সাফ শিরোপা জুলাইয়ে শহীদদের উৎসর্গ

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৪, ০২:১৪ এএম

মাত্র দুই সপ্তাহের প্রস্তুতিতেই শিরোপা জিতেছে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ দল। সেটাও নেপালের মাটিতে স্বাগতিকদের রীতিমতো বিধ্বস্ত করে। এমন বিজয় গত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আত্মত্যাগকারীদের উৎসর্গ করেছেন লাল-সবুজের সৈনিকেরা। আজ বীরের বেশে দেশে ফিরবেন মারুফুল হকের শিষ্যরা। তবে তাদের মনের কোণে থাকবে যাদের জীবনের বিনিময়ে স্বৈরাচার পতন ঘটেছে, সেই শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা।

ফাইনালের স্কোরলাইনটা একপেশে করে বাংলাদেশের জয় ৪-১ ব্যবধানে। এমন সাফল্যের রূপকার অবশ্যই খেলোয়াড়রা। তবে অভিজ্ঞ কোচ মারুফুলকে কৃতিত্ব না দিয়ে পারা যাবে না। এক অস্থির সময়ে যুবাদের দায়িত্ব নিয়ে তাদের হৃদয়ে এই কোচ গেঁথে দিয়েছেন বিজয়ের মন্ত্র। বুধবার আনফা অ্যাকাডেমিতে জয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাই এই কোচকে নিয়ে শিষ্যদের উদযাপনটা হলো দেখার মতো। আর ম্যাচ শেষে মারুফ স্মরণ করলেন আন্দোলনে প্রাণ হারানো ছাত্র-জনতাকে, ‘আমি প্রথমে বলতে চাই আমাদের এই সাফল্য, এই শিরোপা, গত মাস ও এই মাসে যে ছাত্র-জনতারা আন্দোলনে আত্মত্যাগ করেছেন, তাদের উদ্দেশে উৎসর্গ করছি।’ এর পরই তিনি প্রশংসায় ভাসিয়েছেন শিষ্যদের। যারা নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে এনে দিয়েছেন কাক্সিক্ষত শিরোপা। তিনি সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছেন ফুটবলাররা তার পরিকল্পনা মেনে খেলায়, ‘এই ম্যাচের আগে এক দিন মাত্র রিকভারির সময় পেয়েছি এবং খেলোয়াড়দের আমার নিজের সব মেধা দিয়ে রিকভারি করার চেষ্টা করেছি। ম্যাচ শুরুর আগে ওদের বলেছি, ধীরেসুস্থে খেলার জন্য। যেহেতু এটা ওদের (নেপালের) হোম গ্রাউন্ড, ওরা আমাদের ভেতরে আসবেই, অ্যাটাক করবে। তাই ছেলেদের বলেছিলাম কাউন্টার অ্যাটাক করার জন্য। তবে ১০-১২ মিনিট পর যখন দেখলাম তারাই উল্টো চাপটা নিয়ে ফেলেছে হোম গ্রাউন্ডের। তখন কৌশল বদলে আমরা আক্রমণে চলে গিয়েছিলাম। যে খেলাটা পাসিং ফুটবল, যেটা একেবারে শুরু থেকে খেলাতে চেয়েছিলাম। কারণ এখানে অনেক খেলোয়াড় আছে, যারা টেকনিক্যালি অনেক সাউন্ড, যাদের দিয়ে পাসিং ফুটবল খেলানো সম্ভব। ফাইনাল ম্যাচে তারা সেটা করতে পেরেছে মাথা ঠান্ডা রেখে। এ জন্য খেলোয়াড়দের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।’

জোড়া গোল করে ফাইনালের নায়ক মিরাজুল ইসলাম সব কৃতিত্বই দিয়েছেন সৃষ্টিকর্তাকে, ‘আল্লাহপাক সঙ্গে ছিলেন বলেই আমরা শিরোপা জিততে পেরেছি। ভারতের বিপক্ষে আমরা অত ভালো না খেলেও জিতেছি। আমরা নিজেরা কেউ কিছু করিনি, সব আল্লাহ করেছেন। সত্যি বলতে, মাঠে নামার পর চিন্তায়ও ছিল না আসরের সেরা গোলদাতা হব। আমার চিন্তা ছিল দলকে এগিয়ে নেওয়ার। সেট-পিস থেকে একটা গোল করেছি। এটা আমি চিন্তাও করিনি, আল্লাহর অশেষ কৃপায় হয়েছে।’

নিয়মিত অধিনায়ক ও গোলকিপার মেহেদী হাসান শ্রাবণের চোটের কারণে ফাইনালে তেকাঠী সামলানো মোহাম্মদ আসিফ হয়েছেন টুর্নামেন্টের সেরা গোলকিপার। সেমিফাইনালে ভারতের বিপক্ষে টাইব্রেকারে দুটি সেভ করার মতোই ফাইনালেও বেশ কবার ত্রাতার ভূমিকা নেওয়া আসিফ বলেন, ‘বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন, দেশবাসীর দোয়া ও সতীর্থদের সমর্থনে আজ আমি দুই ম্যাচ খেলেই টুর্নামেন্টের সেরা গোলকিপার হতে পেরেছি। সেই অনূর্ধ্ব-১৭ থেকে খেলছি। ১৯-২০-এও খেলেছি; তবে চ্যাম্পিয়ন হতে পারিনি কখনো। শেষবার অনূর্ধ্ব-২০ আসরে রানার্সআপ হয়ে সবাই খুব কান্নাকাটি করেছিলাম। এবার চেয়েছিলাম যাতে কান্নাকাটি করা না লাগে। একটা শিরোপা নিয়ে দেশে ফিরতে পারি। এই অর্জনের আনন্দ অন্য রকম।’

ফাইনাল মিস করে একটুও আফসোস নেই অধিনায়ক শ্রাবণের, ‘আল্লাহর কাছে লাখো শুকরিয়া যে আমরা চ্যাম্পিয়ন হতে পেরেছি। ভারতের সঙ্গে একটা কঠিন ম্যাচ জিতে ফাইনালে এসেছিলাম। আমরা সবাই খুব মোটিভেটেড ছিলাম যে গ্রুপ পর্বে যেই নেপালের কাছে হেরেছিলাম, তাদের হারিয়ে প্রতিশোধ নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হব। সবাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম এবং মাঠে সেটা প্রমাণ করে শিরোপা জিতেছি। শিরোপা জয়ের পর আমার একটুও মনে হচ্ছে না যে আমি ইনজুরড ছিলাম। ইনজুরি এক সাইডে চলে গেছে, ট্রফি চলে আসছে আমাদের হাতে।’ বাংলাদেশের এই বিজয়ে বড় অবদান লেফট উইঙ্গার রাব্বি হাসান রাহুলের। ফাইনালে গোল দেওয়ার পাশাপাশি আক্রমণ রচনায় রেখেছেন বড় অবদান। পিয়াস আহমেদ নোভাকে দিয়ে শেষ গোলটাও করিয়েছেন তিনি। রাহুল তাই মহা খুশি, ‘এই অনুভূতি বলে বোঝানোর মতো না। আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন। দেশে আমার যারা ভালোবাসার মানুষ ছিলেন, তারা চেয়েছিলেন যাতে আমি একটা গোল করি। আমি, বিশেষ করে সতীর্থ মিরাজের কথা বলব। সবাই সাপোর্ট করেছে বলে গোল করতে পেরেছি।’

নেপাল জয়ের পর এবার যুবাদের সামনে এএফসি কাপ বাছাইপর্বের চ্যালেঞ্জ। সেখানে ভালো করতে তাদের প্রয়োজন প্রস্তুতির যথেষ্ট সময়। এমন সাফল্যের পর সেটা তারা পাবেন বলেই বিশ্বাস।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত