মাঝে মাঝে ভাবি, শুধু বই লেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকব, অন্য কিছু লিখব না। কিন্তু কেউ কেউ ফোন করে লিখতে অনুরোধ করেন, কারও কারও পোস্ট দেখে মতামত দিতে প্রলুব্ধ হই। তাই দায় এড়াতে পারি না। আর সারা জীবনই তো ন্যায়-অন্যায়বোধটা নিয়ে চলার চেষ্টা করেছি। অফিস থেকে এসে প্রতি সন্ধ্যায় বিবেককে জিজ্ঞেস করেছি, আজ কোথাও ভুল করেছি কিনা? সে দায়বোধও এড়াতে পারি না।
সরকারি চাকরিতে পদসোপান (hierarchy) খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভারত উপমহাদেশের সিভিল সার্ভিসে পদসোপান পদ্ধতি চালু হয় মার্কেন্টাইল সিভিল সার্ভিস আমলে ১৬৬৪ সালে। এ ধারাবাহিকতা কাগজে-কলমে এখনো চলমান, বাস্তবে নেই। কিছু অতি উচ্চাভিলাষী অফিসার সেটাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলছি, বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের চাকুরেদের অভিভাবক হলেন- ডিসি, বিভাগীয় কমিশনার, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব। এ ক্যাডারের চাকুরেদের অভাব-অভিযোগ শোনা, তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করা এবং তাদের সুরক্ষা দেওয়া উল্লিখিত অভিভাবকদের দায়। এ ক্যাডারের সদস্যরা রাজনৈতিক প্রভাবের অধীন যাওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু অনৈতিক উচ্চাভিলাষের মোহে কিছু অফিসার স্বেচ্ছায় রাজনৈতিক তোষামোদকে পুঁজি হিসেবে বেছে নেন। এটা ওই অফিসারদের দায়। রাজনীতিকদের একার দায় নয়। কারণ এ অফিসাররা নিজেরা সিন্ডিকেট গড়েছেন, রাজনীতিকদের কাছে গেছেন, তাদের প্রলুব্ধ করেছেন, বিনিময়ে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও বড় বড় পদ লাভ করেছেন, এতে অনেক মেধাবী, দক্ষ ও যোগ্য অফিসার বঞ্চিত ও অপমানিত হয়েছেন।
আমাকে কয়েকজন ফোন করে অনুরোধ করেছেন, এ সমস্যার সমাধান কীভাবে হতে পারে; আমার অভিমত আমার অভিমত সর্বজনগ্রাহ্য হতে হবে, এটা আমি মনে করি না। কারণ সামাজিক বিজ্ঞানে ভিন্ন মত অনিবার্য। কারণ-
১. যেসব মেধাবী ও যোগ্য অফিসার বঞ্চিত হয়েছেন, সিনিয়রিটি লিস্ট/মেধা তালিকা দেখে, নিজ উদ্যোগে তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করা উচিত। কারণ বঞ্চিতদের কেউ কেউ আবেদন করে পদোন্নতি চাইতে অপমানিত বোধ করবেন। যাদের এমন আত্মমর্যাদা বোধ রয়েছে, তাদের আমি স্যালুট জানাই। তাদের দরখাস্ত কেন দিতে হবে! জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংরক্ষিত তালিকা ও রেকর্ড দেখে সেটা করা সরকারের দায়। জনপ্রশাসনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা না গেলে অন্তবর্তী সরকারের পক্ষে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করা অসম্ভব হবে।
২. অন্তর্বর্তী সরকারকে যৌক্তিক সময় দিতে ও নিতে হবে। নিচের কাজগুলো করে না গেলে আবার আগের অবস্থা তৈরি হবে। যেমন মৌলিক জাতীয় ইস্যুগুলোকে সমন্বিত করে একটি রাজনৈতিক দলিল তৈরি করা, এটা ভবিষ্যতে মেনে চলা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক করা। এতে জাতিসংঘ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নকেও অংশীদার করা যেতে পারে। এতে এমন বিধান রাখা যেতে পারে যে, কোনো সরকার এগুলোর ব্যত্যয় ঘটালে তারা মধ্যস্থতা করতে পারবে। হয়তো কেউ প্রশ্ন করবেন, এতে আমাদের ইজ্জত যাবে। আমি মনে করি, এতে ইজ্জত বাড়বে ও জীবন বাঁচবে। এমন বিধান না রাখলে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে বাগে আনা যাবে না। যে দলই ক্ষমতায় আসুক, তারা এটা ছুড়ে ফেলে দেবে এবং স্বেচ্ছাচারিতা করবে, ১০-১৫ বছর পরে আবার জীবন যাবে এবং আমাদের হানাহানি দেখে বিশ্ববাসী হতবাক হবে। তখন আমরা জাতি হিসেবে ছোট হবো। তারচেয়ে মাথার ওপর জাতিসংঘ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের জুজুর ভয় থাকলে রাজনৈতিক দলগুলো এবং সরকার সংযত আচরণ করতে বাধ্য হবে।
আমরা চাই, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা পরস্পরকে সম্মান করুন। খালেদা জিয়াকে যেভাবে কষ্ট দেওয়া হয়েছে, এটা কোনো ন্যায়-অন্যায়বোধ সম্পন্ন মানুষ করতে পারে না। এতদিন বলা হয়েছে, আইনে সুযোগ নেই। আইনে সুযোগ ছিল, এটা এখন প্রমাণিত। উচ্চ আদালত আমাদের শেষ আশ্রয়স্থল। আমি সবসময় উচ্চ আদালতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এখনো শ্রদ্ধা বজায় রেখেই বলছি, যারা খালেদা জিয়ার সাজা বাড়িয়েছেন, একটা ঠুনকো মামলায়, তাকে জামিন দেননি, তারা আল্লাহর কাছে জবাব দিতে পারবেন তো? এটা অভিযোগ নয়, এটা বিনম্র অনুসন্ধিৎসা! সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অপমানজনকভাবে দেশত্যাগের ঘটনাতেও জাতি হিসেবে আমরা ছোট হয়েছি। আমাদের রাজনীতিকরা আমাদের আর কত ছোট করবেন, কষ্ট দেবেন! তারা তো আমাদের অভিভাবক। আমরা চাই, এমন বিধান তৈরি ও বাধ্যতামূলক করা হোক, যাতে তারা এবং আমরা সবাই ভালো থাকতে পারি।
৩. বিদ্যমান সংবিধান বাতিল করে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা অথবা সংবিধানের ব্যাপক সংশোধন করা খুবই প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলোর অগ্রাধিকার দ্রুত ক্ষমতায় যাওয়া। আমাদের অগ্রাধিকার, আমাদের সন্তানের জন্য একটা নিরাপদ রাষ্ট্র কাঠামো গঠন। আমাদের কোনো সন্তানের পরিণতি আবু সাঈদের মতো না হোক।
শেষ কথা : আমি প্রশাসন ক্যাডারের সদস্য হিসেবে ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচন দেখেছি। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ইউএনও হিসেবে, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে এডিসি জেনারেল হিসেবে এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। অভিজ্ঞতা থেকে দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি, বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক সরকারের অধীনেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। এমনকি জর্জ ওয়াশিংটন, নেলসন ম্যান্ডেলার মতো মানুষদের কবর থেকে তুলে এনে নির্বাচন কমিশন গঠন করলেও সম্ভব নয়। কাজেই সবার ভাবা দরকার, কীভাবে স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি করা যায়। আরেকটা কথা, আমাদের মতো দেশে, রাষ্ট্র চালানো সবচেয়ে কঠিন কাজ। ২ জন ছাত্রের উপদেষ্টা (মন্ত্রী) হওয়াতে অনেকেই নানারকম কথা বলছেন। তাদের বলতে চাইছি-
উদাহরণ ০১ : ১৭৭০ এবং ১৭৮০-এর দশক। বিশাল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে ব্রিটেন ছাড়াও রয়েছে ২৩টি কলোনি। তন্মধ্যে ১৭৭৫ সালের ১৯ এপ্রিল শুরু হয় আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ। ১৭৮১ সালে আমেরিকার ১৩টি কলোনি ব্রিটেনের হাত ছাড়া হয়। এমন পরাজয় ও ব্যর্থতার অনুতাপে রাজা তৃতীয় জর্জ অন্ধ ও পাগল হয়ে যান। ১৭৮৩ সাল। তারিখ ১৯ ডিসেম্বর। ওই দিন বিশাল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন এক যুবক। তার নাম William Pitt. ওই তারিখে তার বয়স ছিল ২৪ বছর ৬ মাস ২৫ দিন। তিনি ১৮ বছর ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আজও তিনি পুরো পৃথিবীর সেরা প্রধানমন্ত্রীদের একজন হিসেবে স্বীকৃত।
ইতিহাসে লেখা রয়েছে ‘রাজা তৃতীয় জর্জের শাসনকাল (১৭৬০ থেকে ১৮২০) ছিল ব্রিটেনের জন্য সোনালি সময়। তখন ব্রিটেন উইলিয়াম পিটের মতো একজন দক্ষ প্রধানমন্ত্রী পায়।’ উল্লেখ্য, তখনো প্রধানমন্ত্রী এখনকার মতোই সরকারপ্রধান ছিলেন।
উদাহরণ ০২ : অস্ট্রিয়ার সরকারপ্রধানের পদবি চ্যান্সেলর। ২০১৭ সাল। তারিখ ১৮ ডিসেম্বর। ওই তারিখে অস্ট্রিয়া একজন নতুন চ্যান্সেলর পেল। তার নাম Sebastian Kurz. তার বয়স ৩১ বছর ৩ মাস ২১ দিন।
উদাহরণ-০৩ : ২০০৭ সাল, ১৬ নভেম্বর। ওই তারিখে পোল্যান্ড একজন উপ-প্রধানমন্ত্রী/অর্থমন্ত্রী পায়। তার নাম Waldemar Pawlak. তখন তার বয়স ২৮ বছর ২ বছর ১১ দিন। তিনি ১৯৯৩ সালের ২৬ অক্টোবর দেশটির প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হন। তখন তার বয়স ৩৪ বছর ১ মাস ২১ দিন।
উদাহরণ-০৪ : ২০১৯ সাল। তারিখ ১৬ ডিসেম্বর। ওইদিন ফিনল্যান্ড একজন নতুন প্রধানমন্ত্রী পায়। তিনি একজন নারী। ওই তারিখে তার বয়স ৩৪ বছর ২৪ দিন।
উদাহরণ-০৫ : ১৯৭২ সাল। তখন এ দেশের মানুষের ভালোবাসায় হিমালয় পাহাড়ে পরিণত হওয়া এক মানবসন্তান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি তখন অবিসংবাদিত নেতা ও জাতির পিতা। তিনি একজন রাজনৈতিক সচিব নিয়োগ দেন। তার নাম তোফায়েল আহমেদ। তখন তার বয়স ২৮+। এ পদটি এর আগে আলোচিত পদগুলোর তুলনায় অনেক ছোট। তা সত্ত্বেও এ দেশের মানুষ এ নিয়োগ নিয়ে সমালোচনা করত। সমালোচনা করার দুটি কারণ : ১. আমরা তরুণদের সহজে গ্রহণ করতে পারি না। আমি গ্রামে-গঞ্জে নিরক্ষর মানুষকে বলতে শুনেছি, ‘শেখ সাব এটা কী করল! এত কম বয়সী একটা পোলাকে এত বড় পদে বসাইলো!’ তবে মানুষ হয়তো এভাব বলত না, যদি ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী দেশ পরিচালিত হতো। কিন্তু তখন ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত ভুল-ত্রুটির পরিমাণ অনেক বেশি ছিল। তাই মানুষ সনাতনী ধারণা থেকে বের হতে পারেনি। ভুল-ভ্রান্তিগুলো না হলে মানুষের মনে আস্থা তৈরি হতো। ওইসব ভুল-ভ্রান্তির জন্য তোফায়েল আহমেদ কতটুকু দায়ী আমি জানি না, তবে অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ তার দিকে আঙুল তোলে। আমি ২০২০ সালে আমার লেখা একটি বইতে এসব বিষয়ে আলোকপাত করেছিলাম। বইয়ের কপি জনাব সিরাজুল আলম খান এবং তোফায়েল আহমেদের কাছে পাঠিয়েছিলাম। তাদের বিষয়গুলো স্পষ্ট করার জন্য বইতেই অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু তারা মুখ খোলেননি।
উদাহরণ-০৬ : ইবনুন নাফিস (জীবনকাল ১২০৮-১২৮৮) একজন চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও ধার্মিক মানুষ ছিলেন। ১২৮৮ সালে তিনি অসুস্থ হন। তখন তার বয়স ৮০ বছর। চিকিৎসকরা তাকে সুস্থ করে তোলার জন্য একটি মদ মিশ্রিত ওষুধ আবিষ্কার করেন। চিকিৎসকরা তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন, এ ওষুধ খেলে তিনি সুস্থ হয়ে যাবেন। কিন্তু মদ মুসলমানদের জন্য হারাম। তাই তিনি ওই ওষুধ না খেয়ে মৃত্যুর পথকেই বেছে নেন।
উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম এবং আসিফ মাহমুদ ভূঁইয়ার বয়স কোনো সমস্যা নয়। বিবেচ্য বিষয় হলো তাদের কর্ম। তারা যদি সততাকে, বিনয়মিশ্রিত দৃঢ়তাকে, দুর্নীতিমুক্ত জীবনকে ও ন্যায়পরায়ণতাকে আঁকড়ে ধরতে পারেন, তাহলে তারা জয়ী হবেন, আমরাও বেঁচে যাব। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন, আমাদের সবাইকে হেদায়েত ও হেফাজত করুন।
লেখক: সাবেক সচিব, লেখক ও গবেষক