আজ যদি পা ভেঙে যায় কাল কেউ খোঁজ নেবে না

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২৪, ১২:৩৭ এএম

সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপ শিরোপায় মিরাজুল ইসলামের সামনে খুলেছে সিনিয়র জাতীয় দলের দরজা। নেপাল জয় করে ফেরার এক দিন পরেই জাতীয় দলের সঙ্গে চলে গেছেন ভুটানে। ফাইনালে জোড়া গোলসহ আসরে সর্বোচ্চ চার গোল করে পেয়েছেন সেরার স্বীকৃতি। এই সবকিছু নিয়ে দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দর মুখোমুখি হয়েছিলেন এই উঠতি তারকা

জাতীয় দলে ডাক পেলেন। কী মনে হয় এটাই জাতীয় দলে খেলার আপনার জন্য সঠিক সময়?

মিরাজুল ইসলাম : এটা তো আসলে আমি বলতে পারব না। কোচ সঠিক সময় মনে করেই নিশ্চয় আমাকে ডেকেছেন। না ডাকলে বুঝতাম, সময় হয়নি। আরও সামনে সময় আছে।

বাংলাদেশ দলে স্কোরিং নিয়ে একটা সমস্যা থাকে সব সময়। অনূর্ধ্ব-২০ দলের হয়ে চার গোল করে সেরা হয়েছেন। আপনার মাধ্যমে জাতীয় দলে ফিনিশারের সমস্যা কাটবে কি না?

মিরাজুল : বয়সভিত্তিক তিনটি আসর খেলেছি। প্রতিটিতেই গোল করেছি। যদি জাতীয় দলে নিজের পজিশনে খেলতে পারি, তবে শতভাগ চেষ্টা করব।

তিনটি বয়সভিত্তিক আন্তর্জাতিক আসরে খেলে দুটিতে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন। গোল করার সহজাত একটা ক্ষমতা আপনি রপ্ত করেছেন। কীভাবে হলো এটা?

মিরাজুল : শুরু থেকেই স্ট্রাইকার পজিশনে খেলতাম। তবে এলিট অ্যাকাডেমিতে যখন এলাম, তখন ব্রিটিশ কোচ পলের (বাফুফের সাবেক টেকনিক্যাল ডিরেক্টর পল স্মলি) অধীনে কাজ করেছি। তিনিই আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছেন। কীভাবে গোলের সুযোগ কাজে লাগানো যায়, গোলের ক্ষুধা কী করে বাড়ানো যায়, সেগুলো তিনি আমাকে শিখিয়েছেন।

এলিট অ্যাকাডেমি থেকে গত মৌসুমে ব্রাদার্স আপনাকে নিয়েছিল। তবে যেকোনো কারণেই হোক বেশি একটা খেলার সুযোগ পাননি। একটা কষ্ট নিশ্চয় আছে। এবার আবাহনীতে খেলবেন। এবার আবাহনী বিদেশি নেয়নি। কী মনে হয়, ঘরোয়া ফুটবলে নিজেকে প্রমাণ করতে পারবেন তো?

মিরাজুল : ব্রাদার্স আমাকে ম্যাচ টাইম দিয়েছে। তবে আমি আমার পজিশনে খেলতে পারিনি। স্ট্রাইকার পজিশনে বাংলাদেশিদের খেলার সুযোগ একেবারেই নেই। কারণ এই পজিশনে ক্লাবগুলো বিদেশিদের ওপর নির্ভর করে। এই পজিশনে ঘরের মাঠে না খেলার কারণে আমার মনে হয় বাংলাদেশে ভালো স্কোরার মিলছে না। আবাহনী যদি আমাকে সুযোগ দেয়, সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। আবাহনীতে স্থানীয় যারা স্ট্রাইকার আছেন, তাদের সবার জন্যই নিজেদের প্রমাণের বড় একটা সুযোগ এবার। কোচ যদি আমাকে খেলান, চেষ্টা করব।

স্ট্রাইকার হিসেবে আপনার কোনো আইডল আছে?

মিরাজুল : সত্যি বললে, আমি কাউকেই ফলো করি না। একজনকে ফলো করি, সেটা আমি বলতে চাইছি না। তবে অনেকের খেলাই আমার ভালো লাগে।

এই টুর্নামেন্টে গোল করেছেন বলেই বারবার স্ট্রাইকিং পজিশন নিয়ে কথা হচ্ছে। যদিও এখানে আপনি ১০ নম্বর জার্সি নিয়ে খেলেছেন; অর্থাৎ প্লে-মেকার পজিশনে। ফাইনালে নিজে জোড়া গোল করেছেন। তবে সতীর্থ রাহুলকে দিয়ে যে গোলটি করিয়েছেন, সেটা নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। প্রশংসাও শুরু হয়ে গেছে। কোনটা বেশি ভালো লাগে গোল করা নাকি গোল করানো?

মিরাজুল : প্রথমত, ফাইনালের আগে আমার সামনে সুযোগ ছিল সেরা গোলদাতা হওয়ার। তবে সেটা একদমই আমি মাথায় আনিনি; বরং টিমমেটদের বলেছি, আমাকে দিয়ে গোল করানো লাগবে না। আগে আমরা আমাদের দলকে এগিয়ে নিয়ে যাই। তারপর যা হওয়ার হবে। সেরা গোলদাতা হতে পারলাম কি পারলাম না, সেটা পরে দেখা যাবে। আমার নিয়ত ছিল গোল করানোর। সেই চেষ্টাই বেশি করেছি, গোল করার চেয়ে।

ফাইনালে দেখা গেছে, নেইমার জুনিয়রের মতো ড্রিবল করে বক্সে ঢুকে রাহুলকে বল বানিয়ে দিয়েছেন। এই ড্রিবলিংটা কী করে রপ্ত করলেন?

মিরাজুল : আমি বিকেএসপির ছাত্র। প্রথম যখন বিকেএসপিতে ভর্তি হই, তখন একজন খুব উঁচু মানের কোচ ছিলেন চিং নামে। তিনি অনেক স্কিলফুল খেলোয়াড় ছিলেন। জুনিয়র জাতীয় দলেও খেলেছেন। তবে চোটের কারণে বেশিদিন খেলা চালাতে পারেননি। ওনার কাছ থেকে এ ধরনের অনেক স্কিল আমি শিখেছি। নেইমারের এই ট্রেডমার্ক ড্রিবলিংটাও ওনার কাছ থেকে রপ্ত করি।

ফাইনালের আগে আপনারা মাত্র এক দিন সময় পেয়েছিলেন প্রস্তুতি নেওয়ার। যেহেতু ম্যাচটা স্বাগতিক নেপালের বিপক্ষে ছিল, সব মিলিয়ে একটা প্রতিকূল পরিবেশে আপনাদের খেলতে হয়েছে এবং তাদের রীতিমতো বিধ্বস্ত করেছেন। এই ম্যাচের আগে কোচের কী নির্দেশনা ছিল?

মিরাজুল : কোচ (মারুফুল হক) মনস্তাত্ত্বিকভাবে আমাদের নিয়ে কাজ করেছেন ফাইনালের আগে। তিনি একটা কথাই বলেছেন, তোমরা কিন্তু তোমাদের লক্ষ্যের খুব কাছে পৌঁছে গেছ। এখন সবকিছুই তোমাদের হাতে। তোমরা যদি নিজেদের ভালো চাও, তাহলে সেরাটা দিয়ে চেষ্টা করো। আর যদি মনে করো, তোমরা আগাতে চাও না, ফুটবলকে এগিয়ে নিতে চাও না। তাহলে তোমরা তোমাদের মতো খেলো। তবে চাই তোমরা এগিয়ে যাও। তোমাদের মধ্য দিয়ে দেশের ফুটবলও এগিয়ে যাক।

ফাইনালে প্রথম গোলটা ছিল বিশ্বমানের। অসাধারণ এক ফ্রি-কিক থেকে গোল করলেন। এটা নিয়েও নিশ্চয় আলাদা করে কাজ করেছেন?

মিরাজুল : অতিরিক্ত সময় আমি সব সময়ই চেষ্টা করি একটি-দুটি ফ্রি-কিক নেওয়ার। তবে ফ্রি-কিকের প্রতি ঝোঁক ছিল ছোটবেলা থেকেই। বিকেএসপিতে আমাদের একজন স্যার ছিলেন, আনোয়ার স্যার। তিনি শিখিয়েছিলেন কতভাবে ফ্রি-কিক নেওয়া যায়। আর ফাইনালে সেদিন রাহুলের সঙ্গে দুটি পরিকল্পনা করেছিলাম। প্রথমত, বলেছিলাম আমরা দুই জন ফ্রি-কিক করা নিয়ে নাটক করব। দুজনই মারতে চাইব। এরপর বল নিয়ে কাড়াকাড়ি করে একসময় দুজনই সরে যেতে চাইব। সেই ফাঁকেই আমি ফ্রি-কিক নিয়ে একটা চেষ্টা করব। এর আগে ফ্রি-কিকটা পাওয়ার পর নোভা ভাই নিতে চেয়েছিলেন। আমি কোচকে জানাই ফ্রি-কিকটা আমি নিতে চাই। উনিও সায় দিলেন চেষ্টা করলাম প্রথম পোস্টে। শেষ পর্যন্ত কীভাবে যেন গোলটা হয়ে গেল। এই সবকিছুই আল্লাহর ইশারা।

পুরো টুর্নামেন্টে নানাভাবে আপনাকে গোলের উদযাপন করতে দেখা গেছে। কখনো চোখ বন্ধ করে ওপরের দিকে আঙুল দেখিয়েছেন। কখনো সতীর্থ রাহুলের সঙ্গে হাঁটু ভাঁজ করে বসে একটা অঙ্গভঙ্গি করেছেন। প্রথম ম্যাচে তো ছাত্র আন্দোলনে নিহত আবু সাঈদ ও মুগ্ধকে ট্রিবিউট জানিয়ে অন্য জার্সি পরেছিলেন। উদযাপনের এই বাহারি বিষয়টি কেন?

মিরাজুল : আমি দীর্ঘ ৯ মাস খেলার বাইরে ছিলাম। এই ৯ মাস কিন্তু কেউই আমার খোঁজ নেয়নি। অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলতে পারিনি। তখনো কেউ খোঁজ নেননি। একটা পরিকল্পনা ছিল, যদি আবার খেলার সুযোগ পাই এবং গোল করি, তবে প্রথম আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাব। এ কারণেই গোল করে আল্লাহর দিকে শূন্যে আঙুল তুলে তাকে স্মরণ করেছি। আর রাহুলের গোলের পর অভিনব কায়দায় চেয়েছি ছাত্র আন্দোলনে সব শহীদকে ট্রিবিউট জানাতে। আর গ্রুপপর্বের প্রথম ম্যাচে গোলের পর সেটা করেছিলাম আবু সাঈদ ভাই ও মুগ্ধ ভাইয়ের প্রতি সম্মান জানাতে। আমার বন্ধু ইমরান টি-শার্টে এটা লিখে দিয়েছিল। চিন্তা ছিল গোল করার পর এটা করবই, ভাইদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাব। তাতে যদি কার্ড দেখতে হয়, হোক।

বিকেএসপিতে ভর্তির গল্পটা শুনতে চাই...

মিরাজুল : ছোটবেলা আমি ভীষণ দুষ্টু ছিলাম। সবাই বলত আমাকে মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দেবে। তবে ফুটবলটা আমি ছোটবেলা থেকেই ভালো খেলতাম। একদিন বড় ভাই খবরের কাগজে বিকেএসপিতে ভর্তির বিজ্ঞপ্তি দেখে সেটা নিয়ে আসেন। মেজো ভাইও আমাকে বিকেএসপিতে ভর্তির ব্যাপারে সায় দেন। এরপরই আমি ভর্তি হই ক্লাস সেভেনে।

এলিট অ্যাকাডেমির মাধ্যমে পেশাদার লিগে খেলার ফলে বিকেএসপি তো আপনাদের কয়েকজনকে বহিষ্কার করে দিয়েছিল। সেই সমস্যা কি মিটেছে?

মিরাজুল : না, এখনো মেটেনি। আমাদের বিকেএসপি থেকে জানানো হয়েছে, আমাদের আবারও ভর্তি নেবে। আমরা চিঠি দিয়েছিলাম। দশম শ্রেণিতে পরীক্ষাও দিয়েছিলাম। তবে বহিষ্কৃত হওয়ায় সার্টিফিকেট পাইনি। তা ছাড়া এলিট অ্যাকাডেমির মাধ্যমে যেহেতু আমরা ক্লাবে খেলার সুযোগ পেয়েছিলাম। কথা ছিল বিকেএসিপকে ৪০ হাজার টাকা দিলে তারা শাস্তি তুলে নেবে। সেই টাকা না থাকায় সেটা জমা দিতে পারিনি। তাই সার্টিফিকেটও পাইনি। ভর্তিও হতে পারিনি কোথাও। এটা অনেক বড় আক্ষেপ। কারণ পড়ালেখাটা তো করতেই হবে। কদিন আর ফুটবল খেলব। আল্লাহ না করুক কালকে যদি আমার পা ভেঙে যায়, কেউই খোঁজ নেবে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত