বৈচিত্র্যের জয়গান থেকে ‘ক্যানসেল কালচার’

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১২:৩৬ এএম

পিচ ফাজ- নতুন এই শব্দযুগলের সঙ্গে সম্প্রতি পরিচয় আর এর অর্থ কী তা জানতে পেরে সোজা বাংলায় আমার মুখ কিছুক্ষণ হাঁ হয়ে ছিল তা অস্বীকার করার উপায় নেই। আমার মতো মিলেনিয়ালের বিষয়টি জানা থাকার কথাও নয়। জেনারেশন জি বা জেন জি অর্থাৎ যারা ১৯৯৫ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে জন্মেছেন তাদের ভাষার প্রয়োগ ভিন্ন এবং শব্দভান্ডার ক্রমবর্ধনশীল। সেই ভান্ডারের একটি রত্ন পিজ ফাজ- যার অর্থ ত্বকের ওপর থাকা মৃদু কেশ, অনেকটা পিচ ফলের চামড়ার ওপর যেমন থাকে। আরও জানতে পারলাম বিশেষ ধরনের মাইক্রো রেজারের মাধ্যমে এই কেশ ছেঁটে ফেলা সম্ভব এবং এর বহুল প্রয়োগ প্রচলিত। মনে হলো আমি আসলে ‘ক্যানসেল’ হয়ে গেছি। যারা এ বিষয়ে স্বল্প অবগত, ‘ক্যানসেল কালচার’ বা ‘বাতিল সংস্কৃতি’ হলো সামাজিক মাধ্যমে জনতার রায়। কোনো মতকে প্রশ্নবিদ্ধ করার মাধ্যমে বাতিল করার এই রীতি এখন বেশ বিতর্কিত নিজ গুণেই।

নব্বইয়ের দশকে বেড়ে উঠতে গিয়ে সৌন্দর্যের নানা ধরনের মানদণ্ডে নিজেদের মাপতে হয়েছে বারবারই। থ্রেডিং-এর মাধ্যমে ভ্রুকে আঁকার দেওয়া বা ঠোঁটের ওপরের অবাঞ্ছিত লোম ছেঁটে ফেলার যন্ত্রণাদায়ক চল এখনো বয়ে চলেছি। আমার এক বন্ধু গোটা মুখ ব্লিচ করে ফেলেছিল যাতে লোম দেখা না যায়। আর সেই সঙ্গে ফর্সা দেখানোর যুদ্ধ আমাদের বেশ ঢাল-তলোয়ার সমেত লড়া হতো। ফেয়ার অ্যান্ড লাভলির স্যাশে প্যাকেট প্রত্যন্ত অঞ্চলের মুদির দোকানেও সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া পণ্য ছিল, এমনকি সাবান মেখেও ফর্সা হওয়া সম্ভব এমন বিজ্ঞাপন চোখে পড়ত টিভি ছাড়লেই।

কালে কালে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি হয়েছে গ্লো অ্যান্ড লাভলি ফর্সা নায়িকারা এখন ক্রিম, সাবান মেখে নজরকাড়া উজ্জ্বলতা পাওয়ার প্রচার চালান, অনেকে তো এর সঙ্গে আরেকটু প্রগতিশীল হয়ে উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের কথাও বলেন। খোলস পাল্টে পাল্টে সৌন্দর্য পণ্যের বিশাল বাজার এমন এক দৈত্যের আকার নিয়েছে যার শক্তি কখনো কমবে বলে বিশ্বাস হতে চায় না। অথচ এক সময় মনে করতাম নতুন প্রজন্ম বিদ্বেষমূলক ও পশ্চাৎপদ এসব ধারণাকে উপড়ে ফেলে দেবে। ক্রমশ সমতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে থাকা নারীরা কেবল ভালো দেখানোর পেছনে সময়, শ্রম ও অর্থব্যয়ের পরিমাণ কমিয়ে আনবেন। নিউ ইয়র্ক পোস্টে গত বছরের মার্চে একটি গবেষণা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়, যেখানে বলা হয় ৯৩টি দেশের ৯০ হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারীর ওপর একটি সমীক্ষা চালানো হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, একজন নারী দৈনিক গড়ে চার ঘণ্টা সময় সুন্দর দেখানোর পেছনে ব্যয় করেন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চার ঘণ্টা মেকআপ আর গ্রুমিং এই পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি জনশক্তিকে নিযুক্ত করে রাখার পেছনের আর্থ-রাজনৈতিক সমীকরণটা কী হতে পারে সেটা ভেবে দেখা যায়।

ফেসবুক-টিকটক-ইনস্টগ্রাম-ইউটিউব ভর্তি হয়ে আছে নানা ধরনের মেকআপ টিউটোরিয়ালে। বয়স, গড়ন, বর্ণ, ত্বকের ধরনভেদে সব নারীকে একই রকম দেখানোর জোর চেষ্টায় সবাই মত্ত। সহস্রাব্দের আবির্ভাবে বিশ্বগ্রামের বাসিন্দা হয়ে আমরা বৈচিত্র্যের জয়গান গাচ্ছিলাম। জেন জি সংস্কৃতিতে বরং বৈচিত্র্যহীনতা প্রকটতর হয়ে চোখে পড়ে।

কদিন আগে ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘অন্তরমহল’ সিনেমায় একটি দৃশ্যে রীতিমতো ধাক্কা খাই। জমিদার বাবু যখন আচমকা নিজের জ্যেষ্ঠা স্ত্রীর ঘরে রাত কাটানোর অভিলাষ ব্যক্ত করেন, তখন সহচরী চটজলদি নাপিতের বৌকে ডেকে আনার প্রস্তাব দেন। ১৮শ শতকের শেষ ভাগে রমণীদের চকচকে লোমহীন পা দেখে আমার সন্দেহটা আগেই জেগেছিল, চলচ্চিত্রিক বয়ানের মধ্যেই তার ন্যায্যতা দিলেন ঋতুপর্ণ। সিনেমাটিতে অন্তরমহলে নারীর বন্দিত্বের নানা দম আটকানো দশাই তুলে ধরা হয়েছে। শুধু তাই নয়, সময়ের সঙ্গে বন্দিত্বের এই শেকল নারী নিজেই যেন আঁকড়ে ধরেছেন। মাইক্রো রেজার দিয়ে পিচ ফাজও ছেঁটে ফেলছেন কেন, মানবদৃষ্টিতেও যা খুব সহজে ধরা পড়ে না। ত্বকে ধরনের দাগ বা ভাঁজই দৃষ্টিগ্রাহ্য হচ্ছে না। এই দৃষ্টি কি মানুষের না ক্যামেরার?

দীর্ঘদিন প্রচারমাধ্যমে কাজ করার অভিজ্ঞতায় এটুকু জানি ক্যামেরার চোখ অনেক বেশি প্রখর, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয় তীব্রভাবে ধরা দেয়। যারা ক্যামেরার সামনে উপস্থিত হতেন তাদের ভ্রু, ঠোঁটের ওপরের লোম, হাতের লোম কিংবা ত্বকের দাগ নিয়ে অনেক বেশি সচেতন থাকতে হতো। বলা হতো, এক কেজি ওজন বাড়লে ক্যামেরায় তা দেখায় ১০ কেজি। তাই ওজনের দিকেও বিশেষ নজর দিতে হতো। স্টোরিজ, শর্টস আর রিলসের এই সময়ে সবাই সব সময় ক্যামেরার সামনে পারফর্ম করছেন। সব অভিব্যক্তিই এখন ‘পাবলিক’। ব্যক্তিস্বাধীনতা আর স্বকীয়তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এই প্রজন্মের প্রায় প্রতিটি মুহূর্ত নিবন্ধিত হয় ক্যামেরায় আর প্রদর্শিত হতে থাকে চক্রাকারে। প্রদর্শনকামিতা এই প্রজন্মের সামষ্টিক অবচেতনে এমনভাবে গেঁথে গেছে যে, তারা প্রতিটি কাজের মূল্য/লক্ষ্য যাচাই করছে প্রদর্শনের উপযোগিতা দিয়ে।

প্রায় ১০০ বছর আগে ১৯২৯ সালে ব্রিটিশ লেখিকা ভার্জিনিয়া উলফ লেখেন তার বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘আর রুম অব ওয়ান’স ওউন’ যা নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতার বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দিয়েছিল। পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নারীর ওপর পারিবারিক ও সামাজিক প্রত্যাশা ও দায়িত্বের যে ভার থাকে তা তার সৃজনশীল সত্তাকে কীভাবে গলা টিপে মেরে ফেলে তারই ব্যাখ্যা তিনি দিয়েছেন। নারীকে পুরুষনির্মিত বাহ্যিক বাধা পেরুনোর পাশাপাশি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চেতনায় অন্তরীণ বাঁধার শেকলও ভাঙতে হয়। একুশ শতকে এসে নারী এক নয়, একাধিক নিজস্ব প্রকোষ্ঠের মালিক হতে পেরেছে ঠিকই তবে তা আর ‘প্রাইভেট’ নয়। সেইসব প্রকোষ্ঠে অনেকেই ঢুকে পড়তে পারছেন যখন তখন। তাই লড়াইটা এখন কার বিরুদ্ধে? ব্যক্তি, চিন্তা, ব্যবস্থা না কাঠামো? নাকি পরোক্ষ অবদমন আর পীড়নের নতুন ধাপে আমরা?

লেখক : সাংবাদিক ও অনুবাদক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত