কাঠমান্ডু পোস্টের বিশ্লেষণ

ভারতের ভ্রান্ত পররাষ্ট্রনীতি

  • ভারতের ‘ব্যবহারবাদী’ পররাষ্ট্রনীতি শেখ হাসিনার স্বৈরাচারীতা উৎসাহিত করেছে 
  • আওয়ামী লীগ ভারতের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থে কাজ করেছে বলছে কাঠমান্ডু পোস্ট
আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২৪, ০৪:০৬ পিএম

বাংলাদেশের চলমান পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক ঘটনার নাটকীয় মোড় বিশ্বের অনেক মানুষকে হতবাক করলেও নেপালিদের কাছে গল্পটা খুব পরিচিত।

নেপালের সাবেক রাজাসহ নেপালি রাজনৈতিক নেতারা পদচ্যুত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেকে আলাদা কেউ নন। এরা সকলেই গণতন্ত্র ও স্বৈরাচার এবং সুশাসন ও দুঃশাসনের মধ্যকার রেখাকে হালকা করে দিয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ভারতের ভূমিকা এবং তার পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে যে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে তা আরও বেশি মনযোগ আকর্ষণের দাবি রাখে। নেপালের প্রভাবশালী গণমাধ্যম দ্য কাঠমান্ডু পোস্টের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এসব তথ্য।

বিশ্লেষণে বলা হয়, ভারতের "ব্যবহারবাদী" পররাষ্ট্রনীতি অনেকাংশে শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী প্রবণতাকে উৎসাহিত করার জন্য দায়ী। বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের যে গণতান্ত্রিক দাবি ছিল এবং তারা যে আকাক্সক্ষার প্রতি প্রবল ইচ্ছা পোষণ করছিল তা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি। 

বাংলাদেশের অবস্থান এবং কৌশলগত গুরুত্বের কারণে ভারতের একাধিক উদ্বেগ ও নিরাপত্তার বাধ্যবাধকতা ছিল। যার সুযোগে শেখ হাসিনা হয়ে ওঠেন ভারতের বিশ্বস্ত মিত্র।

ভারতের সাথে তার ঐতিহাসিক এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করা তার পক্ষে সহজ ছিল। হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের প্রতি ভারতের সমর্থন যৌক্তিক বলে মনে হচ্ছে, কারণ তার দল আওয়ামী লীগ ভারতের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য কাজ করেছে।

দ্য কাঠমান্ডু পোস্টের বিশ্লেষণে বলা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে, বাংলাদেশিরা বুঝতে পেরেছিল যে ভারত প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের পক্ষে ছিল। ভারত বিরোধী দলগুলোকে নানাভাবে বুঝিয়েও আওয়ামী সরকার তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারেনি। বাংলাদেশের বৃহত্তর নাগরিক সমাজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নির্বাচন বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করেছে ভারত। ফলে নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল খুবই কম এবং ব্যাপক অনিয়মের খবর পাওয়া গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মতো পশ্চিমা দেশগুলি নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও ভারত এই জাল নির্বাচনের ফলাফলের বৈধতা দেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। এভাবে হাসিনার অন্যায় এবং জোরপূর্বক ক্ষমতায় পিষ্ঠ হওয়াকে সমর্থন করার কারণে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ভারত বিরোধীতা প্রবল আকার ধারণ করেছে। 

বিশ্লেষণে বলা হয়, গত এক দশক ধরে ভারতের পররাষ্ট্র নীতি বাস্তববাদ এবং নমনীয়তার পরিপ্রেক্ষিতে নিজেকে পুনর্গঠন করার চেষ্টা করেছে। তবে এক্ষেত্রেও তারা শুধুমাত্র ভারতের কৌশলগত স্বার্থে প্রাধান্য দিচ্ছে।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর তার বই, দ্য ইন্ডিয়া ওয়ে-তে ‘কৃষ্ণের পছন্দ’ ধারণাটিকে সমান্তরাল বলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। এর অর্থ হল সামষ্টিক ধার্মিকতার পরিবর্তে  ধর্মকে স্বার্থসিদ্ধ হিসেবে ব্যবহার করা। এই ধরণের পররাষ্ট্রনীতি দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত বিরোধীতাকে ক্রমান্বয়ে উস্কে দিচ্ছে।

জয়শঙ্করের দর্শন অনুসারে ভারতের জনপ্রিয় হওয়ার প্রয়োজন নেই, তারা কেবল তাদের স্বার্থ সুরক্ষিত করতে চায়। তবে এসব চিন্তাধারার বিপক্ষে দক্ষিণ এশিয়াতে ভারত বিরোধীতা প্রকট হচ্ছে। এক্ষেত্রে যদি ভারত দক্ষিণ এশিয়া এবং তার বাইরে একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নেতৃত্বের দাবি করতে চায়। বৈশ্বিকভাবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতে চায় বা এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চায় তাহলে ভারতকে অবশ্যই তাদের পররাষ্ট্রনীতির স্তম্ভ হিসেবে গণতন্ত্রকে গ্রহণ করতে হবে।

বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রতিবেশী দেশগুলোর বৃহত্তর স্বার্থ বিশেষ করে গণতন্ত্র এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। গণতন্ত্রের সাথে সারিবদ্ধ না হয়ে, এর বিদেশ নীতিতে "ব্যবহারবাদ" শুধুমাত্র স্বল্পমেয়াদী কৌশলগত লাভ দিতে পারে যা দ্রুত উল্টে যেতে পারে। অন্যদিকে, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে প্রাধান্য দেওয়া এবং সরকারের চেয়ে জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া একটি দীর্ঘমেয়াদী বিবর্তনীয় স্থিতিশীল কৌশল হয়ে উঠতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত