ভারত থেকে নেমে আসা পানি ও কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে ভেঙে গেছে গোমতী নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ। স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার সম্মুখীন হয়েছে কুমিল্লার মানুষ। এতে ডুবে গেছে জেলার বুড়িচং উপজেলা। ওই উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাহিদা আক্তার। ৬০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়েছে। সেই সঙ্গে ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খোলা হয়েছে ৩৫ আশ্রয় কেন্দ্র। তারমধ্যে ৪টিতে পানি ঢুকে গেছে।
তিনি বলেন, এখন আর গ্রাম আর ইউপি হিসাব করে লাভ নেই। পুরো বুড়িচংই পানির নিছে। স্রোতের মতো পানি প্রবেশ করায় প্রতিনিয়ত পানির উচ্চতা বেড়েই চলেছে। এভাবে চলতে থাকলে আশপাশের উপজেলাও প্লাবিত হতে পারে। বাঁধ ভেঙে যাওয়ার শঙ্কায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকেই স্থানীয় লোকজনকে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে এলাকায় মাইকিং করা হয়। ইতিমধ্যে অনেকে আশ্রয়কেন্দ্রে চলে গেছে। পানিবন্দি মানুষকে উদ্ধারে কাজ চলছে। স্থানীয় প্রশাসন, সাধারণ মানুষ, বিভিন্ন সংগঠনের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সদস্যরাও পানিবন্দি মানুষকে উদ্ধার করে আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছে দিচ্ছেন। যেভাবে তীব্র বেগে পানি বুড়িচং ঢুকছে এতে দ্রুতই পাশের ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা থেকে শুরু করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবাও প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
হঠাৎ নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দিশাহারা হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ। এরই মধ্যে স্থানীয় বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পাশাপাশি পানিবন্দিদের উদ্ধারে কাজ শুরু করেছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা।
গতকাল বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) দিবাগত রাত পৌনে ১২টার দিকে বুড়িচং উপজেলার ষোলনল ইউনিয়নের বুড়বুড়িয়া গ্রামের কাছে গোমতী নদীর বাঁধটি ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকতে থাকে। এরপর আজ শুক্রবার (২৩ আগস্ট) দুপুর ৩টার মধ্যে সারা উপজেলা গোমতীর পানিতে প্লাবিত হয়ে যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বুড়িচং উপজেলার মহিষমারা উচ্চ বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে সেখানে কেউই খাবার ও চিকিৎসাসেবা নিয়ে যায়নি। যে কারণে ২০ জনের বেশি শিশু ও ১০ জনের বেশি বৃদ্ধকে নিয়ে বিপাকে পড়েছে আশ্রয়গ্রহণকারীরা।
শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক রশিদ আহমেদ বলেন, খাবার না থাকার বিষয়টি আমরা আমাদের স্বেচ্ছাসেবীদের জানিয়েছি। কিন্তু তারা নিজেরাই নিজেদের পরিবার নিয়ে ব্যস্ত, তারাও বিপদে আছে। যাদের সম্ভব হয় দ্রুত মহিষমারা উচ্চ বিদ্যালয়ে আসুন। এখানকার প্রায় ৫০০ মানুষ না খেয়ে আছে। শিশুরা কান্না করছে। বের হওয়ার অবস্থাও নেই। কারণ বিদ্যালয়ের নিচতলা পানিতে ডুবে গেছে।
এদিকে আশ্রয়কেন্দ্রে খাবার সঙ্কটে শিশু-বৃদ্ধসহ বিপাকে পড়েছে মানুষজন। গতকাল বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে বুড়িচং উপজেলা প্লাবিত হতে শুরু করলে মানুষজন প্রাণ রক্ষায় ছুটতে থাকে আশ্রয়কেন্দের দিকে। তবে সেখানে রয়েছে খাবার ও চিকিৎসাসংকট।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড, কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ ওয়ালিউজ্জমান বলেন, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকে বুড়বুড়িয়া এলাকায় প্রতিরক্ষা বাঁধের নিচ দিয়ে পানি বের হচ্ছিল। স্থানীয় লোকজন বালুর বস্তা ফেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। রাত পৌনে ১২টার দিকে বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকতে থাকে। বাঁধের অন্তত ৩০ ফুট ভেঙে গেছে। নদীর পানি না কমলে এই বাঁধ মেরামত করা সম্ভব নয়। নদীর পানি যত দিন না কমবে, তত দিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হতে থাকবে।
তিনি আরও বলেন, শুক্রবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত গোমতীর পানি বিপদসীমার ১০৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সর্বোচ্চ বিপদসীমার ১৩৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছে। সে হিসেবে পানি কিছুটা কমেছে। নদীর শহর রক্ষা বাঁধ ঝুঁকিতে। আমরা চেষ্টা করছি অন্য কোথাও যেন বাঁধ না ভাঙে সেদিকে লক্ষ্য রাখার।
পাউবোর সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৭ সালে গোমতীর পানি বিপদসীমার ৯৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। কিন্তু গত দুই দিনে পানি বাড়ার হিসাব অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ফেলে।
এ বিষয়ে কুমিল্লার সিনিয়র সাংবাদিক ও বুড়িচংয়ের বুড়বুড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা গোলাম কিবরিয়া বলেন, আমাদের গ্রামে বর্তমানে পানি গলা সমান হয়ে গেছে। পুরো গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে। ভেসে গেছে মানুষের পুকুরের মাছ। মানুষের দুর্ভোগ বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। গোমতীতে এত পানি আগে কখনো দেখিনি।
এদিকে বুড়িচংয়ে গোমতীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই আতঙ্কে ঘুম নেই কুমিল্লা নগরবাসীর চোখে। কারণ গোমতী নদীরপাড়েই অবস্থান কুমিল্লা নগরীর। বৃহস্পতিবার প্রায় পুরো রাতই নগরীর সিংহভাগ মানুষ জেগে ছিল বাঁধ ভাঙার আতঙ্কে। নগরীর বাসিন্দাদের শঙ্কা, গোমতীর বাঁধ ভাঙলেই তলিয়ে যাবে গোটা শহর।
শুক্রবার নগরীর কাপ্তান বাজার এলাকার বাসিন্দা সামছুল আলম বলেন, বুড়িচংয়ে বাঁধ ভাঙার খবর পাওয়ার পর থেকেই মানুষ আতঙ্কে আছে। কারণ গোমতীর বাঁধ ভেঙে গেলে পানিতে তলিয়ে যাবে গোটা শহর। এমনিতেই সামান্য বৃষ্টি হলেই নগরীর সড়কগুলো তলিয়ে যায়। যদি গোমতীর বাঁধ ভেঙে যায়, তবে পুরে শহর তলিয়ে যাবে।
এদিকে জেলার চৌদ্দগ্রাম, নাঙ্গলকোট, মনোহরগঞ্জ, লাকসামসহ বেশ কয়েকটি উপজেলার বেশির ভাগ গ্রাম এখনো বন্যার পানিতে ডুবে আছে। তবে বৃহস্পতিবারের তুলনায় আজ শুক্রবার এসব উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এ ছাড়া গতকাল বৃহস্পতিবার ভোর থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চৌদ্দগ্রাম উপজেলার দুই কিলোমিটার এলাকা পানিতে প্লাবিত হয়। শুক্রবার এই স্থানে মহাসড়কে পানি দেখা যায়নি।
বন্যায় ডুবে যাওয়া জেলার নাঙ্গলকোট, লাকসাম, মনোহরগঞ্জ, চৌদ্দগ্রাম, বুড়িচং ও বাহ্মণপাড়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এতে নেটওয়ার্ক সমস্যায় চরম ভোগান্তিতে রয়েছে মোবাইল সেবা গ্রহীতারা। সরকারি ত্রাণ সহায়তা কিছুই পাননি অনেকে।
আখাউড়ায় বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে
পানি ছাড়ার আগে জানানোর নিয়ম ভারত প্রতিপালন করেনি: উপদেষ্টা
ছেলের সামনেই প্রাপ্তবয়স্কদের কন্টেন্ট বানান মডেল মা