তার অর্থনৈতিক পরিকল্পনা পুরোপুরি খোলাসা করেননি। তার নীতি অগ্রাধিকারগুলো বাইডেন প্রশাসনের থেকে কতটা আলাদা হবে, তা-ও স্পষ্ট নয়। ২০১৯ সালে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে তিনি করপোরেট ট্যাক্স হার ২১ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন, তবে তিনি মধ্যবিত্তের জন্য নতুন ট্যাক্স ক্রেডিট এবং শিক্ষকদের জন্য বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব করেছিলেন, যা এস্টেট ট্যাক্স বাড়ানোর মাধ্যমে প্রদান করা হবে।

এই মাসের রিপাবলিকান ন্যাশনাল কনভেনশনে রিপাবলিকানরা তাদের পার্টি প্ল্যাটফর্মে জাতীয় ঋণের কথা উল্লেখই করেননি। গত মেয়াদে ট্রাম্প পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, তিনি একসঙ্গে ট্যাক্স কমানোর সময় সব ঋণ কমিয়ে দেবেন। সে-সময় তার এই পদ্ধতি প্রথম মেয়াদে ব্যর্থ হয়েছিল। সে-সময় তিনি আমদানিতে উচ্চ ট্যারিফের মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছিলেন, কিন্তু সেগুলোও কাজে লাগে না। এবার সম্ভবত সেটাই ট্যাক্স কাটস সমন্বয় করতে ব্যবহার করা হবে। রিপাবলিকান এমপিরা ফেডারেল ব্যয় কমানোর প্রস্তাব দিয়েছেন এবং এই নীতি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হওয়ার দোষ দিয়েছেন ডেমোক্র্যাটদের।

‘রেসপন্সিবল ফেডারেল বাজেট’ নামের একটি অরাজনৈতিক কমিটি গত মাসে তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, ট্রাম্প তার দায়িত্বে থাকাকালে ৮.৪ ট্রিলিয়ন ডলার নতুন ঋণ অনুমোদন করেছেন। আর বাইডেন হোয়াইট হাউজে তার প্রথম তিন বছর এবং পাঁচ মাসে অনুমোদন করেছেন ৪.৩ ট্রিলিয়ন ডলার। বাজেট পর্যবেক্ষকরা অভিযোগ করেছেন, প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা জাতির ঋণ কমানোর এখনো পরিকল্পনা দেননি। আর্থিক সংযম প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান পিটার জি. পিটারসন ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী মাইকেল পিটারসন বলেছেন, ‘নির্বাচনের ১০০ দিনও বাকি নেই, এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেও আরও ১ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ যোগ করার পরিকল্পনা করছি, সমস্যাটি আমরা বুঝতে পারছি? আমরা তো সমস্যাটি অব্যাহতভাবে উপেক্ষা করতে পারি না।’

সরকারকে ঋণ পরিচালনার ক্ষেত্রে সঠিক কৌশল এবং স্থিতিশীল নীতি গ্রহণ করতে হবে।  খরচ কমানো, রাজস্ব বৃদ্ধি এবং নীতি সংস্কারে মনোযোগ দিতে হবে। জাতীয় ঋণ কমানোর জন্য আর্থিক দায়িত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। সমাধানও টেকসই হতে হবে। কেননা, মার্কিন ঋণ শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ আর্থিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে না, এটি বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলে। অন্য দেশগুলো মার্কিন ট্রেজারি সিকিউরিটিজ ক্রয় করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ পরিচালনার একটি মাধ্যম। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের মূল্য এবং বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারীদের আস্থাও এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে ভাষান্তর : মনযূরুল হক

লেখক: ওয়াশিংটনভিত্তিক অর্থনৈতিক নীতিবিষয়ক প্রতিবেদক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত