মিছিল নগরী হয়ে ফিরছে সেই কলকাতা

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১২:০৪ এএম

একটা স্ফুলিঙ্গ পারে দাবানল সৃষ্টি করতে এ যে কতটা সত্যি তা আবারও টের পেলাম কলকাতার আরজি কর মেডিকেল কলেজের ভেতরে তরুণী ডাক্তারকে নৃশংস খুনের পরে আমার শহরকে প্রতিবাদে সোচ্চার হতে দেখে। এমন জনজোয়ার বহু দিন বাদে কলকাতা দেখল।

কলকাতাকে বলা হতো, মিছিল নগরী। সত্তরের দশকের পর ধীরে ধীরে শান্ত হতে লাগল আমার শহর। বামপন্থি, সিপিআইএম নেতৃত্বাধীন সংসদীয় বামেরা রাজ্যের ক্ষমতা দখলের পর থেকে কলকাতা চরিত্র পাল্টাতে থাকল। স্থিতাবস্থা, বুকের ভেতর জমে থাকা যাবতীয় আগুন নিভিয়ে দিল ধীরে ধীরে তথাকথিত সংস্কারের নামে। সিস্টেম না বদলিয়ে কীভাবে ওপর ওপর সংস্কার করেও ক্ষমতায় দীর্ঘদিন টিকে থাকা যায়, সেই পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বামফ্রন্ট প্রাথমিকভাবে পাস করলেও শেষ পর্যন্ত মুখ থুবড়ে পড়ল। গ্রামেগঞ্জে, কৃষক, শ্রমিকদের মধ্যে বামদের দীর্ঘ সংগ্রামে গড়ে তোলা গড় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের ধাক্কায় হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। বামফ্রন্টের শেষের দিকে বিভিন্ন অপকর্ম, স্বজন পোষণ, অহমিকা, ঔদ্ধত্য মানুষের মনে লেফট পলিটিক্স নিয়ে যে বিতৃষ্ণার জন্ম দিল, তার হাত ধরেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে চরম দক্ষিণপন্থার রমরমা বাড়ল।

দক্ষিণপন্থি রাজনীতির বৈশিষ্ট্য, পপুলিজম। এখনো পর্যন্ত মমতা সরকার কৃষি, শ্রম, কোনো ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট কিছু নীতি প্রয়োগ করে বিপুল উন্নয়ন করেছেন, তা নয়। এমন অনেক উদাহরণ আছে, যেখানে তার সঙ্গে নরেন্দ্র মোদি সরকারের নীতির কোনো পার্থক্য নেই। শ্রমিকদের রাজনৈতিক অধিকার ধর্মঘট নিষিদ্ধ করার বিষয়ে বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসের ভূমিকা এক। মমতা রাজত্বকালে অর্থনীতির সামগ্রিক উন্নতি হয়েছে বা বহু ঘোষিত আইটি সেক্টর এগিয়ে যাচ্ছে তাও নয়। তাও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জনপ্রিয়, এটা অস্বীকার করা যায় না। তার বড় কারণ, শহরে জনপ্রিয়তা কমলেও, গ্রামে তার ভোট ব্যাংক অটুট। পপুলিস্ট রাজনৈতিক নেতাদের মতো তিনি গরিবের ভাষা বোঝেন, এটা একটা পয়েন্ট। আর সাফল্যের মূল কারণ বহুবিধ ভর্তুকি কর্মসূচি। বিরাট সংখ্যক গ্রামীণ সর্বহারা বিভিন্ন ভাতায় উপকৃত হচ্ছেন, তাদের অর্থনীতি কিছুটা হলেও গতি পেয়েছে, এটা ঠিক।

মমতা ব্যানার্জি মোটেও গণতান্ত্রিক পথের অনুসারী নন। কিন্তু গ্রামের লোকজন আজও দুমুঠো খেতে পারলেই সন্তুষ্ট। ফলে নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার কতটা সুরক্ষিত তা নিয়ে তারা ততটা চিন্তিত নন। মমতা সরকার এক ধরনের জালে বেঁধে রেখেছেন জনগণকে। একদিকে কিছু অর্থনৈতিক ডোল বা অনুদান, অপরদিকে নিজস্ব বাহিনী দিয়ে সারা রাজ্যে ভয়ের সংস্কৃতিকে শিল্পের স্তরে নিয়ে যাওয়া। ফলে সাধারণ লোকজন চোখের সামনে বিপুল দুর্নীতি, অন্যায় দেখলেও চুপ করে থাকতে বাধ্য হন। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মুসলমানদের ক্ষেত্রে তৃণমূল কংগ্রেসের বড় অস্ত্র, বিজেপির জুজু দেখানো। আমরা চলে গেলে বিজেপি এলে জীবন বিপন্ন হবে এই আতঙ্কে সংখ্যালঘুদের বড় অংশকে তৃণমূল নিজেদের ভোট ব্যাংক করতে পেরেছে। অথচ কেউ তলিয়ে দেখলেই বুঝতে পারবেন যে, বিজেপির থিঙ্ক ট্যাঙ্ক আরএসএসের সঙ্গে মমতার সখ্য গভীর। দুজনের মতাদর্শে বিরোধ নেই। মমতা ব্যানার্জি ক্ষমতায় আসার পর থেকে জেলায় জেলায় চরম মনুবাদী সংগঠনের বিপুল বিস্তার হয়েছে তা যে কেউ খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন। পাশাপাশি বাম আমলে বঞ্চিত বাঙালি মুসলমানদের এক অংশ তৃণমূল সরকারের আমলে নানা কারণে, আগের তুলনায় সামাজিক প্রতিষ্ঠা পাওয়ায় এক ধরনের কৃতজ্ঞতা এই সরকারের প্রতি থাকবে, এটা অস্বীকার করা মূর্খামি।

তৃণমূল কোনো দল নয়। মঞ্চ। এখানে অনেক মতের সমাহার আছে। তৃণমূল রেজিমেন্টেড পার্টি নয়। তবে তার সুরক্ষা কবচ বা নিরাপত্তা বলয় শক্তিশালী। সিপিআইএম মুখে বলে যে বৃত্ত বাড়ানো দরকার। কিন্তু সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি আর গগনচুম্বী অহংকার তাদের জনগণের দল না হয়ে পার্টিকেন্দ্রিক হয়েই থাকতে হয়। মমতার মূল তৃণমূল কংগ্রেসের বাইরে দুটো বলয় রয়েছে। সুশীল সমাজ ও নকশালপন্থিদের বড় অংশ, পুরনো আরএসএস এবং অন্ধ কমিউনিস্ট বা সিপিআইএম বিরোধী এই বলয়ের শক্তি। মমতার তৃণমূল বিপদে পড়লেই এই তথাকথিত প্রগতিশীল জোট, বিজেপির জুজুকে সামনে এনে মমতা সরকারের রক্ষা কবচ হয়ে পাশে দাঁড়ান। শ্রেণি বিভক্ত সমাজে তৃণমূল কংগ্রেসের শ্রেণি চরিত্র নিয়ে যাবতীয় অপ্রিয় সত্য তখন মুলতবি থাকে। ভারতের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে কোনো রাজ্য যদি সত্যি থ্রেট হয়, তখন কেন্দ্র ছুতো নাতায় তা ভেঙে দিতে পারে তাও আড়াল করে রাখে তৃণমূলপন্থি নকশালরা। ভুলেও বলেন না রাষ্ট্র পছন্দ করেনি বলে ১৯৫৯ সালে তাদের ঘোর শত্রু সিপিআইএমের নাম্বুদিরিপাদ সরকারকে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল কেরালায়। ফলে এই সিস্টেমের কাছে তৃণমূল মোটেও কোনো থ্রেট নয়। যতদিন যাচ্ছে তত সিবিআই, ইডি, কোর্ট সব মিলিয়ে যে রাজা বাবু যুদ্ধ যুদ্ধ খেলবে না টাইপ গট আপ গেম তা স্পষ্ট হচ্ছে।

অনেকেই উত্তর প্রদেশ বা অন্যান্য বিজেপিশাসিত রাজ্যের উদাহরণ টেনে আরজি করের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন বলে দেখানোর চেষ্টা করছেন। অদ্ভুত যুক্তি। ওখানে হলে এখানেও হতে পারে এটা কোনো কথা! স্বাধীনতার পর এ দেশে এই প্রথম হসপিটালের মধ্যে একজন ডাক্তারকে খুন করা হলো। ফলে এ তো এমনিতেই বিরলতম ঘটনা। তা ছাড়া এই খুনের পেছনে মোটিভ কী! মহিলা বলে খুন, রেপ না অত্যন্ত সক্রিয় দুষ্টচক্রের ফন্দিফিকির ডাক্তার মেয়েটি জেনে ফেলেছিল বলে তাকে প্রাণ দিতে হলো! সব দেশেই দুষ্ট চক্রের পেছনে শাসকদের মদদ থাকে তা বুঝতে প-িত হতে হয় না।

লেখক :  ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত