আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক কুমার ঘটকের পৈতৃক ভিটায় রাজশাহী হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। এই ভিটার কিছু অংশ সংরক্ষিত ছিল কলেজের ভেতরেই। কিন্তু শেষ চিহ্নটুকু নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল।
ঋত্বিক ঘটকের আদি ভিটা বহু বছর ধরেই ধ্বংস করার চেষ্টা হয়ে আসছিল। সর্বশেষ ২০১৯ সালে তার এই স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটার একাংশকে সাইকেল গ্যারেজ বানিয়েছিল হোমিও কলেজ কর্তৃপক্ষ। ওই সময় নানা পক্ষের বাধা-প্রতিবাদের মুখে রক্ষা হয়েছিল। এবার ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর কিছু দুর্বৃত্ত কোনো এক ফাঁকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে ঋত্বিক ঘটকের আদি নিবাসের শেষ চিহ্নটুকু।
বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি ঋত্বিক কুমার ঘটকের রাজশাহী মহানগরীর মিঞাপাড়ার বাড়িতে শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্যের একটি অংশ কেটেছে। এ বাড়িতে কিছু সময় বসবাস করেছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক মহাশে^তা দেবীও। এ বাড়িতে থাকার সময়ই ঋত্বিক ঘটক রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল ও রাজশাহী কলেজে পড়েছেন। তিনি রাজশাহী কলেজ এবং মিঞাপাড়ার সাধারণ গ্রন্থাগার মাঠে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে নাট্যচর্চা করেছেন। ঋত্বিক ঘটক ওই সময় রাজশাহীতে ‘অভিধারা’ পত্রিকা সম্পাদন করেছেন। বিলুপ্ত কল্পনা হলের ‘ভাবীকাল’ নামে একটি চলচ্চিত্রের ব্যানারও এঁকেছেন।
বিগত এরশাদ সরকারের আমলে ১৯৮৯ সালে নামমাত্র মূল্যে ঋত্বিক ঘটকের বাড়িটি রাজশাহী হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজকে ইজারা দেওয়া হয়। তারাই এখন সম্পূর্ণ বাড়িটি ব্যবহার করছে। বাড়িটির এক অংশে ইতিমধ্যে বহুতল ভবন করছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। আরেক অংশে যেসব কক্ষে ঋত্বিকরা থাকতেন সেসব কক্ষও ব্যবহার করছে কলেজ কর্তৃপক্ষ।
২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে তারই এক অংশ ভেঙে অস্থায়ী সাইকেল গ্যারেজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। ওই সময় রাজশাহীর সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও চলচ্চিত্রপ্রেমী সংগঠনের নেতারা অতি দ্রুত পৈতৃক ভিটা সংরক্ষণ করে হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। কালজয়ী চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটকের পৈতৃক বাড়ির দেয়ালটুকু রাতের আঁধারে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাজশাহী নগরীর মিয়াপাড়ায় অবস্থিত রাজশাহী হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালসংলগ্ন ওই বাড়ির কোনো চিহ্নই নেই। পুরো এলাকা জুড়ে পুরনো ইটের স্তূপ পড়ে আছে। শ্রমিকরা একতলা ভবনের ওই ইট এক জায়গায় জড়ো করছেন।
এ ব্যাপারে হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যক্ষের কাছে জানতে চাইলে তারা জানেন না বলে জানান। এতে চলচ্চিত্রকর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পাশে থাকা হোমিওপ্যাথিক কলেজের একটা কাচও ভাঙেনি। অথচ ঋত্বিক ঘটকের বাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা জেলা প্রশাসক থেকে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ সময় চলচ্চিত্রকর্মী ও সাংবাদিকদের সঙ্গে কলেজ কর্তৃপক্ষের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের সভাপতি অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ বকুল ফেসবুকে স্টাটাস দিয়ে লিখেছেন, ঋত্বিক ঘটকের রাজশাহীতে থাকা পৈতৃক বাড়িটা আমরা আর রক্ষা করতে পারলাম না। বিগত সরকারের মন্ত্রী-এমপি-ডিসি-মেয়রদের কাছে দীর্ঘদিন নানা চেষ্টা-তদবির করলেও বাড়িটি রক্ষায় তারা কার্যকর কোনো ব্যবস্থাই নেননি।
এদিকে এ ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে প্রকৃত দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে ‘ইয়ুথ অ্যাকশন ফর সোশ্যাল চেঞ্জ (ইয়্যাস) নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক শামীম আহম্মেদ ও বিভাগীয় কমিশনার ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীরকে স্মারকলিপি প্রদান করে এ দাবি জানানো হয়েছে।
ঐতিহাসিক এ স্থাপনা ভেঙে ফেলার ঘটনায় চলচ্চিত্রকর্মীরা জেলা প্রশাসক শামীম আহমেদকে অভিযোগ দিলে তিনি তদন্তের জন্য এক সপ্তাহের সময় নিয়েছেন। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (শিক্ষা ও আইসিটি) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তদন্তে।
এদিকে এ বাড়ি কারা ভেঙেছে তা তদন্ত করে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসক শামীম আহমেদ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) কল্যাণ চৌধুরীকে দায়িত্ব দিয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার কলেজ গভর্নিং বডির সভাপতি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মহিনুল হাসান প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করেছেন।
