মেসির অনন্য রেকর্ড

আপডেট : ২৯ জুন ২০২৬, ০৩:২৬ এএম

টানা তিন জয়ে পূর্ণ ৯ পয়েন্ট, গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নকআউটের টিকিট, অধিনায়ক লিওনেল মেসির পায়ে একের পর এক বিশ্বরেকর্ড আর সবচেয়ে বড় কথা স্কোয়াডের প্রতিটি আউটফিল্ড খেলোয়াড়কে মাঠে নামিয়ে পরখ করে নেওয়া; ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে এর চেয়ে আদর্শ গ্রুপ পর্ব আর কী-ইবা হতে পারত আর্জেন্টিনার জন্য!

শনিবার রাতে ডালাসের আর্লিংটন স্টেডিয়ামে জর্ডানকে ৩-১ ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়ে লিওনেল স্কালোনির দল যেন প্রতিপক্ষদের স্পষ্ট বার্তা দিয়ে রাখল আর্জেন্টিনার ডাগআউটে বসে থাকা ‘বেঞ্চ’ যেকোনো দলের মূল একাদশের চেয়ে কম শক্তিশালী নয়।

প্রথম দুই ম্যাচ জিতে আগেই শেষ ৩২ নিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় এই ম্যাচে পরীক্ষা-নিরীক্ষার এক দারুণ সাহসী ছক কষেন কোচ স্কালোনি। আগের অস্ট্রিয়া ম্যাচের একাদশ থেকে একে একে ৯ জন খেলোয়াড়কে বিশ্রাম দেন তিনি। কড়া এই লং-সিজনের পর কাইলিয়ান এমবাপ্পেদের মতো তারকাদের যেখানে ইনজুরি ও ক্লান্তির আশঙ্কায় ভুগতে হচ্ছে, সেখানে স্কালোনি তার সেরা অস্ত্রদের দিলেন ফুরফুরে বিশ্রামের সুযোগ।

দলের দুই বিশ্বস্ত সেনা গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ এবং স্ট্রাইকার লাউতারো মার্টিনেজ ছাড়া পুরো দলটাই বদলে ফেলা হয়। নিকোলাস পাজ, মার্কোস সেনেসি, গিউলিয়ানো সিমিওনেদের মতো একঝাঁক তরুণ ও নতুন মুখকে দিয়ে সাজানো হয় শুরুর একাদশ। আর স্কালোনির এই ভরসার প্রতিদান তরুণরা দিয়েছেন মাঠের খেলায় জর্ডানকে পুরোপুরি কোণঠাসা করে।

চলতি বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচে আর্জেন্টিনার করা ৫টি গোলের সবকটিই এসেছিল লিওনেল মেসির পা থেকে। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক আর অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল সমালোচকরা যখন আলতো করে বলতে শুরু করেছিলেন আর্জেন্টিনা আবার ‘মেসি-ডিপেন্ডেন্ট’ হয়ে উঠছে, ঠিক তখনই জর্ডান ম্যাচে জাদুকরকে ছাড়াই প্রথমার্ধে জোড়া গোল করে লিড নেয় আলবিসেলেস্তেরা।

১৯ মিনিট আর্জেন্টিনার হয়ে টুর্নামেন্টে মেসি বাদে প্রথম গোলদাতা হিসেবে খাতা খোলেন জিওভানি ল চেলসো। ম্যাচের শুরু থেকেই দারুণ ছন্দে থাকা এই রিয়াল বেতিস মিডফিল্ডারকে বক্সের ঠিক বাইরে ফাউল করেন জর্ডানের ডিফেন্ডার মোহান্নদ আবুতাহা (যার জন্য তাকে হলুদ কার্ড দেখতে হয়)। প্রাপ্ত ফ্রি-কিক থেকে ল চেলসো বাঁ পায়ের এক নিখুঁত, বাঁকানো শটে বল জর্ডানের দেয়াল টপকে জালে জড়ান। ২০১৪ বিশ্বকাপে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে মেসির পর এই প্রথম বিশ্বকাপে কোনো আর্জেন্টাইন সরাসরি ফ্রি-কিক থেকে গোল করার গৌরব অর্জন করলেন। কাতার বিশ্বকাপ ইনজুরির কারণে মিস করা ল চেলসোর জন্য এটি ছিল আবেগের এক পরম মুহূর্ত।

প্রথমার্ধেই ব্যবধান দ্বিগুণ করেন লাউতারো মার্টিনেজ। ল চেলসোর একটি ক্রস থেকে লাউতারোর করা জোরালো শট জর্ডানের গোলরক্ষককে পরাস্ত করলেও ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। ফিরতি বলে জুলিয়ান আলভারেজ হেড করতে গেলে জর্ডানের ডিফেন্ডার নিজার আলরাশদান বিপজ্জনকভাবে পা তুলে তার মাথায় আঘাত করেন। রেফারি ইস্তভান কোভাকস ভিএআর রিভিউ দেখে পেনাল্টির বাঁশি বাজান। স্পট কিক থেকে ঠাণ্ডা মাথায় বল জালে জড়িয়ে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম গোলের দেখা পান ইন্টার মিলান অধিনায়ক।

ম্যাচের ৫৫ মিনিটে স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে থাকা জর্ডানের সমর্থকরা উৎসবে মেতে ওঠেন। জর্ডানের অধিনায়ক এহসান হাদ্দাদ ডান প্রান্ত থেকে রক্ষণ চিরে এক নিচু ক্রস বাড়ান, যা চলন্ত মাপা শটে জালে পাঠান বদলি হিসেবে নামা তারকা মুসা আলতামারি। ২০২৬ বিশ্বকাপে এই প্রথম আর্জেন্টিনার গোলপোস্টের বাজপাখি এমি মার্টিনেজকে পরাস্ত হতে হলো।

ম্যাচের ৬০ মিনিটে গ্যালারির গর্জন জানিয়ে দিচ্ছিল রাজা মাঠে নামছেন! ৩৯ বছরে পা দেওয়া লিওনেল মেসিকে যখন লাউতারোর পরিবর্তে মাঠে নামানো হয়, তখন জর্ডানের ম্যাচে সমতা ফেরানোর স্বপ্ন এক নিমেষেই মিলিয়ে যায়। আর ৮০ মিনিটে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বক্সের ২৫ মিটার দূরে মেসিকে ফাউল করা হলে আর্জেন্টিনা ফ্রি-কিক পায়। নিজের চিরচেনা স্পট থেকে মেসি বাঁ পায়ের শটে বল জর্ডানের দেয়ালের পাশ দিয়ে পোস্টের কোণ দিয়ে জালে জড়ান। জর্ডান গোলরক্ষক ইয়াজিদ আবুলাইলা বলের গতিপথ বুঝতেই পারেননি।

এই গোলের সঙ্গে সঙ্গেই ফুটবল ইতিহাসের পাতায় নতুন এক মহাকাব্য রচনা করলেন মেসি। তিনি বিশ্বের প্রথম ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপের টানা ৭টি ম্যাচে গোল করার অনন্য নজির গড়লেন। এই রেকর্ডের পথে মেসি ছাড়িয়ে গেছেন ১৯৫৮ সালের ফ্রান্সের কিংবদন্তি জুস ফন্তেইন ও ১৯৭০ সালের ব্রাজিলের গ্রেট জেয়ারজিনহোকে (দুজনেই টানা ৬ ম্যাচে গোল করেছিলেন)। এই টুর্নামেন্টে ৬ গোল নিয়ে গোলদাতার তালিকায় সবার ওপরে আছেন মেসি, আর সব মিলিয়ে বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা এখন রেকর্ড-বর্ধিত ১৯টি।

ইতিহাসের সর্ববৃহৎ ৪৮ দলের এই বিশ্বকাপে কেবল আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স এবং স্বাগতিক মেক্সিকোই গ্রুপ পর্বের ৩ ম্যাচের সবকটিতে জিতে পূর্ণ ৯ পয়েন্টের ‘ক্লিন সুইপ’ রেকর্ড ধরে রাখতে পেরেছে। ২০১০ ও ২০১৪ সালের পর এই নিয়ে পঞ্চম বার গ্রুপ পর্বে শতভাগ জয়ের রেকর্ড গড়ল আকাশি-সাদারা।

ম্যাচ শেষে দারুণ তৃপ্ত আর্জেন্টাইন মাস্টারমাইন্ড লিওনেল স্কালোনি। তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্যই ছিল স্কোয়াডের সবাইকে ম্যাচের আবহ দেওয়া, কারণ তারা প্রত্যেকেই এটা পাওয়ার যোগ্য। ছেলেরা জর্ডানের মতো কঠিন ও শারীরিক ফুটবলের বিপক্ষে নিজেদের প্রমাণ করেছে। আমাদের বেঞ্চ কতটা শক্তিশালী, তা আজ সবাই দেখল। তবে ভালো অংশটা (নকআউট) কিন্তু এবার শুরু হতে যাচ্ছে। এখন আর ভুলের কোনো সুযোগ নেই।’

আগামী শুক্রবার (৩ জুলাই) শেষ ৩২-এর মহালড়াইয়ে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ আফ্রিকার নবাগত ও চমক দেখানো দল কেপ ভার্দে। নকআউটের এই হাইভোল্টেজ ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে। কাকতালীয়ভাবে, মায়ামিই বর্তমানে লিওনেল মেসির ক্লাব ফুটবলের ঠিকানা (ইন্টার মিয়ামি)। ফলে নিজের ‘সেকেন্ড হোম’ বা ঘরের মাঠের দর্শকদের সামনেই ২০২৬ বিশ্বকাপের ট্রফি ধরে রাখার নকআউট মিশন শুরু করতে যাচ্ছেন ফুটবল ঈশ্বর।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত