পদে পদে বরাদ্দের শর্ত ভঙ্গ

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২৪, ০৭:০১ এএম

দীর্ঘদিন পরিষ্কার না হওয়ায় ঝোপঝাড়ে ঢাকা পড়েছে সড়ক বিভাজক। আগাছা বিভাজক ছাপিয়ে চলে এসেছে সড়কে। দুই পাশে নেই কোনো রোলিং। নেই কোনো ট্রাফিক সাইনও। পুরোপুরি অরক্ষিত বিভাজকে দাঁড়িয়ে আছে বড় বড় বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ড। খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) মজিদ সরণির সড়ক বিভাজকের চিত্র এমনই।

এভাবেই মহানগরীর যশোর রোডের ডাকবাংলো থেকে শিববাড়ী, জলিল সরণি রোডের বয়রা কলেজ মোড় থেকে বয়রা বাজার, রূপসা মোড় থেকে রূপসা বাস টার্মিনাল, কেডিএ অ্যাভিনিউ সড়কের রয়্যাল মোড় থেকে শিববাড়ী, এমএ বারিক সড়কের গল্লামারী থেকে সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনাল, জব্বার সরণি সড়কের মিনা বাজার থেকে পুরনো রেলস্টেশন, যশোর রোডের শিববাড়ী থেকে জোড়াগেট বিভাজকের একই দশা। সৌন্দর্যবর্ধনের নামে শুধুই চলছে বাণিজ্য।

বরাদ্দপত্রের শর্তে উল্লেখ রয়েছে, ডিভাইডারের প্রবেশমুখে প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দ্বারের প্রশস্ততা হবে সর্বোচ্চ ৩ ফুট ৬ ইঞ্চি। রাতের বেলায় ডিভাইডারের অবস্থান সহজে বোঝার জন্য দুই পাশে রিফলেক্টিং বোর্ড লাগাতে হবে। রাতের বেলায় গাড়ির লাইটে স্পিডব্রেকার দৃশ্যমান করতে ক্যাটস আই স্থাপন করতে হবে। পথচারী পারাপারে জেব্রা-ক্রসিং তৈরি করতে হবে। ডিভাইডারের দুই পাশে ৩ ধাপবিশিষ্ট জিআই তার বা রোলিং স্থাপন ও রঙ করতে হবে। ডিভাইডারের ভেতরে স্থায়ী বিভিন্ন গাছের পাশাপাশি নির্দিষ্ট স্থানে বছরজুড়ে মৌসুমি ফুল গাছ লাগাতে হবে। ডিভাইডারে ও ফুটপাতে দুটি মেগাসাইনের মধ্যে দূরত্ব রাখতে হবে কমপক্ষে ৩০ মিটার। বরাদ্দ আদেশ হস্তান্তরযোগ্য নয়, হস্তান্তর করলে কর্তৃপক্ষ বরাদ্দ আদেশ বাতিল করা যাবে। এ ছাড়া ধার্যকৃত বিজ্ঞাপন কর নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করতে হবে।

সিটি করপোরেশনের বকেয়া নথির তথ্য অনুয়ায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত সিটি করপোরেশন অধিক্ষেত্রে ৩৫২টি প্রতিষ্ঠানকে সড়ক ও বিভাজকে বিজ্ঞাপন প্রদর্শন ও সৌন্দর্যবর্ধনে বরাদ্দ দেওয়া হয়। ৩৫২টি বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠানের কাছে করপোরেশনের বকেয়া পাওনা সাড়ে ১৯ কোটি টাকা। বিলবোর্ড ও সড়ক বিভাজকে বিজ্ঞাপন প্রদর্শন করেও গত ১০ বছরে তারা এই কর পরিশোধ করেনি। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান টাকা বকেয়া রেখে চলে গেছে। কাজের মেয়াদও নবায়ন করেনি।

তবে বকেয়ার তালিকায় মোটা অঙ্কের টাকা বকেয়া তারপরও নবায়ন হয়েছে বন্ধু মিডিয়া, ভিউ ফাইন্ডার, পোলাইট অ্যাড ও অ্যাড ফ্রেম। তাদের কাজের মেয়াদ বেড়েছে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত। বন্ধু মিডিয়ার কাছে ১ কোটি ১৯ লাখ, ভিউ ফাইন্ডারের কাছে ৩ কোটি ২৫ লাখ, পোলাইট অ্যাডের কাছে পাওনা ১ কোটি ৩১ লাখ ও অ্যাড ফ্রেমের কাছে পাওনা ১ কোটি ৪৬ লাখ টাকা বকেয়া আছে। মোটা অঙ্কের এই রাজস্ব বকেয়া থাকার পরও চার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে উল্টো তাদের কাজের মেয়াদ বৃদ্ধি করেছেন।

করপোরেশনের কয়েকজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, বকেয়ার তালিকায় বন্ধু মিডিয়া, ভিউ ফাইন্ডার, পোলাইট অ্যাড ও অ্যাড ফ্রেমের নাম রয়েছে। ১০ বছর ধরে তারাও কর পরিশোধ করে না। সেই হিসাবে তাদের কাজের মেয়াদ বাড়ার কথা না। কিন্তু করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে দুর্নীতির মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বিভাজক চারটি প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ ও মেয়াদ বৃদ্ধি করেছেন।

তারা আরও জানান, মধ্যস্বত্ব ব্যবসায়ীরা সড়ক বিভাজক সৌন্দর্যবর্ধন ও বিলবোর্ডে বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের জন্য বরাদ্দ নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দেন। এরপর মধ্যস্বত্ব ব্যবসায়ীরা ভাড়া ঠিকঠাক আদায় করলেও করপোরেশনের রাজস্ব পরিশোধ করেনি। বছরের পর বছর বিপুল পরিমাণ কর বকেয়া রেখে একসময় তারা নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। কিন্তু কর আদায়ে তেমন তৎপরতা নেই।

কর্মকর্তারা বলেন, সোনাডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড থেকে শিববাড়ী সড়কে রিজেন্স অ্যাড ৮ লাখ টাকা এবং সোনাডাঙ্গা থেকে বয়রা বাজার সড়কে ফরনেক্স ১৬ লাখ টাকা বকেয়া রেখে চলে যায়। প্রতিষ্ঠান দুটি অনেক ইউনিপোল ও বিলবোর্ড রেখে যায়। পরে পরিত্যক্ত বিলবোর্ড ও ইউনিপোল দখল করে অন্যত্র ভাড়া দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু করপোরেশনে এ টাকা জমা হয় না। শুধু এ দুটিই নয়, এমন নজির বহু রয়েছে। করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এর সঙ্গে জড়িত বলে তারা দাবি করেন।

এ ব্যাপরে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিভাজক বাণিজ্যিক জায়গা না। সড়ক বিভাজক ও বিলবোর্ড বরাদ্দে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে অর্থ বাণিজ্য হয়। এ ছাড়া বরাদ্দের পর বিভাজকে চলে নির্যাতনও। সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য করপোরেশনের প্রকল্প রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় আদর্শ শহর বা শহর সুন্দর করতে হবে। কোনো বরাদ্দ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত