বিগত রেজিম ও পার্শ্ববর্তী দেশের ইন্ধনে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০১:৪১ এএম

লেখক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল নাঈম আশফাক চৌধুরী। গণঅভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশ সম্প্রতি এক বিশেষ কালপর্ব অতিক্রম করছে। এ পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু মোকাবিলার প্রশ্নটি বড় হয়ে উঠেছে। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী

দেশ রূপান্তর : আমরা যখন কথা বলছি, তখন দেশের পার্বত্য অঞ্চল উত্তপ্ত। এখন পর্যন্ত চারজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। আমরা দেখছি, গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে হাসিনা সরকারের পতনের পর এবং অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই দেশে একের পর এক নিরাপত্তা সংক্রান্ত ইস্যু তৈরি হচ্ছে। যেন সরকার পতনের পরপরই পেন্ডোরার বাক্সটি খুলে সবগুলো নিরাপত্তা ইস্যু একের পর এক তৎপরতা দেখাচ্ছে। সংখ্যালঘু, মাজার, মব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা, গত শুক্রবার বায়তুল মোকাররমেও নামাজ পড়ানো নিয়ে মারামারি হতে দেখলাম। পার্বত্য অঞ্চলের ঘটনাকে সামনে রেখে পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

নাঈম আশফাক চৌধুরী : আমি বলব যে রেজিম গত ১৫ বছর ধরে পুরো প্রশাসন এবং অন্যান্য জায়গায় তার লোকজনকে দিয়ে যেভাবে সাজিয়েছে- একদম টপ লেভেল থেকে শুরু করে একদম গ্রাসরুট পর্যন্ত, সব জায়গায় এখনো তাদের লোকজনই বিদ্যমান। এর সঙ্গে পার্শ্ববর্তী দেশ, বিশেষ করে তাদের গোয়েন্দা সংস্থার ইন্ধন থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু না।

দেশ রূপান্তর : তেমন একটা আলাপ তো সবসময়ই থাকে, এই বিশেষ মুহূর্তে তাদের ইন্ধনের কথা উল্লেখ করার বিশেষ কোনো কারণ কি আছে?

নাঈম আশফাক চৌধুরী : আচ্ছা, কেন আমি ভারতের কথা বললাম দেখেন, আপনি পার্বত্য অঞ্চলের ঘটনাকে সামনে রেখে তো প্রশ্নটা করেছেন; আমাদের দীঘিনালায় সংঘাত ও আগুন দেওয়ার ঘটনার দুই ঘণ্টার ভেতরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিন্দা জানিয়েছে। একটা দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে ঘটনার দুই ঘণ্টার ভেতরে আরেকটি দেশ এভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে এটা আন্তর্জাতিক শিষ্টাচারের দিক থেকে দুদেশের সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে কখনই ভালো কিছু না। আজ বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যদি নিন্দা জানিয়ে বলে, ভারতের মনিপুরে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা সেখানকার খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের লোকেদের মেরেছে কিংবা কুকি জনগোষ্ঠীর এক মেয়েকে পাশবিক নির্যাতন করে তাকে বস্ত্রহীন করে রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়েছে, এর যদি নিন্দা জানাত সেটা কি শোভনীয় হতো? আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কখনই না। কখনই এক দেশের আরেক দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর কথা নয়। কিন্তু ভারত এটা করে যাচ্ছে আগের রেজিমের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে। ভারতের এই আচরণই তো একটা ইন্ধন। এছাড়া শুরুতেই যেটা বললাম যে, প্রশাসন থেকে শুরু করে সব জায়গাতে আগের রেজিমের যেসব লোকজন আছে তাদের দিয়েই এসব করানো হচ্ছে, উসকানি দেওয়া হচ্ছে। উদ্দেশ্য বর্তমান সরকারকে অস্থিতিশীল করে রাখা এবং অন্তর্বর্তী সরকারকে যেন ব্যর্থ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। আমার আশঙ্কা সামনে এসব আরও হবে।

দেশ রূপান্তর : সম্প্রতি ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং সেনাবাহিনীকে যুদ্ধপ্রস্তুতি নেওয়া প্রসঙ্গে বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করেছেন। আবার আমাদের পার্বত্য এলাকার সাম্প্রতিক ঘটনার পর ত্রিপুরার এক মন্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি লিখেছেন। এসব ঘটনা কীভাবে দেখছেন?

নাঈম আশফাক চৌধুরী : আমি যদি সেভাবে বিষয়টাকে ব্যাখ্যা করি যে, একজন যার এস্পাইরেশন আছে রিজিওনাল পাওয়ার হওয়ার সেই রিজিওনাল পাওয়ার হওয়ার যে স্বপ্ন যিনি বা যারা দেখছেন তাদের দ্বারা এই ধরনের বক্তব্য কোনো অবস্থাতেই কাম্য নয়। আমরা যদিও বলি যে বাংলাদেশের চারদিকে ভারত কিন্তু এট দ্যা সেইম টাইম এটাও বিবেচনার যোগ্য যে ভারত ইজ সারাউন্ডেড বাই অল হস্টাইল নেইবারস। তো তার আগে কি তার অবস্থা এরকম ছিল? ছিল না। নেপালের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক ছিল, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ছিল, মালদ্বীপ, ভুটান, বাংলাদেশের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল। পাকিস্তানের কথা বাদ দিলাম। কিন্তু বাকি দেশগুলোর সঙ্গে কিন্তু ভালো সম্পর্ক ছিল বলেই সার্ক তৈরি হতে পেরেছে এবং সার্ক কার্যকর হচ্ছিল। কিন্তু আস্তে আস্তে কী হলো? এখন যেটা হয়েছে ইউ হ্যাভ মেইড অল ইওর নেইবার এস আ হস্টাইল কান্ট্রি। কেন হলো? দুটো দেশের সম্পর্ক ইজ নট অনলি গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট, ইট হ্যাজ টু বি পিপল টু পিপল। অর্থাৎ জনগণের সঙ্গে জনগণের যদি সম্পর্ক না তৈরি করা যায় তাহলে সেটা সাসটেইনেবল হয় না। আপনি যদি কোনো পার্টিকুলার দলের সঙ্গে সম্পর্ক করেন, পার্টি ডাজ নট রিপ্রেজেন্ট দ্যা হোল কান্ট্রি, পার্টি ডাজ নট রিপ্রেজেন্ট দ্যা হোল নেশন অর দ্যা পিপল। সো আপনি একটা দলের  সঙ্গে সম্পর্ক করে হয়তো নিজেদের স্বার্থে কিছু চুক্তি করে ফেলবেন কিন্তু সেই চুক্তি কখনই সাসটেইনেবল হয়নি, হবেও না। ভারতের এই ভুলটা শুধরানোর সময় চলে এসেছে।

দেশ রূপান্তর : ভারতের মণিপুরের কথা তো আপনি উল্লেখ করলেন, এর প্রভাব কি বাংলাদেশে আসতে পারে?

নাঈম আশফাক চৌধুরী : মণিপুরে যে জিনিস হচ্ছে এথনো রিলিজিয়াস কনফ্লিক্ট। ইন্ডিয়ার যেকোনো জায়গায় বিভাজন বা মাইনোরিটির ওপরে যে সাপ্রেশন সেটা ভয়াবহ। আমরা জানি ভারতে মুসলমানদের কী রকম সাপ্রেস করে রাখা হয়েছে। গরু খাওয়ার জন্য পিটিয়ে মেরে ফেলেছে, এ রকম ইনসিডেন্ট তো আনবিলিভেবল। মণিপুরে যেটা হচ্ছে সেটা মেইথি এবং কুকিদের মধ্যে। তাদের গ-গোলটা অনেক পুরনো। কুকিদের যে রুট সেটা বাংলাদেশের বান্দরবানেও আছে সে রকমভাবে মিজোরামে আছে, মিয়ানমারেও আছে। আপনি মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি জানেন। মিয়ানমারের চারদিকে এরা ছড়িয়ে আছে। তো তার জ্ঞাতিভাই যখন মণিপুরে আক্রান্ত হচ্ছে, অস্ত্র সেখান থেকে আসা কিন্তু অস্বাভাবিক কিছু নয়। আবার এখানে আমাদের বান্দরবানের কুকিদের কাছে আসার সম্ভাবনাকেও আমরা উড়িয়ে দিতে পারি না। সেই সূত্রে মণিপুরের যে গ-গোল হচ্ছে সেটার ইমপ্যাক্ট আমাদের দেশেও সম্ভাবনা আছে। আমাদের হিলট্র্যাকে জেএসএফ আছে, ইউপিডিএফ আছে। তাদেরও আর্মড ক্যাডার আছে, তারা আর্মস আহরণের জন্য বিভিন্ন সোর্স থেকে আনতে চায়। এটাও একটা গুড সোর্স হয়ে যাবে ইন দ্যা নেইম অব কুকি, অস্ত্রগুলো সেখান থেকে আনতে পারে।

দেশ রূপান্তর : অনেকে এই অঞ্চলে একটা খ্রিস্টান রাষ্ট্রের কথা বলছে। আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

নাঈম আশফাক চৌধুরী : আমি খুব বেশি সাপোর্ট বা সম্ভাবনার কথা বলব না। এখন পর্যন্ত ঐরকম পরিস্থিতি তৈরি হয়নি যে এখানে একটা খ্রিস্টান রাষ্ট্র তৈরি হয়ে যাবে। এই যুগে এটা মনে হয় একটু ডিফিকাল্ট।

দেশ রূপান্তর : পার্বত্য অঞ্চলের পরিস্থিতি সামলাতে আপনার পরামর্শ কী? 

নাঈম আশফাক চৌধুরী : আমি মনে করি পরিস্থিতি সামলাতে রাসটিক অ্যাকশন নেওয়া উচিত। পুলিশের ক্ষেত্রে তো আমরা জানি তারা এখন ইনএফিশিয়েন্ট, কাউন্ড অব ইনঅ্যাক্টিভ এবং সব জায়গাতেই এক রকম নন-কোঅপারেশন আমরা দেখতে পাচ্ছি। যে ইনএফিশিয়েন্ট এবং নন-কোঅপারেটিভ, তাকে রেখে আমার লাভ কী! দুষ্টু গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো, যারা কাজে আসছে না তাদের বের করে দিতে হবে। এটাকে যদি শক্ত হাতে অ্যাড্রেস করা না হয় তাহলে পার্বত্য এলাকায় আমরা আরও ইনসিডেন্ট দেখব। 

দেশ রূপান্তর : দেশের নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলাতে সম্প্রতি সেনাবাহিনীকে দুই মাসের জন্য ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এতে কি পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে মনে করেন?

নাঈম আশফাক চৌধুরী : আমি মনে করি হবে। প্রথমত, এখনো পুলিশ কমপ্লিটলি ফাংশনাল হতে পারেনি। দুই নম্বরে পুলিশের মধ্যে যে আস্থার বিষয় আছে প্লাস জনগণের পুলিশের ওপর বিশ্বাসের যে বিষয় আছে সেটা এখনো পরিপূর্ণভাবে পুনর্গঠিত হয়নি। তো সেই বিবেচনায় সরকার বলছে যে সেনাবাহিনীকে দুই মাসের জন্য ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দেওয়া হয়েছে।

দেশ রূপান্তর : সেনাবাহিনী দিয়ে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের অতীত অভিজ্ঞতা কী বলে?

নাঈম আশফাক চৌধুরী : আমাদের পূর্ব অভিজ্ঞতায় যেটা বুঝি, এর আগে স্পেশাল অপারেশনগুলো হয়েছিল সেগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলব যে সেনাবাহিনীকে অত্যন্ত ম্যাচিউরিটির সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে। কী করা যাবে, কী করা যাবে না এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্রিফিং, মোটিভেশন, ট্রেনিং যাই বলেন এগুলো করতে হবে। চেইন অব কমান্ড অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নির্দেশনাগুলো সেনাবাহিনীর সদস্যদের দিতে হবে যাতে করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না হয়। অর্থাৎ ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার পেলাম এবং সেটা না জানা, অজ্ঞতার কারণে এমনভাবে ব্যবহার করলাম যেটা সেনাবাহিনীর সঙ্গে যায় না বা যেটা আইনের সঙ্গে যায় না এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্রিফিং, নির্দেশনা, মোটিভেশন, ট্রেনিং এগুলো অবশ্যই দেওয়া উচিত। আমাদের ল’ অ্যান্ড অর্ডার সিচুয়েশন অবশ্যই রিফর্ম করতে হবে এবং এ কাজটা কীভাবে করা হচ্ছে সেটা আন্তর্জাতিক অঙ্গনও দেখছে। একই সঙ্গে প্রিভিয়াস রেজিমের যে সব অন্যায়, ভায়োলেন্স, অত্যাচার, মানবাধিকার ভায়োলেশন হয়েছে এটাও কিন্তু তারা একদিকে তদন্ত করবে। অপর দিকে বর্তমান সরকার একই কাজ করছে কি না এটাও কিন্তু তারা পরিমাপ করার চেষ্টা করবে। সো এটা সেনাবাহিনীর যারা কমান্ডে আছেন তারাও ডেফিনেটলি বোঝেন। মূল কাজ হলো, যে সন্ত্রাসী তাকে ধরতে হবে, যে অবৈধ অস্ত্র আছে সেটাকে আনতে হবে। ধরে এনে আইনের কাছে সোপর্দ করা পর্যন্ত তার দায়িত্ব। কিন্তু তাকে সংশোধন করার দায়িত্ব সেনাবাহিনীকে দেওয়া হয়নি। তাকে আইনের কাছে সোপর্দ করা সেনাবাহিনীর কাজ, দ্যাটস ইট।

দেশ রূপান্তর : পুলিশ পুনর্গঠনের পথ কী?

নাঈম আশফাক চৌধুরী : পুলিশ বাহিনীর সমস্যা যদি একটা শব্দে বলতে চাই, সেটা হচ্ছে দলীয়করণ। এই রাজনীতিকরণ একদম টোটালি ডেস্ট্রয় করে দিয়েছে প্রফেশনালিজম অব অল দ্যা ইনস্টিটিউশন। এই রাজনীতিকরণ একদম সমূলে নির্মূল করতে হবে, কমপ্লিটলি। আমরা যেমন বিডিআরকে সংস্কার করে বিজিবিতে রূপান্তরিত করেছি যেভাবে, সেসব প্রসেসের মধ্য দিয়ে পুলিশকে নতুনভাবে পুনঃসংস্কার করা যায়। নাম চেঞ্জ করবে কি না সেটায় এক ধরনের ডিবেট আছে কিন্তু এটার রিক্রুটমেন্ট থেকে শুরু করে, এটার পলিসি থেকে শুরু করে, রুলস অব এনগেজমেন্ট থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে একটা পরিবর্তন আনতে হবে। এতে করে যদি প্রয়োজন হয় তাহলে রিটায়ার্ড সিভিল ব্যুরোক্র্যাট থেকে শুরু করে মিলিটারি অফিসার যারা আছে তাদেরও সাহায্য-সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে। বর্তমানে যে অবস্থায় আছে এটা কোনো অবস্থাতেই সামনের দিকে আগানোর মতো না। যে সব ভাইরাস অলরেডি পুলিশটাকে ধ্বংস করেছে এই ভাইরাসগুলোকে অবশ্যই বের করতে হবে। প্রফেশনালিজম ইজ দ্যা অনলি সল্যুশন টু দিস প্রবলেম। শর্ট টার্ম, মিডটার্ম, লংটার্ম বিভিন্ন টার্মে কী কী করণীয় সেটা আইডেন্টিফাই করে খুব দ্রুত এবং ডাইনামিকভাবে এ কাজগুলো করা উচিত।

দেশ রূপান্তর : ব্ল্যাক লাইফ ম্যাটারের সময় নিউ ইয়র্কেও পুলিশেও সংস্কার হয়েছে। আমাদের পুলিশ বাহিনীর গঠনের ভেতরে কলোনিয়াল মাইন্ডসেটের বড় একটা জায়গা আছে। এ বিষয়গুলোকে কীভাবে অ্যাড্রেস করা যায়?

নাঈম আশফাক চৌধুরী : অ্যাবসলিউটলি, যেটা বলতে চাচ্ছিলাম যে, প্রো-কমিউনিটি, প্রো-পিপল হতে হবে। দরকার হলে জাতিসংঘসহ অন্যান্য দেশের সহায়তা নিতে পারেন। ইউএন বলেন, ইউকে বলেন যারা মানবাধিকারকে অনেক উচ্চতর পর্যায়ে প্রায়োরিটি দেয়, সে রকম ট্র্যাডিশন, সে রকম প্র্যাকটিস, সে রকম পলিসিকে আমাদের পুলিশে ইম্পোর্ট করতে হবে। ট্র্যাডিশনাল অথবা কলোনিয়াল মাইন্ডসেট নিয়ে পুলিশ গড়ে তুলে আমি কি এ-যুগে চলতে পারব? পারব না। জনগণমুখী পুলিশ করতে হবে। পুলিশ নট আ বাহিনী, পুলিশ হলো সার্ভিস। এ আন্ডারস্ট্যান্ডিংটাই তো আগে ঢুকাতে হবে পুলিশের ভেতরে। আগের রেজিমের পুলিশ ভাবত, আমরাই তো দলকে ক্ষমতায় এনেছি বা টিকিয়ে রেখেছি। এ ধরনের একটা মাইন্ডসেট তাদের ভেতরে ছিল। এটা চেঞ্জ করতে হবে।

দেশ রূপান্তর : অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী কারাগার থেকে বের হয়ে গেছেন। থানাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে অস্ত্র লুট হয়েছে। এসব ঘটনা কী কী ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন?

নাঈম আশফাক চৌধুরী : অনেক বড় ধরনের ঝুঁকির সৃষ্টি করতে পারে। দেশে যারা ল’ অ্যান্ড অর্ডার এনফোর্স করার কথা তারা ইনঅ্যাক্টিভ অর পার্শিয়ালি অ্যাক্টিভ। এমতাবস্থায় শীর্ষ সন্ত্রাসী বেরিয়েছে, সন্ত্রাসী যারা আছে তারাও বেরিয়েছে, অনেক পলিটিক্যাল পার্সন যারা আত্মগোপনে ছিল তারাও বেরিয়ে আসছে। সুতরাং এটা নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। তো এর এগেইনস্টে চলমান যে অপারেশন আছে সেটা অনেক বেগবান করা উচিত। ভারত ও মিয়ানমার থেকে অস্ত্র ঢোকার মতো বাস্তবতা রয়েছে। গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো উচিত। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও আন্ডার রিফর্ম, যতটুকু শুনেছি।

দেশ রূপান্তর : দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও দলীয়করণ হয়েছে। দেশের সামগ্রিক গোয়েন্দা কার্যক্রম ও সংস্থাগুলো কতটা কার্যকর রয়েছে? আমরা তো আয়নাঘরের কথা জানি এখন। তারা কি কোনো দায়মুক্তি বা ইনডেমনিটির সুবিধা পান?

নাঈম আশফাক চৌধুরী : কিছুদিন আগে একটা পত্রিকায় লিখেছিলাম সিকিউরিটি সেক্টর রিভিউ। সেটার মধ্যে আমার কনক্রিট স্পেসিফিক রিকমেন্ডেশন ছিল। গোয়েন্দা সংস্থার রিফর্মের ক্ষেত্রেও রাজনীতিকরণকে বিবেচনায় নিয়ে আগাতে হবে। এই দলীয়করণ কিন্তু আমাদের গোয়েন্দা সংস্থার কার্যক্রমকে বিপথে নিয়ে গেছে। তো এখানে রিফর্মটা খুব জরুরি হয়ে গেছে এবং এটার কাজ হয়তো চলমান আছে। এটার ক্ষেত্রেও শর্ট টার্ম, মিডটার্ম, লংটার্ম করতে হবে। এদেরও কিন্তু রুলস অব এনগেজমেন্টটাকে সেট করতে হবে। এমনভাবে সেট করতে হবে যাতে পরবর্তী সময়ে সরকার যদি আসে এবং এসে যদি বলে তুমি এ রকম আয়নাঘর বানাও, সে তখন বলতে পারবে, ‘সরি স্যার, আমার রুলস অব এনগেজমেন্টে আয়নাঘর তৈরি করার মতো কোনো পথ নেই, আই কান্ট ডু ইট।’ আমাদের বুঝতে হবে যে, আমাদের যে দুটো বড় গোয়েন্দা সংস্থা আছে এই দুটোর কোনোটাই কিন্তু আর্মড ফোর্সেসের অধীনে নয়। এই দুটোই কিন্তু প্রাইম মিনিস্টারস অফিসের অধীন। ফলে ওরা কী করছে বা না করছে সে ব্যাপারে আর্মড ফোর্সেস কিছুই জানে না এবং জানার এখতিয়ারও নেই। এটার নিয়ন্ত্রণ, কার্যক্রম সব কিছুই হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে। ওখানে কেউ যদি ফৌজদারি কোনো অপরাধ করে সেটার বিচার কিন্তু সিভিল ওয়েতে হবে, কোনো দায়মুক্তি থাকার কথা না, আমার জানা মতে নেই। কেউই আসলে আইনের ঊর্ধ্বে না।

দেশ রূপান্তর : মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য আরাকান আর্মির দখলে চলে যাওয়ার পথে। এ পরিস্থিতিতে নতুন করে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বাংলাদেশে ঢুকছে। এ দিকটিতে নজর দেওয়ার ব্যাপারে সরকারের প্রতি আপনার কোনো পরামর্শ আছে কি?

নাঈম আশফাক চৌধুরী : আমরা অনেকে অনেক আগে থেকেই রোহিঙ্গাদের সাসটেইনেবল রিপেট্রিয়েশনের কথা বলে আসছি। সো সাস্টেইনেবল রিপেট্রিয়েশনটা তখনই সম্ভব যখন রোহিঙ্গারা রাখাইনে চলে যাবে, এবং রোহিঙ্গাদের যে সিভিল রাইটস আছে সেখানে তার ইমপ্লিমেন্ট করতে পারবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আরাকানে যারা অপারেশন করছে তাদের সঙ্গে কি আমি ভালো সম্পর্ক তৈরি করেছি? তাদের সঙ্গে যোগাযোগ, এনগেজমেন্ট কি আমরা করেছি? গোয়েন্দা সংস্থার একজন দুজন তাদের সঙ্গে কমিউনিকেট করা মানে কিন্তু এনগেজমেন্ট নয়। যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে সেটা আস্তে আস্তে বাড়ছে। আপনি আরেকটা দেশের পরামর্শ শুনলেন, যাদের সঙ্গে ১৯৯৮ থেকে আরাকান আর্মির সম্পর্ক খারাপ হয়েছে থ্রু ‘অপারেশন লিচ’। ইন্ডিয়া অপারেশন লিচ পরিচালনা করে আরাকান আর্মির টপ লিডারদের আন্দামানে নিয়ে হত্যা করেছে, সেই থেকে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ। এক ধরনের পারসেপশন আছে যে ইন্ডিয়ার পরামর্শে আরাকান আর্মির সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটার উন্নতি হয়নি। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে আপনার মূল অবজেক্টিভ থেকে আপনি বিচ্যুত হয়ে গেলেন। আপনি যেটা করেছেন তাতে আরাকান আর্মির সঙ্গে আপনার সম্পর্ক দিন দিন খারাপ হয়েছে। তো এখন তো পুরো রাখাইন আরাকান আর্মির কন্ট্রোলে। অন্যদিকে আরাকান আর্মির তাড়া খেয়ে তাতমাদোর যারা এখানে এসেছিল তাদের আমরা আবার হ্যান্ডওভার করে দিলাম তাতমাদোর কাছেই। তো আপনি আরাকান আর্মির এগেইনস্টে সব ব্যবস্থা নিয়েছেন! এটা কি সাংঘর্ষিক হলো না?

দেশ রূপান্তর : সামগ্রিকভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আপনার কোনো পরামর্শ আছে কি?

নাঈম আশফাক চৌধুরী : অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নাজুক অবস্থায় আছে বলে আমি মনে করি। বর্তমানে সেনাবাহিনীর চলমান অপারেশনকে আরও বেগবান করা দরকার। পুলিশের জন্য সংস্কার অতিদ্রুত করতে হবে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যে সম্পর্ক আছে সেটাকে রাইট ওয়েতে এক্সটেন্ড করা প্রয়োজন। এর সঙ্গে সঙ্গে আবার আমাদের অর্থনৈতিক ভঙ্গুর অবস্থা থেকে আস্তে আস্তে বেরিয়ে আসতে হবে। অর্থনীতির সঙ্গে সিকিউরিটি কিন্তু ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমি আরও যেটা বলব ইভিল অ্যাকশনস ফ্রম ইন্ডিয়া এবং তাদের যে কোলাবরেটর আছে বাংলাদেশে, আগের রেজিমের আর কি, তারা এখনো সক্রিয়। এটা শুধু মাত্র পুলিশ বা মিলিটারি অপারেশন দিয়ে কাজ হবে না, এটাকে ছাত্র-জনতার সবার ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করতে হবে, অ্যাড্রেস করতে হবে। এর সঙ্গে আমাদের মিডিয়াকেও ভারতীয় এবং তাদের কোলাবরেটরদের ন্যারেটিভের কাউন্টার দিতে হবে। মানে এখানকার সত্য ঘটনাকে তুলে ধরতে হবে।

দেশ রূপান্তর :  সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

নাঈম আশফাক চৌধুরী : আপনাকেও ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন।

অনুলিখন : মোজাম্মেল হৃদয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত