লক্ষ্মীপুরে বিশুদ্ধ পানির সংকট

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০১:১৭ পিএম

প্রায় দেড় মাস যাবত বন্যা এবং অতিবৃষ্টিতে প্লাবিত প্রায় দেড় লাখ মানুষ। পানিবন্দি মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। নামছে না পানি। ফের গত দুদিনে পানি বাড়ছে। খাবারের সংকট কাটলেও কাটেনি বিশুদ্ধ পানির সংকট। দেড় লাখ পানিবন্দি মানুষের বিশুদ্ধ খাবার পানি নেই বললেই চলে। বাড়ি বাড়ি কিছু পানির টিউবওয়েল থাকলেও সেগুলো রয়েছে বন্যার পানির নিচে। খাবার ও গোসলের পানির অভাব ও মহা সংকট দেখা দিয়েছে লক্ষ্মীপুরের রামগতি-কমলনগরে বেশ কিছু ইউনিয়নের পানিবন্দি মানুষের বাড়ি-ঘরে। 

সরেজমিনে দেখা যায়, কমলনগরের চর কাদিরা ইউনিয়নে প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। পুরো এলাকার চারিদিকে পানিতে প্লাবিত বাড়ি-ঘর। ঘরে ভিতরে পানি থৈ থৈ করছে। রান্নার চুলা নেই, ঘরের ভিতরে চকির উপর চকি দিয়ে গ্যাসের চুলায় রান্না করে কিছু পরিবার জীবন চালাচ্ছে। কিছু পরিবারে ত্রাণের উপর নির্ভর। পানিতে মানুষ পায়খানা প্রস্রাব করছে। পানি দূষিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। পানিতে স্বাভাবিক মানুষ নামলে তাদের শরীর চুলকাতে শুরু করে। দেখা যায়, পুরুষ ও মহিলা হাটু পরিমাণ পানির মধ্য থেকে কলসি করে পানি নিচ্ছে। কলা গাছের ভেলা দিয়ে বাড়ি থেকে যাওয়া-আসা চলছে।

আব্দুল আজিজ জানান, পানিবন্দি থাকার ভোগান্তি আর ভালো লাগে না। কতদিন পানিতে থাকা যায়? ঘরে-বাহিরে হাটু পরিমান পানি রয়েছে। ৫ পরিবারে ৩০জন সদস্যের খাবার জোগাতে হিমশিম খাচ্ছি। বাড়ির বিশুদ্ধ পানির কল দূষিত পানির নিচে, খাবার পানি দুর-দুরান্ত থেকে আনতে হচ্ছে। খাবার পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। 

পানিবন্দি রফিক, আজিজ, আব্দুল গনি, জাহানারা জানান, বাড়ির সব চুলা পানির নিচে, দেড় মাস পানিবন্দি রয়েছি। ঘরের চকির উপর টিনের চুলায় রান্না করছি। 

স্থানীয় আখতার মাহমুদ জানান, বিগত দেড় মাস বন্যা এবং অতিবৃষ্টির পানিতে চর কাদিরার মানুষ দুর্ভোগ পোড়াচ্ছে। পানিতে বাড়ি-ঘর ডুবে গেছে। রান্না নেই, খাবার নেই, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নেই। খাবার পানির অভাব দেখা দিচ্ছে। ত্রাণ বা সহযোগিতার কিছু খাবার থাকলেও বিশুদ্ধ খাবার পানি নেই। বিশুদ্ধ পানি সংকটে ভুগছে পানিবন্দি মানুষ। কিছু পানির টিউবওয়েল থাকলেও পানি থাকায় বিশুদ্ধ পানি নেওয়া যাচ্ছে না। পানির জন্য দূর-দুরান্ত থেকে এনে খাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। 

নোয়াখালীর ভাষায় কথা বলেন মো.শাহাজান তিনি জানান, হানি বিষাক্ত, হানি ঘাঁত লাইগ'লে খাইজ্জা চুলক্যা, ঠোয়ার মত বিচি উঠে। এমন রোগ বার অইছে ঠোয়া হুঠি বির'বিরা। হানি নামে না, বহুত মানষ হানির তলে। বাড়ি-ঘর ডুবা, মানষ আশ্রয় কেন্দ্রে এমি-ওমি রইছে। এখন পর্যন্ত হানি কোমড় হর্যন্ত, চাষবাস বেক শেষ। এখন আর কোনো উপায় বুদ্ধি নাই, মানষ আত্মহারা হই রইছে, চইলবার মতন উপায় নাই, খাওন নাই, দাওন নাই, সব এ অবস্থায় আছে চর কাদিরার মানষ।

মইজল হক জানান, পানিতে বাড়ি-ঘর ডুবে গেছে। প্রস্রাব-পায়খানা সব পানিতে করতে হয়। পানি দূষিত ও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পানিতে নামলে গা চুলকা, গায়ে বিচি-বাছরা উঠে। বাচ্চারা বেশি সমস্যায় পড়ছে। জ্বর-সর্দি, এলার্জি, চুলকানি, চর্ম রোগ দেখা দিচ্ছে। 

রামগতির খোকন মাঝি জানান, চর পোড়াগাছা ও চর বাদাম ইউনিয়নে প্রায় ৫০হাজার মানুষ পানিবন্দি। তাদের অবস্থা নাজুক। শুকনো খাবার খেয়ে বেঁচে রয়েছে। টানা দেড় মাস পানি নামছে না। মানুষের বাড়ি-ঘর পানিতে প্লাবিত। তবে দুঃখের বিষয় মানুষের খাবার কিছু ফেলেও গবাদি পশুর খাবার নেই। খাবারে বিশুদ্ধ পানির প্রচুর সংকট দিন দিন দেখা দিচ্ছে। পানিবাহিত রোগ-জীবানু ছড়িয়ে পড়ছে। মানুষের গায়ে বিচি, চুলকানি, এলার্জি, চর্ম রোগের দেখা মিলছে। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, টানা বন্যায় কবলিত হয়েছে রামগতি-কমলনগরের দেড় লাখ মানুষ। চর কাদিরা, চর পোড়াগাছা, চর বাদাম, চর আগলী, চর রমিজ, চর গাজি, চর আব্দুল্লাহ, তোরাবগন্জ, চরলরেন্স ইউনিয়নের মানুষ পানিতে আটকা পড়ে মানবেতর জীবন টানছে। 

তবে খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, প্রশাসনিক, এনজিও, স্থানীয় ডাক্তার, কিছু ফাউন্ডেশন পানিবাহিত চুলকানি, এলার্জি, চর্ম রোগের জন্য ফ্রি মেডিকেল টিম করে পানিবন্দি মানুষের সেবা এবং ঔষধ দিচ্ছে। মীর ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মীর ফিরোজ রাইহান জানান, তিনি বন্যা কবলিত মানুষের জন্য ত্রাণ সহায়তা দিয়েছেন। পানিবন্দি মানুষ দূষিত পানিতে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তাদের চিকিৎসা সেবায় ফ্রি মেডিকেল টিমে কাজ করছে। ত্রাণ এবং ফ্রি মেডিকেল টিম সেবা চালু রাখবেন। স্থানীয় ডিএমএফ চিকিৎসক মো.দাউদ সিদ্দিকী, প্রভাকর মন্ডল, মো.মোবারক হোসেন, মো.শাহাজান সব সময় মেডিকেল টিমে চিকিৎসা দিচ্ছে মেডিসিনসহ। এদিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স তাদের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দ্বারা পানি বন্দি রোগীদের চিকিৎসা সেবা সবসময় চালু রেখেছে। 

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা.কামনাশিস মজুমদার জানান, রামগতিতে প্রায় এক লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। পানি বাড়ি-ঘর থেকে নামছে না। এতে পানি দূষিত হচ্ছে। মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। হাসপাতালে প্রতিনিয়ত ২০০-২৫০জন রোগী ভিড় করছে। বেশি রোগী চর্ম, এলার্জি, চুলকানিতে আক্রান্ত হচ্ছে। 

কমলনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুচিত্র রন্জন দাস জানান, বন্যার পানিতে ভুগছে প্রায় অর্ধ লাখ মানুষ। টানা পানিতে প্লাবিত। পানি কমছে না। পানি সমতল আকারে রয়েছে। মানুষ বন্যার পানিতে নানান রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। রোগ নির্ণয়ে তাদের বিভিন্ন মেডিকেল টিমে কাজ করছে। তবে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিচ্ছে। পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট দেয়া হচ্ছে। পানি বাহিত রোগে ডায়রিয়া, চর্ম রোগ বেশি দেখা দিচ্ছে। মানুষকে সব দিক দিয়ে সচেতন করা হচ্ছে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত