বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন

অর্থসংকটে চিকিৎসা নিয়ে দুশ্চিন্তায় গুলিবিদ্ধ জাবের

  • দেড় ইঞ্চি হাড় ক্ষয়ের কারণে হাঁটুর ব্যালেন্স আসছে না
  • এক মাসে ৯ ব্যাগ রক্ত দিতে হয়েছে জাবেরের
  • গুলিবিদ্ধ পায়ের চিকিৎসায় এক বছর সময় লাগতে পারে
আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৭:৫৭ পিএম

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শুরুর দিকে ১৯ জুলাই পুলিশের স্নাইপারের গুলিতে আহত হন কাজী মো. জাবের হোসেন। দীর্ঘ একমাস হাসপাতালে থাকার পর গত ১৯ আগস্ট তার গুলিবিদ্ধ পায়ের অপারেশন হয়। ২৫ আগস্ট বাড়িতে ফেরেন। বাড়ি আসার পর থেকে অসহ্য যন্ত্রণায় বিছানাতেই তার দিন কাঁটছে। চিকিৎসক বলছেন, হাঁটতে। কিন্তু জাবের পায়ের ব্যালেন্স আনতে পারছেন না। এক মাস পরপর ঢাকায় গিয়ে ডাক্তার দেখাতে হবে।

চিকিৎসক বলছেন, গুলিবিদ্ধ পায়ের চিকিৎসায় ছয় মাস অথবা এক বছর সময় লাগতে পারে। তার বাবা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক এবং নিজে বেকার থাকায় প্রতি মাসে ঢাকায় গিয়ে চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে তাকে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাতে হচ্ছে।

কাজী মো. জাবের হোসেনের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার বটতলী ইউনিয়নের কাশিপুর পশ্চিম পাড়া। তার বাবা আবুল কাশেম স্থানীয় জোড্ডা বাজার পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। জাবের ঢাকায় তিব্বত কোম্পানির একজন সেলসম্যান হিসেবে চাকরি করতেন।

আন্দোলনের সময়ের স্মৃতিচারণ করে জাবের বলেন, ১৯ জুলাই বিকেল ৩টার দিকে যাত্রাবাড়ীর শনিরআখড়া ও কাজলা এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিশাল মিছিলের সামনের সারিতে যোগ দেন তিনি। সে সময় বিভিন্ন ভবন ও সড়কের আড়াল থেকে গুলি ছোড়া হয়। কিন্তু ঠিক কোনো দিক থেকে গুলি আসে বলা যায় না। হঠাৎ করে গুলি আসে একজন করে আহত হন। আমার চোখের সামনে তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়।

তিনি বলেন, মিছিল কিছু দূর অগ্রসর হওয়ার পর আবার এলোপাতাড়ি গুলি আসতে থাকে। এক পর্যায়ে একটি ভবনের আড়ালে চলে যায়। কিন্তু ভবনের আড়ালে চলেও শেষ রক্ষা হয়নি। একটি গুলি বাম পায়ের হাঁটুর উপর বিদ্ধ হয়। পরে জাবের গুলিবিদ্ধ অবস্থায় একটি ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায়। এখানে ২০ মিনিট আহত অবস্থায় পড়ে ছিলাস। এক পর্যায়ে পুলিশ গুলি করতে করতে সামনের দিকে চলে এসে আন্ডারগ্রাউন্ডে আমাকে দেখতে পায়। ওই সময় পুলিশ বের হয়ে আসতে বলে। না হয় গুলি করার হুমকি দেন। জাবের পুলিশকে বলেন, আমিতো গুলি খেয়ে পড়ে আছি। পুলিশকে পায়ের রক্ত দেখায়। তারা আমাকে আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে উদ্ধার করে সড়কে নিয়ে আসে।

‘ওই সময় এক পুলিশ সদস্য তার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তাকে মোবাইলফোনে অ্যাম্বুলেন্স পাঠানোর দাবি করেন। ওই সময় পাশে থাকা এক পুলিশ সেই পুলিশ সদস্যকে ধমক দিয়ে বলেন, সে কি তোর বাপ লাগে, নাকি ভাই লাগে বলে তাকে অনেক বকাঝকা করেন। পরে পুলিশ সদস্যরা একজন পথচারীর নিকট আমাকে তুলে দেন। ওই পথচারী প্রথমে যাত্রাবাড়ী বেসরকারি অনাবিল হাসপাতালে ভর্তি করেন। হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ঢাকা মেডিকেল এক্সরে করার পর পঙ্গু হাসপাতালে পাঠিনো হয়।’

জানা যায়, গুলি জাবেরের বাম পায়ের হাঁটুর এক পাশ দিয়ে ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়। চিকিৎসকরা বলেন, গুলিতে পায়ের দেড় ইঞ্চি হাড় ক্ষয় হয়েছে। পায়ের হাড় গুঁড়া হয়ে যায়। চিকিৎসকরা পায়ের অপারেশনের সময় হাড় ভেঙে গুলি বের করেন। পঙ্গু হাসপতালের চিকিৎসকরা প্রপ্রাথমিক অপারেশনের মাধ্যমে পায়ের জীবাণু বের করেন। পরে হাসপাতালে একমাস থাকার পর গত ২০ আগস্ট চিকিৎসকরা জাবেরের পায়ের ইলিজারভ চূড়ান্ত অপারেশন করেন। পাঁচদিন হাসপাতালে থাকার পর ২৫ আগস্ট ব্যবস্থাপত্র দিয়ে তাকে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া। এক মাসে তাকে নয় ব্যাগ রক্ত দিতে হয়েছে।

গুলিবিদ্ধ জাবের হোসেন বলেন, দেড় ইঞ্চি হাড় ক্ষয় হওয়ার কারণে সহজে হাঁটুর ব্যালেন্স আসছে না। হাসপাতালে তার ওয়ার্ডে গুলিবিদ্ধ আরো ৫৬ জনের অপারেশন হয় বলেও জানান।

তিনি আরও বলেন, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সম্পাদক ও এলাকার ছেলে আসিফ ইকবালের অনুপ্রেরণায় এবং ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের জন্য আন্দোলনের যায়। তার সাথে ছোট ভাই কাজী সাবের হোসেনও আন্দোলনে যোগ দেন।

৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের খবরে পায়ের অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করতে হলেও দেশ নতুনভাবে স্বাধীন হওয়ায় নিজের কাছে আনন্দ লাগছে বলেও জাবের জানান।

তার স্বজনরা জানান, চিকিৎসায় ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে এ পর্যন্ত ১০ হাজার টাকা আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। তার নিজের ৪০ হাজার টাকাসহ এ পর্যন্ত চিকিৎসায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়। প্রতিমাসে একবার হাসপাতালে যেতে হলে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া ১২ হাজার টাকার প্রয়োজন রয়েছে। এছাড়া ওষুধ খরচসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচও রয়েছে। বাবা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। সে নিজে বেকার অবস্থায় রয়েছেন। একমাস পর হাসপাতালে যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া পর্যন্ত নেই। আগামী দিনগুলোর চিকিৎসার ব্যয় নিয়ে তাকে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাতে হচ্ছে।

জাবের হোসেনের বাবা মাস্টার আবুল কাশেম বলেন, আমার চাকরি নাই। ব্যবসা নেই। ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করছে। তার চিকিৎসা ব্যয় এবং আনুষঙ্গিক ব্যয় মেটাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এছাড়া ছেলের সেবা যত্ন করতে গিয়ে আমাদেরকেও নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়। 

জাবের হোসেনের সিরাজুন মুনিরা নামে ৭ মাসের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। স্ত্রী বাপের বাড়িতে অবস্থান করছেন। বিয়ের গত তিন বছর থেকে স্ত্রী সাথে পারিবারিকভাবে তার ঝামেলা চলছে। স্ত্রী অধিকাংশ সময় নিজের বাবার বাড়িতে অবস্থান করছেন। বর্তমানে জাবের গুলিবিদ্ধ হওয়ায় তার সেবা যত্ন করতে হবে বলে তার স্ত্রীও বাবার বাড়িতে চলে যায়। তার মা এবং ভাই-বোন তার দেখাশুনা করছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত