রাওয়ালপিন্ডির আকাশে তখন মেঘ জমতে শুরু করেছে। মেঘ জমেছে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের মনেও। পরাজয় থেকে তারা মাত্র ৪ রান দূরে। স্ট্রাইকে সাকিব আল হাসান। সাজঘরের বারান্দায় নাজমুল হাসান শান্তদের যেন তর সইছে না। সবাই উঠে দাঁড়িয়েছেন। অপেক্ষা আর কয়েকটি মুহ‚র্তের। লেগ স্পিনার আবরার আহমেদের করা বলটি সাকিবের ব্যাটের নিখুঁত ছোঁয়ায় কভার অঞ্চল দিয়ে ছুটল সীমানার দিকে। অপরপ্রান্তে থাকা মুশফিকুর রহিম মুষ্টিবদ্ধ হাত শূন্যে ছুড়ে গর্জে উঠলেন। লাউড স্পিকারে বেজে উঠল ‘লাল-সবুজের বিজয় নিশান...’। পাকিস্তানের মাটিতে সগর্বে উড়তে লাগল লাল-সবুজের পতাকা। তৈরি হলো এক নতুন ইতিহাসের। বাইশ গজে দাঁড়িয়ে সেই ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠলেন সাকিব আর মুশফিক।
একজনের টেস্ট ক্যারিয়ার ১৭ বছরের, অন্যজনের ১৯ বছর। দীর্ঘ পথচলায় বাংলাদেশের ক্রিকেটের এই দুই মহাতারকা সাক্ষী হয়েছেন অসংখ্য হতাশার। কতবার যে তীরে এসে তরী ডুবেছে, কতবার চাপের মুখে দলকে ভেঙে পড়তে দেখেছেন। বিব্রতকর হারের পর মাঠ ছেড়েছেন নতমুখে! জয় তো খুব সামান্যই এসেছে। ২৪ বছরে ১৪৪টি টেস্ট খেলা বাংলাদেশ জিতেছে মাত্র ২১টি, যার ৮টিই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। গতকালের আগ পর্যন্ত লাল বলে বিদেশে স্মরণীয় জয় বলতে ছিল নিউজিল্যান্ডকে মাউন্ট মঙ্গানুই টেস্টে হারানো। ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে যে টেস্ট সিরিজটি জিতেছিল বাংলাদেশ, সেটি ছিল দেশের বাইরে প্রথম কোনো টেস্ট সিরিজ জয়। সেই ‘প্রথমেও’ নায়ক ছিলেন সাকিব আল হাসান।
বোর্ডের সঙ্গে চুক্তি সম্পর্কিত বিবাদের কারণে ওই সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম সারির ক্রিকেটাররা খেলেননি। সুযোগটা দারুণভাবে কাজে লাগিয়ে সেন্ট ভিনসেন্টে প্রথম টেস্ট ৯৫ রানে জিতে নেয় টিম টাইগার। সেন্ট জর্জে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় টেস্ট জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় ২১৫ রানের। সেই লক্ষ্যে ব্যাটিংয়ে নেমে ৬৭ রানে নেই ৪ উইকেট! এ সময় ব্যাট হাতে রুখে দাঁড়ালেন প্রথমবার টেস্ট অধিনায়কত্ব পাওয়া সাকিব। খেললেন ৯৭ বলে ১৩ চার ও ১ ছক্কায় অপরাজিত ৯৬ রানের ইনিংস। কেমার রোচকে লং অনের ওপর দিয়ে উড়িয়ে সাকিবই দেশকে এনে দিয়েছিলেন বিদেশের মাটিতে প্রথম টেস্ট সিরিজ জয়ের গৌরব। কিন্তু প্রতিপক্ষ দুর্বল হওয়ায় সেই সিরিজ জয়ের মহিমান্বিত হয়েছিল অনেকটাই। প্রয়োজন ছিল বড় কোনো মঞ্চে নিজেদের প্রমাণের।
১৫ বছর পর যখন সেই মঞ্চ তৈরি হলো, সাকিব তখন ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে। এই সাকিব ক্রিকেটীয় মানসিকতায় অনেক পরিণত। ফিটনেসে এখনো নেই বয়সের ছাপ। শুধু বাম চোখটাই মাঝেমধ্যে বিদ্রোহ করে বসে। ব্যাটিংয়ে সমস্যা হয় বিস্তর। তার ওপর চারদিক থেকে ধেয়ে আসা সমালোচনা তীরের মতো বিঁধতে থাকে। ক্যারিয়ার জুড়ে তো কম সমালোচিত হননি সাকিব। তবে এবার তাকে ঘিরে যা কিছু হচ্ছে, সে তুলনায় আগেরগুলো নিতান্তই তুচ্ছ। কিন্তু তিনি তো সাকিব। চাপের মুখে ঘুরে দাঁড়ানো তার কাছে ডাল-ভাত। ম্যাচের উত্তেজনা ছাপিয়ে আবরার আহমেদের সঙ্গে ‘টাইমড আউট’ নিয়ে দুষ্টুমি করা একমাত্র তার পক্ষেই হয়তো সম্ভব। অতঃপর গতকাল যখন ইতিহাস গড়ার ক্ষণ এলো, সেই আবরারকেই পেলেন বল হাতে। পঞ্চম দিনের ক্ষতবিক্ষত উইকেটের চরিত্র বুঝে শুরু থেকেই তিনি ব্যাট করছিলেন ঠাণ্ডা মাথায়, দেখে-শুনে।
অনতিদূরে হাতছানি দিচ্ছিল ইতিহাস। এমন সুযোগ তো আর বারবার আসে না। পূর্ণশক্তির দলকে তাদের মাটিতে হোয়াইটওয়াশ করাটা স্বপ্নের মতো ব্যাপার। তাই ব্যাট হাতে সেই ছটফটে, আগ্রাসী সাকিবকে দেখা গেল না। জয় যখন দুয়ারে চলে এসেছে, তখনো তিনি শান্ত সমুদ্র। চাইলেই লং অন দিয়ে উড়িয়ে দিতে পারতেন আবরারকে। কিন্তু সে পথে তিনি হাঁটলেন না। নিখুঁত কভার ড্রাইভে মাটির সঙ্গে মিতালি গড়ে বল চলে গেল সীমানার বাইরে। তারপরও সাকিব যেন ধ্যানমগ্ন ঋষি। নেই উদযাপনের বাহুল্য, জড়িয়ে ধরলেন সতীর্থ মুশফিককে। সাক্ষী হলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের আরও একটি ‘প্রথম’ এর। ১৫ বছর আগের সেই সিরিজ জয়ের অল্প দূরে থাকতে আউট হয়ে গিয়েছিলেন মুশফিক। এবার দুজনে মিলেই ৩২ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে দেশকে এনে দিলেন গৌরব।
ম্যাচ শেষে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত জানালেন, তাদের প্রত্যাশা ছিল এই দুজনের হাত ধরেই আসুক সিরিজ জয়, ‘মুশফিক ভাই, সাকিব ভাই যখন ব্যাটিং করছিলেন, তখন আমরা সবাই ড্রেসিংরুম থেকে চাচ্ছিলাম উনারাই খেলাটা শেষ করুন। এত বছর ধরে উনারা দেশের হয়ে খেলছেন, কত ম্যাচ জিতিয়েছেন, তবে এ ধরনের ম্যাচ জেতানো অনেক স্পেশাল। আমরা খুবই খুশি।’ নাজমুলদের এই খুশি ছড়িয়ে পড়েছে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল জুড়ে। রক্তক্ষয়ী আন্দোলন, প্রলয়ঙ্করী বন্যার নির্মম আঘাতের মধ্যে দেশের মানুষের মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তুলেছেন সাকিবরাই। চোখ ধাঁধানো সেঞ্চুরি করে ম্যাচের সেরা লিটন দাস, অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে সিরিজসেরা মেহেদী মিরাজ, কিন্তু বিজয়ের চিত্রপটে তুলির শেষ আঁচড়টা দিয়েছেন সাকিবই।
