দেশ পেল অন্যরকম সম্মান

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৭:০৩ এএম

মিলল অনেক প্রতিশ্রুতি অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে অংশ নিয়ে বিশ্ববাসীকে চেনালেন নতুন বাংলাদেশ। দেশের ভাবমূর্তির পাশাপাশি বিশ্বমঞ্চে জুলাই-বিপ্লব পেল গ্রহণযোগ্যতাও। নানা কারণে প্রধান উপদেষ্টার এ সফরকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে গণতন্ত্র, মানবাধিকারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশের যে ভাবমূর্তি সংকট ছিল, এ সফরে সেটা কাটানোর চেষ্টা করা হয়েছে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিও তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৯তম সম্মেলনে যোগ দিতে নিউ ইয়র্কে চার দিনের সফরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোসহ ১২টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রধান। এ ছাড়া সাইডলাইনে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট, আইএমএফের প্রেসিডেন্টসহ ৪০টি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নিয়েছেন তিনি। স্বাভাবিকভাবে দেশের মানুষের কৌতূহল এতে বাংলাদেশ কী পেল।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অধ্যাপক ইউনূস এ সফরে বিভিন্ন ইস্যুতে যেসব বৈঠক করেছেন, তা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থরক্ষায় ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিপক্ষীয় বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ও প্রয়োজনের আলোকে হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দেশের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে আস্থার জায়গাটা তৈরি করেছেন নোবেলজয়ী এ অর্থনীতিবিদ। এতে যেমন বাংলাদেশের অনেক সম্ভাবনাকে বাস্তবায়নের পথে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে, তেমনি অর্থনৈতিক সংস্কারে এসেছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিশ্রুতি।

সাইডলাইনে ড. ইউনূসের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের বৈঠকে সংস্কারমূলক কাজের জন্য বিশ্বব্যাংক ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। বিগত সরকারের সময়ে দুর্নীতি ও মূল্যস্ফীতিসহ নানা কারণে উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষ পায়নি। ফলে বিশ্ব সম্প্রদায় এ অবস্থা থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাত সংস্কারে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে।

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এ সফর নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য অন্তর্র্বর্তী সরকারের কর্মপরিকল্পনার সমর্থন বিশ্ববাসীর কাছ থেকেও তিনি আদায় করে নিয়েছেন। বিশেষ করে পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনা।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ছাড়াও পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের সঙ্গে বৈঠক হয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের। ব্লিঙ্কেনের সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সহযোগিতারও আশ্বাস দিয়েছে।

শুধু তাই নয়, সাইডলাইনে ড. ইউনূসের সঙ্গে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার ঘোষণা দেয় চীন, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখতে হবে। ভারতের সঙ্গে বৈরিতা নয়, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে হবে। এ অবস্থায় সাইডলাইনের বৈঠকগুলোতে ড. ইউনূস বাংলাদেশের সামনে বিদ্যমান আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জগুলো যথাযথভাবেই তুলে ধরেছেন। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান না হলে কিংবা বাংলাদেশকে অস্থির করার চেষ্টা হলে এর প্রভাব পুরো অঞ্চলে পড়বে। সার্কের মতো সম্ভাবনাময় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থাকে নতুনভাবে সক্রিয় করে তুলতে তিনি পাকিস্তানের সহযোগিতা কামনা করেন। বলাবাহুল্য, সার্ককে এগিয়ে নিতে পারলে তা এ অঞ্চলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারবে।

ড. ইউনূস বাংলাদেশকে ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও উন্নয়নের ধারণাকে নতুনভাবে বিশে^র সামনে তুলে ধরেছেন। আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে আসিয়ানের সদস্যপদ লাভের সদিচ্ছা পোষণ করেছেন।

ড. ইউনূস সার্কের মতো আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়াস এবং রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের গুরুত্ব তুলে ধরার মধ্য দিয়ে তিনি তার প্রজ্ঞা, মেধা ও কূটনৈতিক দক্ষতা বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন।

বলাবাহুল্য, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সম্মিলিত স্বার্থ, নিরাপত্তা ও সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সার্কের যে সম্ভাবনা ছিল, গত চার দশকেও তা সফল হয়নি। বিগত সরকারের ভারতনির্ভর পররাষ্ট্রনীতির কারণে শুধু আঞ্চলিক সহযোগিতাই নয়, বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের, কানেকটিভিটি, সহযোগিতা ও সম্পর্কের প্রত্যাশিত উন্নয়নও সম্ভব হয়নি। বিশেষত পশ্চিমা উন্নয়ন সহযোগী ও বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েনের সঙ্গে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রশ্নগুলোও জড়িত ছিল।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্ব পরিমন্ডলে ড. ইউনূসের উচ্চ অবস্থান, মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক নেতৃত্বের অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে বাণিজ্য, উন্নয়ন ও ভারসাম্যপূর্ণ সহযোগিতামূলক ভূমিকার পাশাপাশি পাকিস্তান-ভারতসহ সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্যোগ অনেক সমস্যা সমাধানের পথ দেখাবে।

জাতিসংঘে ড. ইউনূস গত শুক্রবার ভাষণ দিয়েছেন। ভাষণে সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়ায় ‘জুলাই বিপ্লব’ ছাড়াও দেশের সার্বিক পরিস্থিতি, তার সরকারের আগামী কর্মসূচি ও বিশ্ব পরিস্থিতি তুলে ধরেন। ছাত্র-জনতার সফল বিপ্লবের গৌরবগাথা নিয়ে ‘দ্য আর্ট অব ট্রায়াম্ফ’ বা বিজয়ের শিল্পকর্ম রাষ্ট্রনেতাদের হাতে তুলে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নোবেলজয়ী ড. ইউনূস নিজেই যেন একজন বিশ্বজয়ী রাষ্ট্রনায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। একটি রক্তাক্ত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যেসব রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে, জাতিসংঘে ড. ইউনূসের এ সফর সেসব চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা উত্তরণের পথ খুলে দিয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত