বন্যার অজুহাতেই রাজধানীর বাজারে সবজির দামের হয়েছে মহা-উল্লম্ফন। সরকারি হিসাবেই শেষ ১০ দিনে রাজধানী ঢাকার বাজারগুলোতে সব ধরনের সবজির দাম বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কোনো কোনো সবজির দাম তিনগুণের বেশি বেড়েছে। দাম বেড়েছে মাছ, মাংস, ডিমেরও। চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় মুদিপণ্যের দামও বেড়েছে। প্রায় সব পণ্যের বাড়তি দাম যখন ভোক্তার মাথায় বোঝা হয়ে উঠেছে, তখন শাকপাতার দামও রেকর্ড ছাড়িয়েছে। লালশাক, মূলাশাক, লাউশাকের দাম বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। পানির মধ্যে বেড়ে ওঠা কচু আর কলমিশাকের দামও চোখ কপালে ওঠার মতো।
বাজারের তথ্য বলছে, গত দুই মাসে ডিম, মুরগি, সবজি ও কাঁচা মরিচের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে শাকের দাম। গত বৃহস্পতিবার (১০ অক্টোবর) রাজধানীর বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা যায়, দুই সপ্তাহের ব্যবধানেই পুঁইশাকের দাম আঁটিতে ২০ থেকে ২৫ টাকা বেড়েছে। সপ্তাহ দুয়েক আগে প্রতি আঁটি পুঁইশাক ২০ থেকে ২৫ টাকায় কিনতে পারলেও এখন তা ৪০ টাকার বেশি। পুঁইশাকের মতোই ১৫ থেকে ২০ টাকা দাম বেড়ে প্রতি আঁটি লালশাক বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকায়, ৩০ টাকার লাউশাকের দাম বেড়ে তা এখন বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০ ও এক আঁটি কলমিশাক ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকা।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, চলতি বছর আবহাওয়া অনুক‚লে না থাকায় দেশের বাজারে সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ছে। তাছাড়া চলতি বছরের দুই দফায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় অনেক ফসলি জমি নষ্ট হয়েছে। তাদের কৃষক মাঠে ফসল ফলিয়ে তুলে আনার সময় তা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় জোগান কমেছে। ফলে সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী হচ্ছে।
কারওয়ান বাজারের সবজির পাইকার ব্যবসায়ী আজাহার আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, গ্রীষ্মের শেষে সবজির দাম কিছুটা বেশি থাকে। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। পরপর দুবার বন্যা ও বৈরি আবহাওয়ার কারণে সবজির সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। প্রত্যন্ত এলাকার মোকামগুলোতে এখন সবজির দাম বেশি। তার প্রভাব রাজধানীর বাজারে পড়বে এটা খুবই স্বাভাবিক।
তবে ভোক্তারা বলছেন, ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল করে তুলেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে, আরামবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা বড় এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এ সময় দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাও টালমাটাল। আমাদের মতো সরকারি চাকুরেরাও বাজারঘাট করতে হিমশিম খাচ্ছি। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের অবস্থা কেমন হবে তা অনুমেয়।
তিনি বলেন, লাউশাক শৌখিন মানুষদের খাবার হতে পারে। কিন্তু এক আঁটি পুঁইশাক ও কলমিশাক কীভাবে ৩০ ও ৫০ টাকার ঘরে যেতে পারে? যেখানে ব্যবসায়ীরা বন্যার অজুহাত দিচ্ছেন, সেখানে স্পষ্ট যে তারা বড় কারসাজির মাধ্যমে অতিরিক্ত মুনাফা লুটছে। কেননা পুঁইশাক ও কলমিশাক পানিতেও বেঁচে থাকতে সক্ষম।
তার মতোই রাজধানীর বাজারে শাকসবজির দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে বন্যার অজুহাতকে ভিত্তিহীন বলছেন অনেকে। তাদের ভাষ্য, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ সারা দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা সবজি দিয়ে রাজধানীবাসীর সবজির চাহিদা মেটানো হলেও শাকের বেশিরভাগই আসে ঢাকার কেরানীগঞ্জ, দোহার, নবাবগঞ্জ, ধামরাই, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর থেকে। অথচ এসব অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে এবার কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তাদের ভাষ্য, মুনাফালোভী একশ্রেণির ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে দুর্বল বাজার তদারকি ব্যবস্থার কারণে।
এদিকে শাকের দামও আকাশছোঁয়ায় পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিতে পড়ছে জনসংখ্যার বড় অংশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. নাজমুল হক ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, সুস্থ ও সবলভাবে বাঁচার জন্য মানুষকে ফ্যাট, প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, মিনারেল ওয়াটারের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো থেকে দৈনিক দুই হাজার ক্যালরি গ্রহণ করতে হয়। কিন্তু বর্তমানে বাজারের যে অবস্থা চলমান, তাতে একশ্রেণির মানুষের পাত থেকে পুষ্টিকর খাবার বাদ দিতে হচ্ছে। কেউ কেউ সামান্য পরিমাণে গ্রহণ করলে তা টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট নয়।
তিনি বলেন, আমরা দেখছি দেশের মানুষ তাদের খাবার তালিকা থেকে অনেক ধরনের পুষ্টিকর খাবার বাদ দিচ্ছে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, শিশুদের খাদ্যাভ্যাস থেকে যেন কোনোক্রমেই পুষ্টিকর খাবার বাদ না পড়ে। যদি তারা অপুষ্টিতে ভুগতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কর্মক্ষম হয়ে পড়বে।
‘গণতন্ত্র যতবার হোঁচট খেয়েছে, পুনরুদ্ধার করেছে বিএনপি’
ধর্মীয় সংঘাতের মাধ্যমে ফায়দা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না: নাহিদ ইসলাম
আগাম শীতকালীন সবজি চাষে কৃষকের মুখে হাসি