খালেদ মাহমুদ সুজনের বলে ইনজামাম উল-হক ২ রান নিতে গেলে রানআউট হয়েছিলেন উমর গুল। সেই উইকেটে ক্রিকেটারদের সঙ্গে উল্লাসে মেতে উঠেছিল গোটা দেশ। কারণ আর একটি উইকেট নিলেই যে জয় নিশ্চিত বাংলাদেশের। কিন্তু ইনজামাম সেটা হতে দিলেন না। ঐ ওভারেরই শেষ বলে চার মেরে টাইগারদের স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে ১ উইকেটে জয় নিশ্চিত করেন তিনি। ২০০৩ সালে মুলতানের সেই নিশ্চিত জেতা ম্যাচ হেরে গিয়ে কেঁদেছিলেন তখন অধিনায়ক সুজন।
তারপর কেটে গেছে ২০ বছর। ঐ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ ৯টি টেস্ট খেলেছে পাকিস্তানের বিপক্ষে। কিন্তু কখনো হাসিমুখে মাঠ ছাড়তে পারেনি। অবশেষে ২১ বছর পর রাওয়ালপিন্ডিতে গিয়ে মুলতানে হাবিবুল বাশারদের দুঃখ ঘুচিয়েছেন নাজমুল হোসেন শান্তরা। ১০ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে স্বাগতিকদের হারিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করে ইতিহাস গড়েছেন মুশফিকুর রহিমরা।
দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। বিসিবিতে ক্ষমতার পালাবদল। তারপর প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বন্যায় গৃহহীন মানুষ, শত শত মৃত্যু। প্রতিদিনের নানা দুঃসংবাদের ভিড়ে ক্রিকেট নিয়ে চর্চা ছিল সামান্যই। এমন অবস্থায় পাকিস্তানের পেস অ্যাটাকের সামনে জাকির হাসানরা দাঁড়াতেই পারবেন না বলে ধারণা করেছিলেন অনেকে। কিন্তু হলো তার উল্টোটা। অনেকগুলো দুঃখ ভারাক্রান্ত সংবাদের ভিড়ে এক চিলতে হাসির জোগান দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। যেন ক্রিকেট বোর্ডের নেতৃত্বের বদলের সঙ্গে পাল্টে গেছে মাঠের ক্রিকেটের পারফরম্যান্সও।
ইতিহাস গড়া এই জয়ের দিনে শান্তদের মধ্যে নিজেদের খুঁজে পেয়েছেন মুলতান টেস্টের সদস্য রাজিন সালেহ। প্রথম ইনিংসে ৪৯ ও দ্বিতীয় ইনিংসে ৪২ রান করেছিলেন। কিন্তু দল হেরে গিয়েছিল ১ উইকেটে। সেই আক্ষেপ মিটেছে জানিয়ে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একুশ বছর আগের হারের আক্ষেপ আজ আমাদের ছেলেরা মিটিয়েছে। অভিনন্দন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে। মুশফিকসহ সবাই অসাধারণ খেলেছে। আমি তাদের মধ্যে যেন নিজেকে খুঁজে পেয়েছি।’
মুলতান হারের দুঃখটা ঘুচেছে জাভেদ ওমর বেলিমেরও। তিনি সেই টেস্টের ওপেনার ছিলেন। দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘আমরা ঐ সময় জয়ের খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিলাম। প্রথম টেস্ট ম্যাচ জয়ের স্বাদ নিতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু আমাদের কিছু ভুলে সেটা আর হয়নি। আর অভিজ্ঞতারও ঘাটতি ছিল। তাই ম্যাচটা আমরা শেষ পর্যন্ত জিততে পারিনি। তবে সেই দুঃখটা আজ ঘুচিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ দল। তাদের শুভ কামনা। দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যতের জন্য এই জয়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ।’
মুলতান টেস্টের প্রসঙ্গ এলে ঐ সময়ের বাংলাদেশি সমর্থকদের অনেকেই আম্পায়ারকে সমালোচনা করেন। অশোকা ডি সিলভা ও রাসেল টিফিন ছিলেন ফিল্ড আম্পায়ারের দায়িত্বে। অনেকগুলো এলবিডাব্লিউ আবেদন ছিল, পরে রিপ্লেতে দেখা গেছে সেগুলো আউট। কিন্তু সিলভা সেদিন কর্ণপাত করেননি। এমনকি টিভি আম্পায়ার আলিম দারের দিকেও আঙুল তুলেন অনেকে। কারণ তৎকালীন পাকিস্তান অধিনায়ক ও উইকেটরক্ষক রশিদ লতিফ অলক কাপালির একটি ক্যাচ মিস করেও মাটি থেকে তুলে নিয়ে আউটের আবেদন করে সফল হয়েছিলেন।
আর এসব কারণেই বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার সুমন মনে করেন রিভিউ থাকলে সেদিনও ম্যাচটা জিততে পারত বাংলাদেশ। ‘মুলতান টেস্ট হারের দুঃখ কোনোদিনই ঘুচবে না। তবে দুঃখ আজ কিছুটা কমেছে বলে মনে হয়। কারণ তখনো আমাদের কোনো টেস্ট জয় ছিল না। খুব কাছাকাছি চলেও গিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয়নি। আমার মনে হয় রিভিউ সিস্টেমটা তখন চালু থাকলে আমরা সেদিন জিততে পারতাম (হা হা হা)।’
মুলতান টেস্ট জিততে না পারার আরও কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘ইনজামাম একটা অসাধারণ ইনিংস খেলেছিল। আর যদি আমাদের এখনকার মতো পেস অ্যাটাকটা থাকত তাহলে নিশ্চিত জিততে পারতাম। সঙ্গে ঐ রিভিউটা তো বললামই।’ ম্যাচ জয়ের পর মুশফিকুর রহিম বাংলা টাইগার্সের সঙ্গে ক্যাম্প ও এ দলের সফরটাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এটাকে খুব ভালো একটা সুযোগ হিসেবে দেখেন হাবিবুল বাশারও, ‘বেশিরভাগ দলই টেস্টের আগে ‘এ’ দলকে সফরে পাঠায়। যে দলের সঙ্গে জাতীয় দলের ৬-৭ ক্রিকেটার থাকেন। এর প্রধান কারণ কন্ডিশনের সঙ্গে আগেভাগে পরিচিত হওয়া। যা কাজে আসে জাতীয় দলের হয়ে খেলতে। এবার বাংলাদেশ এ দলের পাকিস্তান শাহিনসের সঙ্গে সিরিজটা খুব কাজে এসেছে।’
মুলতান টেস্টের বাংলাদেশ দলের উইকেটরক্ষক খালেদ মাসুদ পাইলটও বাংলাদেশ দলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি অবশ্য ঐ দলের সঙ্গে এই দলের তুলনা করতে চান না, ‘এটা আমি পছন্দ করি না। তবে বাংলাদেশের এই দলটা অভিজ্ঞ এবং তাদের জয়ের ক্ষুধা আছে। পাকিস্তানের বিপক্ষে এই জয়টা কেবল শুরু আমাদের। আগামীতে আরও জয় আসবে বলে আমার বিশ্বাস। তবে আপাতত আমরা জয়টা উপভোগ করি। পরের ম্যাচ নিয়ে ভাবার সময় আছে।’
২০০৩ সালে বাংলাদেশ দলকে নেতৃত্ব দেওয়া খালেদ মাহমুদ সুজন ম্যাচটা হাত থেকে ফসকে যাওয়ায় কেঁদেছিলেন মুলতানে। ২১ বছর পর ফের তিনি কেঁদেছেন ঢাকায়। তবে এই কান্না আনন্দের। বাংলাদেশের পাকিস্তান জয়ের জন্য। জানিয়েছেন, যে জয়ে সুজন ভুলে যাবেন মুলতানের সেই দুঃস্মৃতি।
