সেনাবাহিনীকে দুই মাসের জন্য ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৬:৫০ এএম

রাজধানীসহ সারা দেশে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কমিশনপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দিয়েছে সরকার। গতকাল মঙ্গলবার এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এর ফলে ফৌজদারি কার্যবিধির বিভিন্ন ধারায় ছোটখাটো নানা অপরাধ বিবেচনায় নিয়ে বিচার করতে পারবেন তারা।

‘দ্য কোড অব ক্রিমিন্যাল প্রসিডিউর, ১৮৯৮’-এর ১২(১) ধারা অনুযায়ী, প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ হতে ৬০ দিন (২ মাস) পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত বলবৎ থাকবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সেনাবাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতার বিষয়টি নিশ্চিত করে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পরিচালক লে. কর্নেল সামি উদ দৌলা চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকার যেভাবে চাইবে আমরা সেভাবেই কাজ করব। সুনির্দিষ্টভাবে কোনো ক্ষেত্রে এ ক্ষমতা ব্যবহার করা হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিস্তারিত আমরা সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানাব।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের সামনে এখন প্রধান দুই চ্যালেঞ্জ। একটি অর্থনীতির রুগ্ণ অবস্থার উত্তোরণ। আরেকটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি। অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নে ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা সরকারকে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না সরকার। এ পরিস্থিতিতে সরকারের এই উদ্যোগ ভালো। কিন্তু সেনাবাহিনীকে এ বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ সতর্কভাবে করতে হবে।

ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা হচ্ছে বিচারের মাধ্যম কাউকে তাৎক্ষণিক শাস্তি দেওয়া। বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটদের বাইরে ফৌজদারি কার্যবিধিতে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে আংশিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, ভ্রাম্যমাণ আদালতে তারা লঘু শাস্তি দিতে পারেন।

ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়ার কারণে এখন থেকে সেনাসদস্যরা তল্লাশি চালানো, জব্দ করা, গ্রেপ্তার করার মতো সিদ্ধান্ত বা আদেশ দিতে পারবেন।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সেনাবাহিনীর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ‘ফৌজদারি কার্যবিধির, ১৮৯৮ এর ৬৪, ৬৫, ৮৩, ৮৪, ৮৬, ৯৫(২), ১০০, ১০৫, ১০৭, ১০৯, ১১০, ১২৬, ১২৭, ১২৮, ১৩০, ১৩৩ ও ১৪২ ধারার অপরাধগুলো বিবেচনায় নিতে পারবেন।

সাবেক সচিব আবদুল আউয়াল মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার যেকোনো ব্যক্তিকে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দিতে পারে। অতীতেও এমন হয়েছে। সেনাবাহিনীতে সাধারণত ক্যাপ্টেন ও মেজর লেভেলের অফিসারদের এ ধরনের ক্ষমতা দেওয়া হয়। এতে সংশ্লিষ্টরা ছোটখাটো বিচার করার পাশাপাাশি হেফাজতেও নিতে পারবেন।’

কী পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর কমিশন্ড অফিসারদের এমন ক্ষমতা দিল সরকার এ প্রশ্নের জবাবে সাবেক এ সচিব বলেন, ‘এটা অর্ডার না দেখে বলা যাবে না। তবে ধারণা করা যায়, চারদিকে যে জটিলতা তা দূর করার জন্য এর কোনো বিকল্প ছিল না। কেউ কাউকে মানছে না, পুলিশ নিষ্ক্রিয়, যারা ম্যাজিস্ট্রেট তারা হাত গুটিয়ে বসে আছেন। এ পরিস্থিতিতে সরকারের আর কীইবা করার ছিল।’

কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে ঢাকাসহ সারা দেশে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে গত ১৯ জুলাই রাতে সারা দেশে সেনাবাহিনী মোতায়েন ও কারফিউ জারি করেছিল তৎকালীন সরকার। এরপর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। তিন দিনের মাথায় ৮ আগস্ট শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্র্বর্তী সরকার গঠিত হয়। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এখনো সারা দেশে সেনাবাহিনী মোতায়েন রয়েছে।

এদিকে গত ৪ সেপ্টেম্বর থেকে সরকারের নির্দেশে সারা দেশে যৌথ অভিযান চলছে, যার নেতৃত্বে রয়েছে সেনাবাহিনী। তবে সাম্প্রতিককালে তৈরি পোশাক খাতে অস্থিতিশীলতা, মাজার ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে নানারকম অপরাধ কর্মকান্ডের খবর পাওয়া যাচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুলিশের ভূমিকা অনেকটা নিষ্ক্রিয় দেখা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে সেনাবাহিনীকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সাময়িক সময়ের জন্য। পরিস্থিতির উন্নতি হলে আবার এ ক্ষমতা প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সরকারের কর্মকর্তারা।

আইন বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘সরকার কাকে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দিল এবং কেন দিল এটা অর্ডার না দেখে বলা যাবে না। তবে সরকার এটা দিতে পারে। এতে দোষের কিছু নেই। আতঙ্কগ্রস্ত হওয়ার কিছু নেই। আইন মানতে হবে এবং শৃঙ্খলার সঙ্গে চলতে হবে।’

অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর থেকেই পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে দেশের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ লাগাতার আন্দোলন করেন তাদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া আদায়ে। সেই আন্দোলন ঢাকার বিভিন্ন স্থানের পাশাপাশি সচিবালয়, এমনকি তার ঝাঁজ গড়ায় প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবনের সামনে পর্যন্ত।

সচিবালয়ের ভেতরে আন্দোলনকারীদের ঢুকে বিক্ষোভ করার নজিরও দেখা যায় এই সময়ে। আনসার বাহিনীর সদস্যরাও বিক্ষোভের নামের অরাজকতার সৃষ্টি করেন। কিছুসংখ্যক এইচএসসি পরীক্ষার্থী সচিবালয়ে ঢুকে তাদের পরীক্ষা বাতিলের দাবি আদায় করে নেয়। পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারাও দাবি আদায়ের নামে কাজকর্ম ফেলে বিক্ষোভ-মিছিল করেন। এ ক্ষেত্রে তারা অনেকটাই সফলও হয়েছেন। এর পাশাপাশি হাসপাতালসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে পদ, পদোন্নতি, জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করাসহ নানা অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। কোথাও কোথাও এখনো সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে। এসব কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে।

বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নূর মোহাম্মদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ ধরনের নজির অতীতেও রয়েছে। জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় মনে করছে বলেই সরকার করছে। এ ক্ষমতার কারণে সেনাবাহিনীর কমিশন্ড অফিসাররা বেআইনি জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে হলে যেসব ক্ষমতা সিআরপিসিতে দেওয়া আছে, সেসব তারা ব্যবহার করতে পারবে। সার্চ, সিজার (জব্দ করা) এসব ক্ষমতা। কিছু কিছু অপরাধসংক্রান্ত যাদের সার্চ করা লাগে, অ্যারেস্ট করা লাগে সেই ক্ষমতাগুলো দেওয়া হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় দেশ জুড়ে। থানা, পুলিশ স্থাপনায় হামলা- লুটপাটসহ পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলার কারণে ৫ আগস্টের পর প্রায় এক সপ্তাহের মতো নিষ্ক্রিয় থাকে পুলিশ। পুলিশও নিজেদের বাহিনীতে সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে নেমে কর্মবিরতিতে যায়। এতে করে ভেঙে পড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। সরকারি স্থাপনাগুলোয় হামলা আর লুটপাটের মাধ্যমে এ নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি শুরু হলেও পুলিশ নিষ্ক্রিয় বা আধাসক্রিয় থাকার সুযোগে এটা গড়ায় গণপিটুনিতে মানুষ হত্যা, মাজার ও মন্দির ভাঙার মতো অবিচারিক কার্যক্রমে। সড়কে বিশৃঙ্খল অবস্থা, ছিনতাই ও খুনের ঘটনা বেড়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত