বই পোড়ানোর মনস্তত্ত্ব কারণ ফলাফল

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৪, ১২:০৫ এএম

সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘মুক্তমঞ্চে জাফর ইকবালের বই পোড়ানো কর্মসূচি’ নামে একটা ইভেন্টকে অতি গুরুত্ব সহকারে দেখেছেন দেশের বিদ্বৎ সমাজ। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও এই ইভেন্টের কোনো লিংক পেলাম না। সম্ভবত নানা সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে হয়তো যে বা যারা এটা তৈরি করেছিল তারা সামাজিক স্বার্থে সরিয়ে দিয়েছে।

বই পোড়ানো উচিত, কি উচিত না এই প্রশ্নে বেশির ভাগ পুস্তক-প্রেমীরা বলবেন, বই পোড়ানো উচিত নয়। বই বস্তুগত জিনিস হলেও তা জীবন্ত একটা ব্যাপার, লং লিভিং এজেন্ট। পশুপাখি, গাছপালা, কীটপতঙ্গ, মানুষ বা ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাসের মতো তারও প্রাণ আছে। মানুষ বইকে পবিত্র সত্তা হিসেবে ধরে আসছে গুটেনবার্গের মেশিন আবিষ্কার হওয়ার আগ থেকেই। তবে আধুনিককালে অনেকে বই-বস্তুকে অতটা পবিত্র হিসেবে দেখতে চান না। তবে সমাজ যে প্রচলিত বিশ্বাস নিয়ে চলে, সেখানে বই পোড়ানো ইতিবাচক কোনো ঘটনা নয়। মানুষ নৈতিক ভাবে এটা বিশ্বাস করলেও রাজনৈতিক সত্য হলো যিশুখ্রিস্টের জন্মের শত শত বছর আগ থেকে দুনিয়ার প্রায় সব সমাজে বই, পাঠাগার পোড়ানো হয়েছে। মানুষ হত্যা ধর্মীয় ও নৈতিক মানদণ্ডে মহাপাপ, তবে যুদ্ধ বা বিচারের নামে মানুষ হত্যা জায়েজ, দুনিয়ার বেশির ভাগ রাষ্ট্রে। পৃথিবীতে নৈতিক সত্য আর রাজনৈতিক সত্য এক নয়। ফলে, জাফর ইকবালের বই ঘটা করে পোড়াতে চাওয়ার ডাক নৈতিকভাবে নেতিবাচক, তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় তার অবস্থান এই ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে দেখার সুযোগ করে দেয়। বই পোড়ানোকে কেন্দ্র করে যে আলোচনার সূত্রপাত, তা বোঝার জন্য আমাদের দুটো বিষয় খুব ভালো করে মাথায় রাখা দরকার তরুণ ও প্রবীণ প্রজন্মকে। প্রথমত এর ‘কারণ কী’ দিয়ে শুরু করতে হবে। দ্বিতীয়ত এই কারণের ফলে কার্যকে বাস্তবায়ন করলে কী হতে পারে তা ভুললে চলবে না। আমাদের বোঝা দরকার সবার, কেন তরুণরা তার বই পোড়াতে চায়। আর যে তরুণ প্রজন্ম নিজেদের রক্তের বিনিময়ে বৈষম্যমুক্ত, ন্যায়বিচারের নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখে তাদের এর বই পোড়ানোর ফলাফল কী হতে পারে, তাও মাথায় নেওয়া দরকার।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় জাফর ইকবাল একটি চিরকুট লিখেছিলেন, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। তিনি লিখেছেন, ‘‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমার বিশ্ববিদ্যালয়, আমার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়। তবে আমি মনে হয়, আর কোনোদিন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে চাইব না। ছাত্রছাত্রীদের দেখলেই মনে হবে, এরাই হয়তো সেই ‘রাজাকার’। আর যে কদিন বেঁচে আছি, আমি কোনো রাজাকারের মুখ দেখতে চাই না। একটাই তো জীবন, সেই জীবনে আবার কেন নতুন করে রাজাকারদের দেখতে হবে?’’ এর ভেতর দিয়ে তিনি ছাত্র-জনতার যৌক্তিক দাবিকে তার তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভেতর দিয়ে শুধু বৃদ্ধাঙ্গুলিই দেখাননি, বিগত আওয়ামী সরকারের হত্যাযজ্ঞের প্রস্তুতিকে নৈতিক ভাবে সমর্থন দিয়েছেন ঘৃণা ছড়ানোর ভেতর দিয়ে। চূড়ান্ত অবজ্ঞা ও উপেক্ষা করা হয়েছে সমাজের বিশাল একটি শ্রেণিকে। অন্যদিকে সরকার সমর্থন ও লেজুড়বৃত্তির ভেতর দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের রক্তের ওপর দিয়ে তিনি ক্ষমতার উচ্ছিষ্টের ভাগ বাড়াতে চেয়েছেন। উচ্ছিষ্ট বলছি কারণ, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পরিবার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা উৎকোচ গ্রহণ করেছেন বলে সংবাদপত্রে দেখেছি, এটা  আমাদের ২০২৪-২৫ সালের বাজেট বরাদ্দের আলাদা ভাবে স্বাস্থ্য বা সামরিক খাত থেকে বেশি। জাফর ইকবাল এমন একজন অধ্যাপক যিনি সবসময় ছাত্র-ছাত্রীদের অনশন, সংগ্রাম, রক্তের বিপক্ষে থেকে সর্বদা সরকারি উদ্দেশ্যকে সেবা করে গিয়েছেন। ২০২২ সালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিবিরোধী আন্দোলনের সময় ছাত্রছাত্রীদের অনশন ভাঙানোর সময় যে কথা তিনি দিয়েছিলেন, তার কিছুই প্রায় তিনি রাখেননি। একজন লেখক, শিক্ষক ও বিশিষ্ট নাগরিক হওয়ার থেকে তিনি ছিলেন আওয়ামী সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন, শোষণের বয়ান উৎপাদনের চৌকস মেশিন।

তার প্রতি ছাত্রছাত্রীদের যে প্রত্যাশা ছিল তা পূরণে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। বেশিরভাগ মানুষ বুঝতে পেরেছেন, একটি পক্ষ সচেতনভাবে মুক্তিযুদ্ধ চেতনার খুব ধারালো একটা অস্ত্র দিয়ে তরুণ সমাজকে ভাগ করে দিতে চেয়েছে শাসকের শোষণ যন্ত্রকে সচল রাখার জন্য। এ রকম জাফর ইকবাল ধরনের লেখক সমাজে একজন নয়, অগণিত। ফলে, তরুণ সমাজ কর্র্তৃক তার বই পোড়াতে চাওয়া যত না নৈতিক ঘটনা, তার থেকে বেশি রাজনৈতিক ঘটনা। এর ভেতর দিয়ে জনবিরোধী লেখকরা একটা  মেসেজ অন্তত পেয়েছেন যে, তারা সমাজে কোনো অর্থেই আর বিশিষ্ট কেউ নন। তবে কি আমরা এই ধরনের বই পোড়ানোর উৎসবকে সমর্থন করব! যখন বড় ধরনের রাষ্ট্র, রাজনীতি ও মনন মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে? এই উত্তর পেতে হলে ইতিহাস ও এই কাজের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ ফলাফল দিয়ে বিচার করতে হবে। তবেই আমরা যৌক্তিক উত্তর পেতে পারি।

দুনিয়ায় বই পোড়ানো কোনো নতুন ঘটনা না। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে বিজয়ীরাই সব সময় পরাজিতদের বই পোড়ায়। সেই অর্থে জাফর ইকবালরা পরাজিত শক্তি। একটা সভ্যতা বা দেশ দখলের পর বিরোধীদের মত-পথ বন্ধ করার নিয়তে ভিন্ন মতাদর্শের বই পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এর আরেকটা মনস্তাত্ত্বিক কারণ হলো ‘প্রতারিত হওয়ার’ বোধ। যাদের পরাজিত করা হয়েছে, একসময় তাদের শাসন শোষণ দ্বারা আক্রান্ত ছিল বিজয়ীরা। সেই স্মৃতি মুছে দেওয়ার জন্য বই পুড়িয়ে দেওয়া হয়। নিজেদের অর্জনকে প্রকাশ ও স্থির রাখার জন্যও এটা করা হয়। ১৯৩৩ সালে নাজি পার্টির ছাত্র সংগঠন জার্মান স্টুডেন্ট ইউনিয়ন অ-র্জামান আত্মা পরিষ্কার করার প্রোপাগান্ডা চালায়। এতে অগণিত বই পোড়ানো হয়। কেননা তা তাদের মতাদর্শবিরোধী। এই বই পোড়ানোর লেখকদের লিস্ট অতি দীর্ঘ। এখানে সবার নাম লিখলে কয়েক পাতা লাগবে। অল্প কয়টা নাম উল্লেখ করি বোঝার সুবিধার্থে কার্ল মার্কস, টমাস মান, আইনস্টাইন, হারমান হেস, রোঁমারোলা, ফ্রান্স কাফকা, সিগমুন্ড ফ্রয়েড, হেমিংওয়ে, হেলেন কিলার, জোসেফ কনরাড, ফিয়োদর দস্তয়েভস্কি, লেনিন, ট্রটস্কি, মায়াকোভস্কি, তলস্তয়, ওয়াল্টার বেঞ্জামিন প্রমুখ। লেখকরা একটা সমাজের বয়ান তৈরি করে যার ভিত্তিতে সমাজে পারস্পরিক সম্পর্ক, সহযোগিতা ও সম্মিলিত বিশ্বাস কেমন হবে তা নির্মাণ করে। একটা সমাজে নানা মত যখন এক সঙ্গে বসবাস করে, তখন তা অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক, সুখকর ও সহনীয় হয়।

সামাজিক আস্থা তৈরিতে নানা মতের প্রাচুর্য অপরিহার্য একটা বিষয়। ফলে নানা বর্ণ পরিচয়ের মানুষ সামাজিকভাবে সহাবস্থান করতে পারে একে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে। ফলে, রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থাও হয় অংশগ্রহণমূলক যা উন্নততর সমাজের প্রতীক। কিন্তু সমাজে যখন ফ্যাসিবাদ, একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন হয় তখন সব মতকে মুছে দেওয়ার প্রকল্প নেওয়া হয়। সমাজের নানা প্রান্তের নানা গল্প মুছে দিয়ে একটাই গল্প বা বয়ানকে মূল উপজীব্য করে তোলা হয়। সব ব্যক্তির ওপরে একক ব্যক্তিকে মহৎ হিসেবে গড়ে তোলা হয়। ভিন্ন মতকে সমাজ থেকে কেটে ও উপড়ে ফেলাকে বৈধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয় সব প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি দিয়ে। এই কাজটাই এখানে করা হয়েছে দীর্ঘ ১৫ বছরের আওয়ামী শাসনামলে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও একক ব্যক্তির বন্দনার ভেতর দিয়ে সব ভিন্নতা অস্বীকার করা হয়েছে। একক বয়ান তৈরি করা হয়েছে শোষণ জারি রাখার জন্য।

এখন যদি আমার বিরোধী মতের লেখকদের বই পোড়ানোকে উৎসব ও প্রয়োজনীয় অবশ্য কর্তব্য হিসেবে নিই, তবে আমরা যে বৈচিত্র্যপূর্ণ মানুষ ও তার চিন্তার সম্মিলনে নতুন সমাজ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে এগুচ্ছি তা বাধাগ্রস্ত হবে। এর অপব্যবহার ঘটবে। আগামীতে বই নিষিদ্ধ, বইমেলায় অবাঞ্ছিত ঘোষণার মতো নানা উৎপাত বৃদ্ধি পেতে পারে। আমরা সব মানুষের গল্প বা বয়ানকে সমাজে চালু রাখতে চাই, সমান অধিকার নিশ্চিত করতে চাই ধর্ম, বর্ণ, বিশ্বাস নির্বিশেষে। এই যাত্রাপথ কোনো স্বল্পমেয়াদি, জনপ্রিয় ধারার শর্ট-কার্টে অর্জন সম্ভব না।

সাংস্কৃতিক ভাবে আমাদের প্রথম ও প্রধান কাজ হলো স্বৈরতান্ত্রিক একতরফা বয়ানের বিপক্ষে নতুন সাম্যবাদী ও ন্যায়বিচারমূলক সামাজিক বয়ান তৈরি করা। বই পোড়ানোর মতো সহজ জনপ্রিয় ধরনের আইডিয়াতে আমাদের আত্মাহুতি দেওয়ার মানে হয় না এই নতুন সময়ে। প্যারাডাইস লস্টের লেখক জন মিল্টনের একটি কথা দিয়ে শেষ করি। যা তার অ্যারোপ্যাজিটিকায় পাওয়া যায় ‘যে একজন মানুষ হত্যা করল সে মূলত একটা যুক্তিপূর্ণ সৃষ্টিকে ধ্বংস করল... কিন্তু যে বই পোড়াল সে মূলত যুক্তিটাকেই পুড়িয়ে দিল।’

আমাদের বিক্ষুব্ধ হওয়ার অনেক কারণ আছে, কিন্তু ক্রোধ থেকে সৃষ্ট কাজের দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল নিয়ে যেন সব সময় আমরা সচেতন থাকি।

লেখক: কবি ও অনুবাদক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত