শ্রমিক অসন্তোষের পর ১৮ দফা দাবি মেনে নেওয়ায় শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ার কারখানাগুলো অনেকটা শান্ত। তবে গতকাল শনিবার দুপুরে আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকায় বহিরাগতদের হামলায় অর্ধশত আহত হয়েছে। এ ঘটনায় আটক করা হয়েছে ১৭ জনকে।
গতকাল ডংলিয়ান ফ্যাশন লিমিটেড নামক চায়না মালিকানাধীন কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাই কেন্দ্র করে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে শ্রমিকদের বাগবিতন্ডা হয়। এ সময় শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে কর্মবিরতি পালন করেন। এর মধ্যে বহিরাগত লোকজন শ্রমিকদের ওপর হামলা চালায়। লোহার রড, স্টিলের পাইপ, কাঠ ও বাঁশের লাঠি দিয়ে শ্রমিকদের পেটানোর ঘটনা ঘটে।
খবর পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ ও যৌথ বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে হামলাকারী কনকসহ ১৭ জনকে আটক করে থানায় নিয়ে যান। পরে কারখানাটি সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কারখানাটির এক শ্রমিক জানান, কিছুদিন আগে শ্রমিকদের দাবির মুখে নানা অনিয়মের অভিযোগে কারখানার এইচআর ম্যানেজার রফিকুল ইসলামসহ চার কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এ ঘটনায় কারখানা কর্তৃপক্ষ আন্দোলনকারী শ্রমিকদের মধ্য থেকে ৮৮ জনকে ছাঁটাই করে।
অন্য এক শ্রমিক বলেন, ‘কারখানার শ্রমিকরা যাতে দাবি আদায়ে আন্দোলন করতে না পারে, এজন্য কারখানা কর্তৃপক্ষ এক হাজার টাকা হাজিরায় বহিরাগত তিনশ লোক নিয়োগ করেছে। তারা সাদা এবং কালা গেঞ্জি পরে প্রতিদিন কারখানার ভেতরে এবং বাইরে পাহারা দেয়। এদিকে আজ (শনিবার) আবার কারখানা কর্তৃপক্ষ চাকরিচ্যুত চার কর্মকর্তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল করলে শ্রমিকরা এর প্রতিবাদ করায় কনক, অনিক ও রফিকের নেতৃত্বে বহিরাগত লোক দিয়ে আমাদের ওপর হামলা চালায়।’
কারখানাটির সিকিউরিটি অফিসার আতিয়ার রহমান বলেন, কোম্পানি নিরাপত্তার জন্য হাজিরা ভিত্তিতে বহিরাগত লোক রাখা হয়েছিল। আজ (শনিবার) শ্রমিকদের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের বাগবিত-া হলে বহিরাগত লোকজন তাদের ওপর হামলা চালালে অনেকেই আহত হয়। পরে কারখানাটি ছুটি ঘোষণা করা হয়।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, স্টোর ম্যানেজার কনক ও সাব-কন্ট্রাকে কাজ করানো অনিক এলাকার প্রভাবশালীদের সঙ্গে মিলে কারখানার ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের দাপটের কাছে শ্রমিকরা অসহায়। কথায় কথায় তারা শ্রমিকদের মারধরসহ ছাঁটাইয়ের হুমকি দিয়ে থাকে। কারখানার শ্রমিকরা যাতে তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে না পারে, সেজন্য টাকা দিয়ে সন্ত্রাসী ভাড়া করে কারখানার ভেতরে এবং বাইরে পাহাড়ায় বসানো হয়েছে। সেই ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীরাই শ্রমিকদের ওপর হামলা করেছে।
অন্যদিকে আশুলিয়ার জিরাবো পুকুরপাড় এলাকায় লুসাকা গ্রুপের শ্রমিকরা সকালে কারখানায় প্রবেশ করে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে কর্মবিরতি করেন। একপর্যায়ে শ্রমিকরা সড়কে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করলে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা তাদের সরিয়ে দেন। পরে কারখানাটি শনিবারের জন্য ছুটি ঘোষণা করা হয়।
একই এলাকার তাহারাত কম্পোজিট লিমিটেড কারখানায় গত বৃহস্পতিবার ১০ দফা দাবি আদায়ে শ্রমিকদের হামলা, ভাঙচুর লুটপাটের ঘটনায় শনিবার থেকে শ্রম আইন ২০০৬-এর ১৩ (১) ধারায় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া নরসিংহপুর ইথিক্যাল গার্মেন্টস, জামগড়া এলাকার পলমল গ্রুপের আয়েশা ক্লথিং ও ইয়ারপুর এলাকার আঞ্জুমান গার্মেন্টসও অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং ইউসুফ মার্কেট এলাকার জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশনে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
আশুলিয়া শিল্প-পুলিশের এএসপি আনোয়ার হোসেন বলেন, ডংলিয়ান ফ্যাশন লিমিটেড কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাই ও চাকরিচ্যুত চার কর্মকর্তাকে পুনর্বহাল নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে বাগবিতন্ডার ঘটনায় বহিরাগতরা শ্রমিকদের ওপর হামলা চালায়। এ ঘটনায় আমরা ১৭ জনকে আটক করে যৌথ বাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছি। বর্তমানে কারখানাটিতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) শাহীনুর কবির বলেন, দু-একটি কারখানায় বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। সকাল থেকে কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। তবে শ্রম আইন ২০০৬-এর ১৩ (১) ধারায় ২৪টি কারখানা বন্ধ রয়েছে এবং কয়েকটি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
