সাম্বা বনাম সামুরাই

আপডেট : ২৯ জুন ২০২৬, ০৩:২৬ এএম

বিশ্বকাপের নকআউটের মঞ্চে এর চেয়ে আকর্ষণীয় সমীকরণ আর কী হতে পারে! একদিকে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল, যারা প্রথম ম্যাচের ধাক্কা সামলে চেনা ছন্দে ফিরতে শুরু করেছে। অন্যদিকে এশিয়ার পরাশক্তি জাপান, যারা টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই নিজেদের ‘ডার্ক হর্স’ হিসেবে জানান দিয়ে রেখেছে। আজ সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে যখন শেষ ৩২-এর হাইভোল্টেজ ম্যাচে এই দুই দল মুখোমুখি হবে, তখন মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি চলবে পুরনো হিসাব-নিকাশ চুকানোর যুদ্ধ।

ব্রাজিলের সামনে এটি যেমন গত বছরের এক লজ্জাজনক হারের প্রতিশোধ নেওয়ার মঞ্চ, জাপানের সামনে তেমনি ইতিহাস গড়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট জয়ের সুবর্ণ সুযোগ।

ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ড কার্লো আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিল দল এখন বিশ্বকাপের অন্যতম হট ফেভারিট হলেও, তার দায়িত্ব নেওয়ার শুরুর দিকটা মোটেও মসৃণ ছিল না। বিশেষ করে ২০২৫ সালের অক্টোবরে টোকিওর সেই প্রীতি ম্যাচের স্মৃতি এখনো সেলেসাওদের মনে টাটকা। সেদিন জাপানের বিপক্ষে ২-০ গোলে এগিয়ে থেকেও মাত্র ২০ মিনিটের ঝড়ে ৩-২ ব্যবধানে হেরে মাঠ ছেড়েছিল ব্রাজিল। জাপানের ফুটবল ইতিহাসে ব্রাজিলের বিপক্ষে ১৪ বারের দেখায় সেটিই ছিল প্রথম এবং একমাত্র জয়।

হিউস্টনের এই নকআউট ম্যাচে সেই হারের শোধ নিতে ব্রাজিল যে কতটা ক্ষুধার্ত থাকবে, তা ভালো করেই জানেন জাপান কোচ হাজিমে মরিয়াসু। তিনি বলেন, ‘হয়তো ওই হারের কারণে ওরা এই ম্যাচে আরও বেশি অনুপ্রাণিত থাকবে। আমরা এমন এক ব্রাজিলের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি, যারা জয়ের জন্য ক্ষুধার্ত। আমি এই লড়াইয়ের অপেক্ষায় আছি।’

টোকিওর সেই ঐতিহাসিক জয়ের পর থেকে এই কয়েক মাসে দুই দলেরই খোলনলচে অনেকটাই বদলে গেছে। ইনজুরির কারণে মহাবিপদে আছেন জাপান কোচ মরিয়াসু। এই বাঁচা-মরার লড়াইয়ে তিনি পাচ্ছেন না অধিনায়ক ওয়াতারু এন্দো, দলের দুই প্রধান উইঙ্গার কাওরু মিতোমা ও তাকেফুসা কুবো এবং গত ম্যাচে গোল করা ফরোয়ার্ড তাকুমি মিনামিনোকে।

প্রথম ম্যাচে মরক্কোর সঙ্গে ১-১ ড্রয়ের পর সমালোচনা ধেয়ে এসেছিল ব্রাজিলের দিকে। কিন্তু এরপরই হাইতি এবং স্কটল্যান্ডকে ব্যাক-টু-ব্যাক ৩-০ ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়ে গ্রুপ ‘সি’-এর চ্যাম্পিয়ন হয়ে মাঠ ছাড়ে তারা। গ্রুপ পর্বে ৪টি গোল করে আগুনে ফর্মে আছেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। আর সবচেয়ে বড় স্বস্তি তিন বছর ইনজুরির কবলে থাকার পর জাতীয় দলে ফিরেছেন মহাতারকা নেইমার জুনিয়র। কোচ আনচেলত্তি অবশ্য দলকে মাটিতেই রাখছেন, ‘আমরা নিখুঁত নই, আমাদের বলের গতি আরও বাড়াতে হবে। তবে প্রথম ম্যাচের চেয়ে দল অনেক উন্নতি করেছে। এখন এটা নকআউট, এখানে আসল কলিজা দেখাতে হবে।’

ম্যাচ শুরুর আগেই মাঠের বাইরের পারদ চড়িয়ে দিয়েছেন জাপানের ২১ বছর বয়সী তরুণ স্ট্রাইকার কেন্তো শিওগাই। ইউরোপীয় ফুটবলে সদ্য আলো ছড়ানো এই স্পিডস্টারকে যখন ব্রাজিল এবং জাপানের বিপক্ষে নেইমারের অতীত রেকর্ড নিয়ে প্রশ্ন করা হয়, তিনি বেশ খোলামেলা জবাব দেন, ‘সে তো আর আগের সেই পুরনো নেইমার নেই, তাই না? আমার মনে হয় আমাদের রক্ষণ এখন বেশ ভালো করছে। ব্রাজিল একসময় শক্তিশালী ছিল, কিন্তু এখন কি আর তেমন আছে? আমার চোখে এখন ফ্রান্স বা আর্জেন্টিনা বেশি শক্তিশালী। ইদানীং ব্রাজিলের কথা তেমন শুনতেই পাই না।’ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিওগাইয়ের এই মন্তব্য মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। যদিও পরে তিনি সুর নরম করে বলেন, ‘ব্রাজিল অবশ্যই শক্তিশালী দল। তবে আমরা যদি ওদের হারাতে পারি, তবে আমাদের আত্মবিশ্বাস ও গতি বহুগুণ বেড়ে যাবে।’

এই ম্যাচের আবহ জুড়ে আছেন ব্রাজিল ও জাপানের ফুটবলের সেতুবন্ধ কিংবদন্তি জিকো। নব্বইয়ের দশকে জাপানি ফুটবলকে পেশাদার রূপ দিতে কাজ করা জিকো ২০০৬ বিশ্বকাপে জাপানের কোচ ছিলেন। কাকতালীয়ভাবে, সেবার গ্রুপ পর্বে ব্রাজিলের কাছে ৪-১ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছিল জিকোর জাপান। ২০ বছর পর এবার নকআউটে সেই হিসাব চুকানোর পালা সামুরাই ব্লুদের।

তবে ইতিহাস কিন্তু জাপানের পক্ষে কথা বলছে না। বিশ্বকাপে নকআউট পর্বে জাপান আজ পর্যন্ত কোনো ম্যাচ জিততে পারেনি (৪ ম্যাচের ৪টিতেই হার)। এছাড়া লাতিন আমেরিকার দলগুলোর বিপক্ষে বিশ্বকাপে ৫ ম্যাচ খেলে মাত্র ১টিতে জিতেছে তারা। অন্যদিকে, ১৯৯০ সালের পর ব্রাজিল কখনোই বিশ্বকাপের প্রথম নকআউট বাধা (রাউন্ড অব ১৬/৩২) থেকে বিদায় নেয়নি।

কাগজে-কলমে এবং সাম্প্রতিক ফর্মে কার্লো আনচেলত্তির ব্রাজিলই ফেভারিট হিসেবে মাঠে নামবে। তবে ইনজুরিতে জর্জরিত হলেও কাউন্টার-অ্যাটাকে জাপানের গতি এবং নিখুঁত ট্যাকটিক্যাল ডিসিপ্লিন যেকোনো মুহূর্তে স্তব্ধ করে দিতে পারে সেলেরাওদের। হিউস্টনের মাঠে সোমবারের এই ম্যাচটি তাই হতে যাচ্ছে কৌশল আর গতির এক চরম প্রদর্শনী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত