১৯৪৭ সালে ছাত্রাবস্থায় তিনি ‘দৈনিক আজাদ’-এ সাংবাদিকতা শুরু করেন এবং পরে বার্তা সম্পাদক হন। ১৯৫৪ সালে ‘আজাদ’-এর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর সেই বছরই ‘ইত্তেফাক’-এর বার্তা সম্পাদক পদে নিযুক্ত হন। ১৯৭০ সালে হন নির্বাহী সম্পাদক। ১৯৬৯-৭০ সালে ‘অনামী’ ছদ্মনামে লেখা অনবদ্য উপসম্পাদকীয় ‘মঞ্চে-নেপথ্যে’ কলামে উঠে এসেছে তৎকালীন রাজনীতির তীক্ষè পর্যবেক্ষণ এবং বিচার-বিশ্লেষণ। ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর তাকে শান্তিনগর, চামেলীবাগের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সৈন্য ও আলবদর-রাজাকাররা। এরপর এই সাংবাদিকের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। অতীতের সঙ্গে অধুনার সংযোগ ঘটাতে ছাপা হলো, পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং পাকিস্তান ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের জনপ্রিয় উপসম্পাদকীয় ‘মঞ্চে-নেপথ্যে’
‘পোহালে শর্বরী, বণিকের মানদন্ড দেখা দিল রাজদন্ড রূপে’। ১৯৫৭ সালের ৩রা জুলাই পলাশীতে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হওয়ার মধ্য দিয়া জাতির ভাগ্যে ইহাই ঘটিয়াছিল। সেই নিয়মেই এ দেশের মানুষের কাছে ২৭শে অক্টোবর তারিখটিও যুগ যুগ ধরিয়া একই তাৎপর্য বহন করিয়া চলিতে থাকিবে। গত ১০টি বৎসর যাবৎ শাসন-শোষণ আর অত্যাচার-নির্যাতনের দুধারি খড়গ উত্তোলিত রাখিয়া এই দিনটিকেই এ দেশের মানুষের ওপর ‘জাতীয় উৎসবের’ দিন হিসেবে চাপাইয়া রাখা হইয়াছিল। আজ অবস্থার পরিবর্তন হইয়াছে। ‘২৭শে অক্টোবর’ পাকিস্তানের জীবনে আর কোনো দিন ‘জাতীয় দিবস’ হিসেবে উদযাপিত হইবে না। সুখ-স্বপ্নে বিভোর আইয়ুব-মোনায়েমের দোর্দন্ড দাপটে সদা সন্ত্রস্ত থাকিয়া যাহারা এতদিন ২৭শে অক্টোবরকে ‘বিপ্লব দিবস’ হিসাবে উদযাপন করিতে বাধ্য ছিল, এখন হইতে এ দেশের সেই কোটি কোটি মানুষই প্রতিবছর দিনটিকে ‘কৃষ্ণ দিবস’ হিসেবে স্মরণ করিবে।
আমরা মনে করি, পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই দিনটির তাৎপর্য গভীর। এ দিনে আইয়ুবের ‘সর্বময়’ ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়া একদিকে যেমন আমরা পার্লামেন্টারি আমলের রাজনীতির চেহারা-সুরত যাচাইয়ের অবকাশ পাই, তেমনি অন্যদিকে ‘বিবেকবর্জিত’, ‘ক্ষমতাপাগল’, ‘স্বার্থশিকারি রাজনীতিকদের খপ্পর’ হইতে ‘অসহায় দেশবাসীকে রক্ষার’ নামে সাধু পুরুষ সাজিয়া ধোঁকার পর ধোঁকা দিয়া একটি জাতিকে তিলে তিলে কীভাবে রিক্ত, নিঃস্ব, পঙ্গু করিয়া ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত স্বার্থের সুউচ্চ পাহাড় গড়িয়া অবলীলাক্রমে দেশকে চরমতম দুর্যোগের মুখে ঠেলিয়া দেওয়া হয়, তাহারও সম্যক পরিচয় পাওয়া যায়। এই আমলের ইতিহাস হইতে এ শিক্ষাও আমরা পাই যে, জাতীয় নেতার আসনে উপবিষ্ট হইয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করিয়া জাতির সর্বনাশ করিলে ইতিহাস কোনো দিনই তাহাকে ক্ষমা করে না। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়াকে আল্লার রহমত ও দেশ সেবার উপায় হিসেবে গ্রহণ না করিয়া দুর্বিনীত চিত্তে যাহারা ক্ষমতায় মদমত্ত হন, ধরাকে সরা জ্ঞান করেন, মানুষের উপর প্রভুত্ব করিবার দুর্জয় বাসনায় দিগি¦দিক জ্ঞান হারাইয়া শাসনক্ষমতাকে শোষণের হাতিয়ারে পরিণত করেন, রূঢ় বাস্তবের প্রচ- আঘাতে তাহাকেই আবার ‘আস্তাকুঁড়ে’ নিক্ষিপ্ত হইতে হয়। ক্ষমতার মদাসক্ত মানুষের পার্শ্বচর সাজিয়া আর একশ্রেণির মানুষের স্তাবকতা বা ভাঁড়ামি জাতিকে কোন পর্যায়ে লইয়া যাইতে পারে, ২৭শে অক্টোবরের ‘বিপ্লবী পুরুষের’ শাসনামলের ইতিহাস তাহারও নীরব সাক্ষী।
স্বাধীনতাসংগ্রামে যাহারা ছিলেন সিপাহসালার, সেই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ওপর দেশ ধ্বংসের ইলজাম চাপাইয়া ‘অসহায় দেশবাসীকে রক্ষার’ নামে এবং রাজনীতিকদের ‘দেশ ধ্বংসের প্রচেষ্টার নীরব দর্শক হইয়া বসিয়া থাকা’ তাহাদের পক্ষে সম্ভব নয় বলিয়া ঘোষণা করিয়া প্রেসিডেন্ট মির্জা সেদিন ‘দেশপ্রাণ’ আইয়ুবের সহিত যূথবদ্ধ হইয়া দেশবাসীকে কত আশার বাণীই না শুনাইয়াছিলেন! পরস্পর পিঠ চুলকাইয়া দিন কয়েকের জন্য এই ‘যুগল পুরুষকে’ সচ্চিদানন্দের ভূমিকায় অভিনয় করিতেও দেশবাসী দেখিয়াছিল। কিন্তু দুদিন না যাইতেই বীণার তার যেন ছিঁড়িয়া গেল। আইয়ুবের কণ্ঠে সুর ও বেসুরের ঝংকার ধ্বনিত হইতে লাগিল। প্রধান বিচারপতি মুনীরের বরাত দিয়া যেদিন তিনি বলিলেন, ‘সামরিক আইন প্রেসিডেন্ট জেনারেল মির্জারই অধীন’, ঠিক সেই দিনই আবার এক সাক্ষাৎকারে তাহাকে বলিতে শোনা গেল, ‘প্রেসিডেন্ট যদি নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিয়া রাজনীতিকদের সহিত হাত মিলান’ তাহা হইলে তিনিই তখন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন এবং সেক্ষেত্রে তাহার সিদ্ধান্তই হইবে ‘চূড়ান্ত’। তখনই বোঝা গিয়াছিল, আলামত ভালো নয়। প্রেসিডেন্ট মির্জা আইয়ুবের প্রশস্তি গাহিয়া ‘ছয় মাসের মধ্যে পাকিস্তানের চেহারা পালটাইবার’ প্রতিশ্রুতি তুলিয়া ধরার পর ১০টি দিনও গেল না। যে রাত্রে তিনি ‘প্রধানমন্ত্রী আইয়ুবের’ নেতৃত্বাধীন ১২ সদস্যের মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ করাইলেন, সেই রাত্রেই আবার তাহাকে যাবতীয় ক্ষমতা জেনারেল আইয়ুবের হাতে তুলিয়া দিয়া ‘আমি সরিয়া দাঁড়াইবার সিদ্ধান্ত করিয়াছি’ বলিয়া ঘোষণা করিতে হইল। সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হইয়া আইয়ুব ‘দেশোদ্ধারে’ মনোনিবেশ করিলেন। দেশবাসীর উদ্দেশে স্বীয় সরকারের নীতি ঘোষণা করিয়া ‘দেশের বুক হইতে দুর্নীতি উচ্ছেদ’, ‘খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন’, ‘লুপ্ত মানবিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার’, ‘আত্মীয়প্রীতি ও স্বজন তোষণের অবসান’, ‘সংগতির অতিরিক্ত বিলাসী জীবনযাপনকারীদের সম্পত্তি ও অপকর্মের হোয়াইট পেপার প্রকাশ’, ‘আঞ্চলিক বৈষম্যের অবসান’ প্রভৃতির দৃঢ় সংকল্প ঘোষণা করিলেন। সর্বময় ক্ষমতা দখলের তৃতীয় দিবসে উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে এক মাসের মধ্যে শাসনযান্ত্রিক কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি ও দুর্নীতি উৎখাতের ‘নির্দেশও জারি করা হইল। আবির্ভাব পর্বের ভাবগতি দেখিয়া জনগণ উল্লসিত হইল। কিন্তু মাস না পারাইতেই ‘নিপুণ শিকারির’ সত্যিকার চেহারা প্রকাশ হইতে লাগিল! হাজার হাজার নেতা ও কর্মী কারাগারে নিক্ষিপ্ত হইলেন, দেশবাসীর ‘সেবার’ জন্য বাছিয়া বাছিয়া বিশেষ চরিত্রের লোকদের পার্শ্বচর নিযুক্ত করা হইল। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা গেল, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ খবরাখবর বহির্বিশ্বে যাইবার সকল দরজা সযত্নে বন্ধ করা হইল। জবরদস্তি বহু পত্রপত্রিকার মালিকানা বদল হইল, কায়েমিস্বার্থীদের টাকায় ট্রাস্ট গঠনের নামে ‘ট্রাস্টেড প্রেস’ পত্তন হইল।
মৌলিক গণতন্ত্রের নামে কাঁচা টাকার ‘হরির লুট’ করিয়া দুর্নীতিতে দেশ ভরিয়া ফেলা হইল। ইমান-আমান সব খোয়াইয়া একশ্রেণির মানুষ স্তাবকতা ও ভাঁড় সাজিয়া ‘আখের গুছাইবার’ কাজে মন দিলেন। বিচারপতিদের নেতৃত্বে¡ নিজ হাতে গড়া শাসনতন্ত্র কমিশন, ভোটাধিকার কমিশনের রিপোর্ট আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করিয়া নিজ প্রণীত এক অভিনব শাসনতন্ত্রও দেশবাসীর ওপর চাপাইয়া দেওয়া হইল। অধিকারহারা মানুষের বুকফাটা ক্রন্দনে আল্লার আরশ কাঁপিলেও আইয়ুব ও তার সাঙ্গোপাঙ্গদের মনে বিন্দুমাত্র দাগ কাটিল না। সিভিল সার্ভিস হইতে শুরু করিয়া প্রশাসনযন্ত্রের সকল শাখায় দুর্নীতি অনুপ্রবিষ্ট করাইয়া ক্ষমতার আসনকে ‘নিরাপদ’ করার ব্যাপারে কোনো যত্নেরই অভাব হইল না। গোয়েবলসকে হার মানানো উচ্চ কণ্ঠ ‘ভাঁড়’ সম্প্রদায়ের প্রগল্ভ প্রচার-মাহাত্ম্যে দেশবাসীকে ‘মন্ত্রমুগ্ধ’ করিয়া শেষ পর্যন্ত দেশে যে ‘বৈপ্লবিক পরিবর্তন’ ঘটানো হইল, বড়ো আশায় বুক বাঁধিয়া লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয়ে তাহারই প্রদর্শনীর জন্য উদযাপিত হইল তথাকথিত ‘উন্নয়নের দীপ্ত দশক’। কিন্তু দেওয়ালের লিখন কখনো খ-াইবার নয়। তাই, মহা-আড়ম্বরে উদযাপিত এই উন্নয়ন দশকই ২৭শে অক্টোবরের হোতা আইয়ুব ও তার সাঙ্গোপাঙ্গদের কাল হইল। ক্ষমতার দাপট ও শাসন-শোষণে জর্জরিত নিঃস্ব-নিঃসম্বল কঙ্কালসার মানুষের ধৈর্যের বাঁধে ভাঙন ধরিল। চাকার নিচের ফণিনীর মতো মোচড় খাইয়া ওঠা মানুষের ক্রুদ্ধ আক্রোশের প্রচ- আঘাতে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুবের ‘তখতে তাউস‘ ভাঙিয়া খান খান হইয়া গেল।
২৭শে অক্টোবর আবার ঘুরিয়া আসিয়াছে। আজ মনে পড়ে কী করিয়া পূর্ব পাকিস্তানি আদি পুরুষদের নমঃশূদ্র সাজানো হইয়াছিল, কী করিয়া পূর্ব পাকিস্তানিদের ছাত্রসমাজকে ‘হায়ান’ বলিয়া গালিগালাজ করা হইয়াছিল, কী করিয়া এদেশের মানুষকে ‘কেরায়া কা টাট্টু’ বানানো হইয়াছিল, কী করিয়া ‘মসজিদে’ ‘মসজিদে’ মোনায়েম খানের ‘আমিরুল মুসলেমিন‘ অর্থাৎ আইয়ুবের নামে খোতবা পড়াইবার জন্য ‘ইমাম ট্রেনিং’-এর ব্যবস্থা হইয়াছিল, কী করিয়া গরিব করদাতাদের অর্থে ‘সেইংস অব আইয়ুব’ নামের নীল কেতাব ছাপিয়া মাও সে তুংয়ি ঢঙে ‘অমর’ বনিবার চেষ্টা চলিয়াছিল, কী করিয়া পাশর্^চর-পুত্র রাতারাতি কোটি কোটি টাকার শিল্প এস্টেটের মালিক বনিয়াছিলেন, কী করিয়া সমগ্র শাসনযন্ত্রের ‘মাথা’গুলোকে ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েসে’ পরিণত করা হইয়াছিল, কী ইলজাম দিয়া শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো নেতাকে কারারুদ্ধ করা হইয়াছিল, ইত্তেফাক সম্পাদককে গ্রেপ্তার করিয়া পত্রিকার কণ্ঠ স্তব্ধ করা হইয়াছিল, শেখ মুজিবকে ষড়যন্ত্র মামলার আসামি করা হইয়াছিল এবং আরও কত কী! ইতিহাস নিজ নিয়মে চলে। আর চলার পথের বাঁকে বাঁকে উত্তরসূরিদের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষাও রাখিয়া যায়। আইয়ুব ও তার তাঁবেদাররাও রাখিয়া গিয়াছেন। ক্ষমতা দখলকালে জাতির প্রতি তার প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের পরিণতি হিসেবে জাতি আজ পাইয়াছে মানুষে মানুষে ঘৃণা-বিদ্বেষ আর সন্দেহের রক্তবীজ। ক্ষমতায় আবির্ভাব পর্বে জনগণকে সাধু সাধু কথার ধোঁকায় মোহাচ্ছন্ন রাখিয়া জনগণের সর্বস্ব অপহরণের গোপন দুরভিসন্ধি চরিতার্থ করিবার জন্যই আইয়ুব জনগণকে সর্বপ্রযত্নে দূরে সরাইয়া রাখিয়াছেন, একশ্রেণির স্বার্থান্বেষী গাদ্দারের জন্ম দিয়া দেশকে চষিয়া ছাড়িয়াছেন, অসহায় মানুষের চামড়া দিয়া ডুগডুগি বাজাইয়াছেন। ক্ষমতার অপব্যবহার ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের ভাগ্য গড়িবার সহায়ক হইলেও দেশ ও দশের যে কী সর্বনাশ সাধন করিতে পারে, দেশের বর্তমান হালহকিকতই তাহার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। স্বাধীনতা অর্জন করা সহজ; কিন্তু উপভোগ করা যে কত কঠিন, আইয়ুবের শাসনামলই তার প্রমাণ। তাই আগামী দিনের ইতিহাসে আইয়ুব-মোনেমের গাদ্দারি আর তাদের ভাঁড় গোষ্ঠীর ভাঁড়ামি যাতে এদেশের মাটিতে শেষ গাদ্দারি ও ভাঁড়ামি হয়, ক্ষমতাসীন মহল হইতে শুরু করিয়া দেশের প্রত্যেকটি মানুষকে আজ সেই সংকল্পই গ্রহণ করিতে হইবে। (সংক্ষেপিত)
লেখক: সিরাজুদ্দীন হোসেন ২৭ অক্টোবর, ১৯৬৯
