নিহত বেড়ে ৫৫৮

ইসরায়েল কেন লেবাননে হামলা চালাচ্ছে?

  • ইসরায়েলি হামলায় দুই দিনে নিহত বেড়ে ৫৫৮ জন, আহত অন্তত দুই হাজার
  • ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর আন্তঃসীমান্ত লড়াই গত ১১ মাসে তীব্র হয়েছে
  • দক্ষিণ লেবাননে হাজারও যোদ্ধা এবং বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র অস্ত্রাগার ঘাঁটি গড়ে তুলেছে হিজবুল্লাহ
আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৯:৪৮ পিএম

গত ২৪ ঘণ্টায় লেবাননজুড়ে একের পর এক বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরায়েলের বিমান হামলায় এ পর্যন্ত ৫৫৮ নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫০ শিশু ও ৯৪ জন নারী।

এছাড়া আহত হয়েছেন প্রায় দুই হাজার মানুষ। ১৯৭৫-১৯৯০ সালের গৃহযুদ্ধের পর থেকে লেবাননে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা। এতে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ তাদের বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর বরাতে আল জাজিরা জানিয়েছে, ইসরায়েল মূলত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ওপর হামলা চালাচ্ছে। যাতে তাদের ‘বাস্তুচ্যুত নাগরিক’দের উত্তরাঞ্চলে ফেরত পাঠাতে পারে। এ লক্ষ্যে লেবাননে হিজবুল্লাহর এক হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে দেশটি। এসব স্থান হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি ও সামরিক স্থাপনা ছিল বলে দাবি করা হয়।

গত বুধবার ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োয়াভ গ্যালান্ট যুদ্ধ ‘নতুন পর্যায়ে’ প্রবেশ করেছে বলে জানান। তিনি লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ‘শক্তি’ মোতায়েনের ঘোষণা দেন। আর সোমবার রাতে এক সংবাদ সম্মেলনে ইসরায়েলি সামরিক মুখপাত্র লেবাননে স্থল আগ্রাসনের দাবি নাকচ করে বলেন, ‘উত্তর সীমান্তে আমাদের সব নাগরিককে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনতে যা যা করা দরকার আমরা তা করব।’

হামলার আগে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী থেকে লেবাননের জনগণের কাছে প্রায় ৮০ হাজার ফোন কল করা হয়েছিল। ফোনে মূলত লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে তাদের বাড়িঘর খালি করতে এবং নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। গ্যালান্টের ‘নতুন পর্যায়ের’ ঘোষণার একদিন আগে ১৭ সেপ্টেম্বর হিজবুল্লাহ সদস্যদের শত শত ওয়াকিটকি রেডিওতে বিস্ফোরণ ঘটে। তবে এ বিষয়ে ইসরায়েল কোনো মন্তব্য করেনি।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে লেবাননের দক্ষিণ সীমান্তে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ ক্রমাগত গোলাগুলি চালিয়ে যাচ্ছে। গাজায় গোষ্ঠীটির মিত্র হামাসের সঙ্গে ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে না পৌঁছানো পর্যন্ত হিজবুল্লাহ হামলা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

হিজবুল্লাহ কী, কোথায় কাজ করে?

হিজবুল্লাহ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী একটি শিয়া মুসলিম সংগঠন, যেটি লেবাননের সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করে। ১৯৮০-এর দশকের গোড়ার দিকে ইসরায়েলের বিরোধিতা করার জন্য এই অঞ্চলের সবচেয়ে প্রভাবশালী শিয়া শক্তি ইরান এটি প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তখন দেশটির গৃহযুদ্ধের সময় ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবানন দখল করেছিল।

হিজবুল্লাহ ১৯৯২ সাল থেকে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এবং একটি অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সংগঠনটির উপস্থিতি দেখা যায়। এর সশস্ত্র শাখা লেবাননে ইসরায়েলি ও মার্কিন বাহিনীর উপর মারাত্মক হামলা চালিয়েছিল। লেবানন থেকে ২০০০ সালে ইসরায়েল যখন সৈন্যদের প্রত্যাহার করে, হিজবুল্লাহ তখন সেই সৈন্য প্রত্যাহারের কৃতিত্ব নেয়।

এরপর থেকে হিজবুল্লাহ দক্ষিণ লেবাননে হাজার হাজার যোদ্ধা এবং বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র অস্ত্রাগার ঘাঁটি গড়ে তুলেছে, পাশাপাশি বিতর্কিত সীমান্ত এলাকায় ইসরায়েলের উপস্থিতির বিরোধিতা করে চলেছে। গোষ্ঠীটিকে পশ্চিমা রাষ্ট্র, ইসরায়েল, উপসাগরীয় আরব দেশগুলো ও আরব লীগ একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসাবে আখ্যায়িত করে থাকে।

হিজবুল্লাহর একটি মারাত্মক আন্তঃসীমান্ত অভিযানের ফলে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে ২০০৬ সালে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হয়। ইসরায়েলি বাহিনী হিজবুল্লাহর হুমকি মোকাবেলায় দক্ষিণ লেবাননে আক্রমণ করলেও গোষ্ঠীটি টিকে যায় এবং এরপর থেকে তাদের যোদ্ধা সংখ্যা বৃদ্ধি করাসহ নতুন ও উন্নত অস্ত্রের ভান্ডারও গড়ে তোলে।

হাসান নাসরাল্লাহ কে?

শেখ হাসান নাসরাল্লাহ একজন শিয়া ধর্মগুরু যিনি ১৯৯২ সাল থেকে হিজবুল্লাহর নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এটিকে একটি রাজনৈতিক, সেইসাথে একটি সামরিক বাহিনীতেও পরিণত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন হাসান নাসরুল্লাহ। ইরান এবং তার সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে তার।

ইসরায়েল তাকে হত্যা করতে পারে, এই ভয়ে নাসরাল্লাহ কয়েক বছর ধরেই আর জনসমক্ষে আসেননি। তবে তিনি হিজবুল্লাহর কাছে খুবই শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব এবং প্রতি সপ্তাহেই টেলিভিশনে বক্তৃতা দিয়ে থাকেন।

হিজবুল্লাহ কতটা শক্তিশালী?

হিজবুল্লাহ বিশ্বের সবচেয়ে ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত অরাষ্ট্রীয় সামরিক বাহিনীর একটি যেটিকে অর্থায়ন করেছে ইরান। হাসান নাসরাল্লাহর দাবি, সংগঠনটির এক লক্ষ যোদ্ধা রয়েছে, যদিও অনুমান করা হয়, সংখ্যাটি ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

এদের অনেকেই বেশ প্রশিক্ষিত ও দক্ষ যোদ্ধা এবং সিরিয়ার গৃহযুদ্ধেও লড়াই করেছে তারা। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ থিঙ্ক ট্যাঙ্কের তথ্য অনুসারে, হিজবুল্লাহর আনুমানিক ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ২ লাখ রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। তাদের অস্ত্রাগারের বেশিরভাগই ছোট, অনির্দেশিত, আর্টিলারি রকেট।

তবে হিজবুল্লাহর বিমান বিধ্বংসী ও জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি ইসরায়েলের গভীরে আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে বলেও মনে করা হয়। গাজায় হামাসের তুলনায় অনেক বেশি অত্যাধুনিক অস্ত্র রয়েছে হিজবুল্লাহর কাছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত