ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত

সরকারি সেবার পরিসর বাড়ান

আপডেট : ২৯ জুন ২০২৬, ১২:৩৭ এএম

অর্থনৈতিক বিকাশের পাশাপাশি নতুন উদ্যোগ ও উদ্যোক্তা সৃষ্টিসহ লাগাতার  প্রযুক্তি উদ্ভাবন, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ, জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং সামগ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেও শ্রমঘন এ খাতটির  ভূমিকা  অপরিসীম। কিন্তু ২৮ জুন ‘বেশিরভাগ উদ্যোক্তাই সরকারি সেবার বাইরে’ শিরোনামে দেশ রূপান্তরের প্রচ্ছদ প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে তাতে দেখা যাচ্ছে, সিংহভাগ উদ্যোক্তা সেবার বাইরে থাকায় সম্ভাবনাময় খাতটির অর্থনীতিতে আরও ব্যাপক অবদান রাখার পথ কণ্টকাকীর্ণ হয়ে আছে। ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও দেশ রূপান্তরে সাক্ষাৎকারে অকপটে স্বীকার করেছেন, অর্থনীতিতে খাতটির ভূমিকার কথা। তা অস্বীকার করেননি শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরও। এই প্রেক্ষাপটে সংগতই প্রশ্ন জাগে তারপরও কেন এ খাতের উদ্যোক্তারা গুরুত্বের বাইরে থেকে যাচ্ছেন?

ইংরেজ কবি জুলিয়া কার্নের বিখ্যাত কবিতা ‘লিটল  ড্রপস  অব  ওয়াটার’-এর  জনপ্রিয় কবিতার একটি পঙ্ক্তির বাংলা ‘বিন্দু বিন্দু জল গড়ে তোলে মহাদেশ ও সাগর অতল’ অনুবাদটি আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প হিসেবে পরিচিত শিল্পগুলোর আভিধানিক অর্থে মর্মার্থ ছোট হলেও এগুলোর ভূমিকা যে ব্যাপক এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নতুন করে নিষ্প্রয়োজন। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘এসএমই খাত দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার পাশাপাশি শ্রম খাতে ৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। সরকারের পরিসংখ্যান অনুসারে, দেশের ১ কোটি ১৭ লাখের বেশি সিএমএসএমই উদ্যোক্তার ৭০ শতাংশই ঢাকার বাইরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন। এ খাতে উদ্যোক্তাদের নীতিসহায়তা দেয় এসএমই ফাউন্ডেশন। তবে ঢাকার বাইরে সংস্থাটির কোনো কার্যালয় না থাকায় বেশিরভাগ উদ্যোক্তাই থাকছেন সরকারি এ সেবার বাইরে।’ আরও উল্লেখ্য, জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশ জোগান দেয় খাতটি।

এ খাতের বেশিরভাগ উদ্যোক্তা সরকারের নীতিসহায়তার অভাবে টেকসই হতে পারছেন না। প্রতিনিয়তই ব্যবসায় তাদের লোকসান হচ্ছে। তারা ঋণের জালে আবদ্ধ হচ্ছেন। এক তথ্যে প্রকাশ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ আদায়ে সাফল্যের হার প্রায় ৯৯ শতাংশ। অথচ বড় খেলাপিদের তুলনায় তাদের ঋণ পেতে বেশি ঝামেলা পোহাতে হয়। ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া ঋণ সুবিধা পেতে তাদের পোহাতে হয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও। তবে তাদের জন্য খানিক আশার আলো জ্বালিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এ  খাতের উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন-সংকট দূর করতে অর্থমন্ত্রী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ২ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন ঋণ তহবিল ঘোষণা করেছেন। এ তহবিল থেকে এসএমই উদ্যোক্তারা সহজ শর্তে ঋণ পাবেন। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, সরকারের সিদ্ধান্ত ও ঘোষণার পরও অনেক ক্ষেত্রেই তা বাস্তবায়নের পথ মসৃণ হয়নি। আমরা আশা করব এমনটির পুনরাবৃত্তি ঘটবে না।

আমরা মনে করি, অতিক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের আলাদা কোটা নির্ধারণ করে দেওয়া খুব জরুরি। তা না হলে এই ঋণের সুবিধা সাধারণ উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছাবে না, বিষয়টি হয়ে থাকবে কেবল তেলে মাথায় তেল দেওয়ার মতোই। আমরা আরও মনে করি, সহজ অর্থায়নই কেবল এর ভবিষ্যৎ সুগম করতে পারে। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, তরুণ ও নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে এমএসএমই খাত সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। ভবিষ্যতে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার প্রয়োজনে এ খাতের দিকে বিশেষ নজর দেওয়ার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে এও আমলে রাখতে হবে, বিদ্যমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় শুধু অর্থায়নই যথেষ্ট  নয়, দরকার টেকসই ব্যবসা পরিচালনায় সহায়তাও। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে উদ্যোক্তাদের নগদ প্রবাহ ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল রূপান্তর, ব্যবসায়িক দক্ষতা উন্নয়ন এবং বাজার সংযোগে সহযোগিতা করা সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনার ক্ষেত্র এসএমই খাত নিয়ে নতুন কর্মপরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়ন সময়ের দাবি। তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের প্রসার ঘটানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি যথার্থই বলে গেছেন, ‘একটি সমাজের প্রবৃদ্ধি এবং সুষ্ঠু শিল্পায়নের ক্ষেত্রে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্রশিল্পের কোনো বিকল্প নেই; এটি সমাজের একেবারে তৃণমূল স্তরে অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ঘটায়।’ আমাদের বাস্তবতায় তা আরও বেশি সত্য তা নীতিনির্ধারকদের আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত