বন্যার কারণে দেশের ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এখনো তলিয়ে আছে কৃষিজমি। জমির শাকসবজি, ধানসহ অন্যান্য ফসল ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। অনেক ফসল পানিতে ডুবে থাকার কারণে পচে গেছে। কৃষকদের এ ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে অনেকটা সময় লাগবে। তবে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর কৃষকরা যা করতে পারেন জানালেন কৃষিবিদ জাওয়াদুল করিম
কৃষক যা করবেন
বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বা আংশিক হয়েছে এমন জমির ক্ষেত্রে বন্যার পানিতে ভেসে আসা কচুরিপানা, পলি, বালি এবং আবর্জনা দ্রুত পরিষ্কার করতে হবে। পানি সরে যাওয়ার পর ৫-৭ দিন কাদাযুক্ত ধানগাছ পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। পানি নেমে যাওয়ার পরই সার দেওয়া যাবে না। ধানগাছ পচে যেতে পারে। ১০ দিন পর ধানের চারায় নতুন পাতা গজানো শুরু হলে বিঘাপ্রতি ৮ কেজি ইউরিয়া ও ৮ কেজি পটাশিয়াম দিতে হবে।
যেখানে বন্যার পানি ওঠেনি এ রকম জায়গায় বাড়ন্ত আমন ধানের গাছ (রোপণের ৩০-৪০ দিন পর) থেকে ২-৩টি কুশি রেখে বাকি কুশি শেকড়সহ তুলে অন্য ক্ষেতে রোপণ করতে হবে। বীজতলা করা সম্ভব না হলে ভাসমান বীজতলা তৈরি করে চারা উৎপাদন করা যাবে।
পানি নেমে যাওয়ার পর আলোক সংবেদনশীল উফশী জাত যেমন বিআর-৫, বিআর-২২, বিআর-২৩, ব্রি ধান-৩৪, ব্রি ধান-৪৬, ব্রি ধান-৫৪ এবং নাজিরশাইলসহ স্থানীয় জাত রোপণ করতে হবে। এ ছাড়া স্বল্প জীবনকাল সম্পন্ন ব্রি ধান-৫৭ ও ব্রি ধান-৬২ও রোপণ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত বীজতলা করা যাবে। দেরিতে রোপণের ফলে দ্রুত কুশি উৎপাদনের জন্য টিএসপি, জিপসাম ও জিংকসহ দুই-তৃতীয়াংশ ইউরিয়া জমি তৈরির সময় দিতে হবে। অবশিষ্ট ইউরিয়া রোপণের ২৫-৩০ দিনের মধ্যে দেওয়া যাবে। যেসব এলাকা উঁচু ও মধ্যম উঁচু; সেসব জমিতে অঙ্কুরিত বীজ সরাসরি জমিতে ছিটিয়ে বপন করতে হবে। এর ফলে ৫-৭ দিন আগে হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বন্যার ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া ধানগাছের যাবতীয় পরিচর্যা যেমন আগাছা দমন, পোকামাকড় ও রোগাক্রমণ থেকে ফসল রক্ষা, সুষম পরিমাণে সার প্রয়োগ ও প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পূরক সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। বন্যার পরে চারাগাছ মাটিতে লেগে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতাপোড়া রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে ৬০ গ্রাম থিওভিট ও ৬০ গ্রাম পটাশ সার ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৫ শতাংশ জমিতে স্প্রে করতে হবে। গাছে মাজরা, বাদামি ও সাদা-পিঠ ঘাসফড়িং, পাতা মোড়ানো এবং পামরি পোকার আক্রমণের হাত থেকে রক্ষার জন্য পোকা বিশেষে হাতজাল, পার্চিং এবং প্রয়োজন হলে অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে। দেশের উত্তরাঞ্চলে ১৫ সেপ্টেম্বর এবং মধ্য ও দক্ষিণ অঞ্চলে ২০ সেপ্টেম্বরের পর আমন ধান রোপণ করা ঠিক নয়। এ ক্ষেত্রে আগাম রবিশস্য আবাদ করা যেতে পারে।
কীভাবে বীজতলা তৈরি হবে
ভাসমান বীজতলার ক্ষেত্রে কচুরিপানা ও মাটি দিয়ে কলার ভেলায় ভাসমান বীজতলা করা যেতে পারে। দাপোগ বীজতলার ক্ষেত্রে বাড়ির উঠান বা যেকোনো শুকনো জায়গায় কিংবা কাদাময় সমতল জায়গায় পলিথিন, কাঠ বা কলাগাছের বাকল দিয়ে তৈরি চৌকোনা ঘরের মতো করে প্রতি বর্গমিটারে ২-৩ কেজি অঙ্কুরিত বীজ ছড়িয়ে দিতে হবে। এভাবে করা বীজতলা থেকে ১৪-১৫ দিন বয়সের চারা জমিতে রোপণ করা যাবে। যে সব এলাকা বন্যার পানিতে আক্রান্ত হয়নি সে সব এলাকার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে প্রয়োজনীয় পরিমাণ বীজতলা তৈরির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে যাতে বন্যার পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে চারা বিতরণ করা যায়।
ধানের জাত নির্বাচন
বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর স্বল্প জীবনকালীন জাত যেমন ব্রি ধান ৩৩, ব্রি ধান ৫৬, ব্রি ধান ৫৭, ব্রি ধান ৬২, ব্রি ধান ৭১ ও ব্রি ধান ৭৫ সরাসরি ৩০ আগস্ট পর্যন্ত রোপণ করা যেতে পারে। এছাড়াও ব্রি উদ্ভাবিত আলোক সংবেদনশীল উফশী জাত যেমন বিআর ৫, বিআর ২২, বিআর ২৩, ব্রি ধান ৩৪, ব্রি ধান ৪৬ জাতসমূহ ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রোপণ করা যাবে।
ধান গাছের যত্ন
বন্যায় সেভাবে আক্রান্ত হয়নি এমন বাড়ন্ত আমন ধানের গাছ (রোপণের ৩০-৪০ দিন পর্যন্ত) থেকে ২-৩টি কুশি রেখে বাকি কুশি সযতেœ শেকড়সহ তুলে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে অন্য ক্ষেতে রোপণ করা যেতে পারে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর নাবীতে রোপণের ক্ষেত্রে প্রতি গোছায় একটু বেশি করে চারা দিয়ে (৪-৫টি) এবং ঘন করে (২০ দ্ধ ১৫ সে.মি. দূরত্বে) রোপণ করতে হবে।
