আদরের ছেলে ফরহাদ হোসেন যে আর নেই তা এখনো বিশ্বাস হয় না বাবা গোলাম মোস্তফার। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছেলে ফিরবে, বাবা বলে ডাক দিবে বলে পথ চেয়ে থাকেন হতভাগ্য এই বাবা। গত ৪ আগস্ট আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফরহাদ হোসেন।
সন্তান হারানোর যন্ত্রণা বুকে নিয়ে গোলাম মোস্তফা বলেন, আমার এখনো বিশ্বাস হয় না ফরহাদ নেই। প্রতি ক্ষণে মনে হয়, সে ছাত্রবাসে না হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে। যে কোন সময় বাড়ি ফিরে আমাকে বাবা বলে ডাক দেবে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে ফরহাদ ছিলেন তৃতীয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের (২১-২২) সেশনের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। নগরীর একটি মেসে থেকে লেখাপড়া করতেন। কোটা সংস্কার দাবিতে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন কর্মসূচিতে শুরু থেকেই নিয়মিত অংশ নিতেন। গত ৪ আগস্ট বিকালে ছাত্র-জনতার একটি মিছিলের সাথে চট্টগ্রাম ওয়াসা এলাকায় অবস্থান করেছিলেন। হঠাৎ মিছিলের ওপর পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা হামলা শুরু করলে মাথার পেছনে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন ফরহাদ।
ফরহাদের সহপাঠী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ছাত্র তৈাফিক বলেন, ফরহাদ ছিল অসাধারণ মেধাবী। সে ছিল একটু শান্ত ও চুপচাপ স্বভাবের। পরীক্ষায় সবসময় ভাল রেজাল্ট করত। তার বাড়ি মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলায়।
ছেলের সম্পর্কে জানতে চাইলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘আমার দুই ছেলে দুই মেয়ের মধ্যে ফরহাদ ছিল তৃতীয়। তার স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে সে একজন মানবিক মানুষ হবে। স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবে তার পরিবারের, হাল ধরবে সংসারের। কিন্তু তার সে স্বপ্ন নিমিষেই শেষ হয়ে যায় ঘাতক পুলিশের একটি বুলেটে।’
তিনি বলেন, ‘আমি একজন কাভার্ডভ্যান ড্রাইভার। সংসার চালাতে খুব কষ্ট হলেও ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করানোর ব্যাপারে আমি খুব আন্তরিক ছিলাম। বড় ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।’ ফরহাদের বড় ভাই আনোয়ার হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একাউন্টিং বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।
বড় অফিসার হয়ে পরিবারের হাল ধরার স্বপ্ন দেখা ভাই এভাবে চলে যাবে তা স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি ভাই আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ফরহাদের ইচ্ছে ছিল বড় হয়ে একজন বড় অফিসার হবে। আমার ভাই বলতো— লেখাপড়া শেষ হলে চাকরি করে আমাদের সংসারের সব দুঃখ-দুর্দশা দূর করবে। কিন্তু সে স্বপ্নগুলো পুলিশের একটি বুলেটে নিমিষেই ধূলোয় মিলিয়ে গেল।
ছেলে হারানোর কষ্ট থাকলেও ফরহাদের আত্মত্যাগ এবং সাহসিকতার জন্য গর্ববোধ করেন বাবা গোলাম মোস্তফা। ফরহাদের মৃত্যুর জন্য তারা স্বৈরচারী সরকারের স্বেচ্ছাচারিতাকে দায়ি করেন তিনি।
ফরহাদের বাবা ও ভাইয়ের আশা, যেসব মানুষের আত্মত্যাগের মাধ্যমে স্বৈরাচারী সরকারের পতন হয়েছে তাদের পরিবারের প্রতি যেন সদয় দৃষ্টি রাখে অন্তর্বর্তী সরকার। তাদের ত্যাগ-আত্মদানের মাধ্যমে অর্জিত এই বাংলাদেশ যেন বৈষম্যহীন হয় সেদিকে নজর দেওয়ার প্রত্যাশা তাদের। সেইসাথে আন্দোলনে যারা নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়েছে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন তিনি।
প্রসঙ্গত, ৪ আগস্ট চট্টগ্রামে নিহত হওয়ার পর ওই রাতেই ফরহাদের মরদেহ গ্রামের বাড়ি মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলায় নেওয়া হয়। সেখানেই ৫ আগস্ট সকাল ১১টায় তার দাফন হয়। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের।
